একজন স্থাপত্যের ছাত্রের উদ্যান নিয়ে অনুভূতি

0
18

ইউসুফ বিন হক
এ শহরে মুক্তভাবে হেঁটে বেড়ানোর পরিসর তাহলে আর রইল কই? ইতিহাসের গৌরবরতœ ছড়ানো উন্মুক্ত সবুজ জায়গাটাকেও এত বেশি কংক্রিট-রুদ্ধ করে ফেলার আয়োজন কেন? রমনা যেমন আছে তেমন থাকাই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে জরুরি। তাই জানতে চাইলাম, রমনা পার্ক কেন ঐতিহাসিকভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ? নিচের টাইমলাইনটা দেখলে সংক্ষিপ্ত আকারে তা বোঝা যায়।
১৬১০ সালে ঢাকায় মোগলদের শাসন পাকাপোক্ত হওয়ার পর বাগানের অনুরাগী মোগলরা এ উদ্যান তৈরি করেছিলেন। তখন এর নাম ছিল ‘বাগ-ই-বাদশাহি’। এখনকার ইস্কাটন থেকে নীলক্ষেত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সচিবালয়Íপুরো এলাকাই ছিল রমনা।
কোম্পানি আমলে রমনার দক্ষিণের একটি অংশে রেসকোর্স প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডস। ঢাকা থেকে রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর হলে রমনা এলাকা ক্রমে জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে। অভিজাত রমনা হয়ে ওঠে বুনো জন্তুদের আশ্রয়স্থল। ১৮২৫ সালে চার্লস ডস ঢাকা জেলের কয়েদিদের দিয়ে দক্ষিণ অংশে খানিকটা জঙ্গল কাটিয়ে সাফসুতরা করে তোলেন। বেড়া দিয়ে ঘিরে তৈরি করা হয় ঘোড়দৌড়ের ময়দান।
রেসকোর্সকে কেন্দ্র করে আবার রমনার আভিজাত্য ফেরে। ১৮৪০ সালের দিকে বিত্তবানরা এ এলাকায় বাগানবাড়ি করতে থাকেন। পরে নবাব গণি এসব বাগানবাড়ির মধ্য থেকে অবসরপ্রাপ্ত জজ জন ফ্রান্সিস গ্রিফিথের বাড়িটি কিনে নেন। এলাকাটিকে তারা উন্নত করে নাম দেন ‘শাহবাগ’।
মোগলদের রমনা তিন ভাগ হয়ে যায় ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর। নবাবদের মালিকানায় শাহবাগ এলাকা। উত্তর দিকে মিন্টো রোডে ‘সিভিল স্টেশন’ নামে সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা। মাঝখানে রেসকোর্স ও বর্তমানের রমনা উদ্যান মিলিয়ে রমনা এলাকা। রেসকোর্সে পাকিস্তান আমলেই আইন করে ঘোড়দৌড় বন্ধ করে দেয়া হয়।
১৯৬৯ সালে গণ অভ্যুত্থানে কারামুক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এ মাঠেই সংবর্ধনা দেয়া হয়; প্রদান করা হয় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি। তিনি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে এখান থেকেই বাঙালির স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এ মাঠেই পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজি পরাজয়ের দলিলে স্বাক্ষর করেন। অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের। এরপর নামকরণ করা হয় ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যান’।
কালের নানা উন্নয়নের পেষণে পড়ে ঘন জঙ্গলাকীর্ণ সবুজ রমনা এখন ‘রমনা’ নামধারী হয়ে ছোট এক পার্ক বনে গিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশেই অবস্থান করছে।
২০২১ সালের এই দিন পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানটিকে আমরা দেখি আমাদের জাতীয় বইমেলার সরব প্রাঙ্গণ হিসেবে। আর বছরের অন্য দিনগুলোয় এর খোলা জায়গায় কর্মব্যস্ত দিনের শেষে একটু হেঁটে আসার অবসর-পরিসর হিসেবে।
স্বাধীনতার পূর্বাপর গৌরবময় ইতিহাস সেখানে গিয়ে স্মরণ করা চলে।
উদ্যানের খোলা অংশের দিকে তাকালেই কত কথা মনে হয়! এই তো এখানে কত ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে গেছে! নানা শ্রেণীপেশার কত দেশপ্রেমিক এসে জড়ো হয়েছিলেন এই সবুজ মাঠে। সেদিনের সেই দিনে কেমন উদ্দীপ্ত ছিলেন তারা! আরো কত কথা ভেবে চলি! এভাবেই সম্ভবত চেতনা জাগ্রত হয়।
আবার গৃহহীনকে নিশ্চিন্তে সেখানে দিনরাত রইতে দেখেছি। এ উদ্যান হয়েছে কাঠবিড়ালি আর কুকুরদের অভয়ারণ্য। চিত্রকর, কবি আর দার্শনিকের অনন্য মিলনমেলা হয়েছে এ উদ্যান।
ভোরবেলার ব্যায়ামের জায়গা, ছেলেদের গোল করে খেলার জায়গা, সাইকেল চালানোর, স্কেটিং করার, স্টান্টবাজি দেখানোর জায়গা হয়ে থেকেছে এ উদ্যান।
নির্ভয় ভালোবাসার সরণি হয়েছে প্রিয় এ উদ্যানের রাস্তা। প্রিয়তমার সামনে বেলুন ফুটানো বা বল দিয়ে বোতল ফেলে দেয়ার নিশানাভেদী অর্জনের মধুময় স্মৃতি!
বিদ্রোহী মিছিলে মুখর, দেশপ্রেমিকদের গভীর সুতাত্ত্বিক আলোচনার এ ছায়াময় স্থান! আমাদের এই ঐতিহাসিক স্থান কত মানুষের কত রকমের সমাগমে কী মুখর হয় প্রতিদিন! চিরচেনা বয়সী গাছের ছায়া আর ঐতিহ্যবাহী খোলা ময়দানকে প্রত্যক্ষ করে ইতিহাসের ওই নির্দিষ্ট সময়ে সহস্রভাবে কল্পনায় ফিরে যাওয়া হয়েছে।
এমনই তো কাম্য ছিল যেন আমাদের সংরক্ষণ ভাবনা এতসব ঘটনারও অনুষঙ্গ তৈরি করে। কেননা ঘাস-মাটির প্রান্তর আমার চেতনার খোলা বেদি। আর বয়সী গাছের বাকলের ভাঁজ ও দাগ যেখানে যেকোনো বিশ্বমানের ম্যুরাল থেকেও গভীর তাড়না সৃষ্টি করে, সে জায়গায় দক্ষ কর্মীর নির্মাণ খুব সতর্কতায় নিশ্চয়ই সংবেদনশীল হবেÍএমনভাবে আমার স্থাপত্য বিদ্যালয়ের মহান শিক্ষকরা আমাকে শিখিয়েছেন।
নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতায় তিনি ৭ মার্চ দিনটির অম্লান স্মৃতিকে সবার সামনে নিয়ে এসেছিলেন। স্পষ্টত সেখানে স্মৃতির এক দারুণ সংরক্ষণ যে তিনি করতে পেরেছেন, সেকথা বলাই যায়। সেই কবিতায় কাব্যের গাঁথুনি অবস্তুগতভাবে নির্ভেজাল স্মৃতির পাহারা দেয়।
কিন্তু ইট-পাথরের নির্মাণকাব্য সেখানে বস্তুগতভাবে পরিবেশ কতখানিই-বা সংরক্ষণ করবে, তা অবশ্যম্ভাবী প্রশ্নের অপেক্ষা রাখে।
আমাদের ঢাকা শহরে গাছপালা একান্ত নেই বলা চলে। ঢাকায় একটা শহর হিসেবে যতখানি গাছ, খোলা জায়গা আর জলাধার প্রয়োজন, তার কতটুকুই-বা আছে?
আমার বোধ থেকে যদি বলি তাহলে আমাদের রাজনৈতিক চেতনায় একটা বটগাছ কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে, এটা একান্তই আবেগানুভূতি দিয়ে বিচার্য বিষয় বৈ কিছু নয়। জাতিগত আবেগানুভূতির পরখেই বুঝে নেয়া যায় ৭ মার্চের ভাষণের স্থানের চিহ্ন পুনরুদ্ধার কেন প্রজন্মের জন্য প্রয়োজন হয়েছে।
আমাদের চেতনার মহালয়ে এ চিহ্নগুলো যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ একেকটি স্তম্ভ, তা নতুন করে বলা বাহুল্য মাত্র। ঠিক তেমনি আমাদের জাগরণী সময়ের প্রায় সব গণ আন্দোলন, সরকার বা বিরোধীদলীয় নানা ঐতিহাসিক সমাবেশ, বরেণ্য মহা অতিথিদের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনারও মহাসাক্ষী বর্তমানে দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষগুলো আর এ খোলা মাঠটি, যেখানে যোদ্ধা আর নেতাদের পদচিহ্ন দিয়ে ধুলামাটিগুলোও চূর্ণ স্বর্ণসম হয়েছে।
স্ফীতমান কালের স্রোতে গাছের ছায়াময় জায়গাগুলোও কি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক খ- স্থানে পরিণত হয়নি?
উদ্যানের যেকোনো গাছের তলে বসে কি কখনো যুগান্তকারী চিন্তা কারোর মনে উঁকি দেয়নি? এর ছায়াতলে কি কখনো কোনো মহানুভব তার অঙ্গ জুড়াননি?
বোধিবৃক্ষের ন্যায় বৃক্ষ খুঁজতে আমাদের দেশ ছাড়তেই হয় কেন? অর্ধশতায়ু নিজেদের বৃক্ষরাজির গুরুত্ব তৈরি হয় না কেন? কেন কখনো এ বৃক্ষরাজিকে কেটে ফেলার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হবে? কেনইবা পাখিদের আর কাঠবিড়ালিদের আবাস ধ্বংস করা দরকার হবে আমাদের?
নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় তিনি বলছিলেন যে ৭ মার্চের দিনের সেদিন শিশুপার্কটি সেখানে ছিল না। হ্যাঁ, এবং এটা সত্যি যে তা ছিলও না। নেতারা মানবিকভাবে শিশুপার্ক উন্নয়নের ভাবনা এখন করলেও এ জায়গায় এর উপস্থিতিকে আমরা যেমন ৭ মার্চের অতীতে আমাদের স্মৃতিনির্ভর ফিরে যাওয়ার পথে তবুও অন্তরায় হিসেবে দেখি, ঠিক তেমনি এখনকার কংক্রিটায়নও কি তেমনি খোলা ময়দান ধ্বংসের ভীষণ বস্তুগত ছাপ রেখে একদিন কখনো মহাদোষী সিদ্ধান্তে পরিণত হবে না?
আমাদের চিন্তাশীল নীতিনির্ধারকরা যেভাবে চিন্তা করছেন, তার সঙ্গে আমার ছোট্ট প্রাণের কোনো প্রকার দ্বিমত নেই, প্রশ্নই আসে না। কেননা দেশের ও দশের উন্নয়ন নিয়েই তাদের ভাবনা চলমান থাকে। কিসে জাতির উপকার আর কিসে নয়, তা তারাই সবচেয়ে ভালো জানেন, কেননা তারাই এর দায়িত্ব নিয়েছেন।
কিন্তু আমি জানি যে চেতনার বৃক্ষ সংরক্ষণের ব্যাপারে আমার সঙ্গে কেউই ভিন্ন মত দিতে পারবেন না, বস্তুত দেবেনই তো না। জনগুরুত্বপূর্ণ বিশেষ বিষয়ে এজন্য বোধ করি জনগণ এবং বিশেষজ্ঞ নগর পরিকল্পনাবিদ, কবি, চিত্রকর, সাহিত্যিক, শিক্ষক পরিজনের বক্তব্য থাকারও যথেষ্ট আবশ্যিকতা রয়েছে। সবার মতামত এলে উন্নয়ন সত্যিকারের জুতসই হয়। এ মহাপরিকল্পনা বিষয়ে এখনো তাই সরকারপক্ষ থেকে জনমত তৈরি করার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।
যা শিশু আর প্রজন্মের জন্য দায়িত্ববান সিদ্ধান্ত, তা কখনই সবুজের বিপরীতে যেতে পারে না। আমাদের দেহ আর মনে একটুখানি সবুজের গুরুত্ব যে কতখানি, বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো দেখলেই আমরা তা বুঝি।
কৃত্রিম ইট-সিমেন্টের শহর দেখে আমরা মানসিক চাপে পড়ে থাকি, আমরা হয়ে পড়ি আরো কান্ত আর অবসন্ন। আমরা যখন শীতল সবুজ সমারোহে থাকি, তখন এর ঠিক বিপরীত হতে থাকে।
কংক্রিট আর কৃত্রিম নির্মাণের মাঝে আমাদের পরের প্রজন্মের মানবসন্তানরা এত অবসাদ আর মানসিক চাপ ছাপিয়ে কতখানি চেতনাবাদী হতে পারবে, সে বিষয়ে আমার ঘোর সন্দেহ রয়েছে। আর যে স্থানকে চেতনার আধার করে গড়ে তুলছি, সেখানকার সবুজের আচ্ছাদন আর মুক্ত প্রকৃতিকে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা উচিতÍএকথা যেকোনো বিতর্কের বাইরে অবস্থান করে এমনটাই আশা করছি।
প্রসঙ্গক্রমে, আরেকটা উন্নয়নের ঝা-া ওড়ানো ঐতিহাসিক পার্ককে যেভাবে সংরক্ষণের নামে বলি হতে দেখা যায়, তার কথাও কিছু বলা প্রয়োজন। কেননা গোসসা নিবারণী পার্কের সবুজ প্রকৃতি হারাতে দেখে মানুষের গোসসা বরং উল্টো বাড়া উচিত।
২০১৭ আর ২০২০-এর ব্যবধানে উন্নয়নের নামে এমন বড় পুকুরখানা প্লট থেকে না-ই হয়ে গেল।
এ শহরে কয়টা জলাশয়ই-বা এখন আছে? কেন তাহলে উন্নয়নের নামে নতুন করে জলাশয় আর গাছ ধ্বংস করতে হচ্ছে? আশ্চর্য!
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী যখন বলেন, যারাই জলাধারের জায়গা অবৈধভাবে দখল করুক না কেন, উচ্ছেদ করা হবে, তাই তো প্রথম আলো অনলাইন ভোটে ৯২ শতাংশই এ বক্তব্যের ওপর অনাস্থার পক্ষে রায় পড়ে।
একজন স্বনামধন্য ডিজাইনার গণমানুষের রাগ কমানোর জন্য আরো এত ধূসর কংক্রিটের স্থান তৈরি করার পক্ষে ডিজাইন করতে পারেন, তা দেখে অবাক হয়েছি। আজ্ঞাবহতার ভয়াবহতা নাগরিক মনে রাগ কমানোর বদলে কেন বাড়িয়ে দেবে না? আর এর ফলাফলের স্থায়িত্ব তো কেবল একদিনেরও নয়। স্থায়ীভাবে গেঁড়ে থেকে যেন কোনো তৈরি স্থান আবার গণভোগান্তির কারণ না হয়!
সবুজ বৃক্ষ আর জলরাশির সমাবেশই তো আমাদের মস্তিষ্কের জন্য নিরাপদ স্বর্গসম, তাতে কি প্রশ্নের অপেক্ষা আছে? প্রাকৃতিক পরিবেশ বদলে ফেলে কৃত্রিম উপাদান দিয়ে নির্মাণ করে সবাইকে কিসের এমন অসত্য আশ্বাস তাদের দিতে হচ্ছে?
কংক্রিটের উন্নয়ন বেশ ব্যয়সাধ্য ব্যাপারও তো বটে। এত সিমেন্ট, ইট, স্টিলÍতাদের ফ্যাক্টরি উত্পাদনের প্রথম লগ্ন থেকেই পরিবেশের যথেষ্ট ক্ষতি করে। সে প্রসঙ্গে আরেকটা সম্পূর্ণ রচনা লেখা চলে। এত ব্যয় আর দূষণের অন্যপাশে বৃক্ষ নিধন কি কোনোভাবেই কাম্য হয়? আবার যদি সেসব বৃক্ষের নীরব অক্ষতিকর উপস্থিতি আমাদের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হয়?
কথায় কথায় বাইরের দেশ বাইরের দেশ করি। হ্যাঁ, সংরক্ষণের উত্কৃষ্ট উদাহরণ তো তারাই তৈরি করেছে। সেখানে তো আমাদের গর্ব করার কোনোই জায়গা মিলবে না। উন্নয়ন দেখাতেও তো বাইরের দেশকে অনুকরণীয় হিসেবে আমরা নিয়ে এসে বিজ্ঞজনদের কথা বলতে দেখি।
বাইরের দেশে এখন সংরক্ষণের নামে যেমন ছিল, তেমনভাবেই তারা বহুলাংশে সংরক্ষণ করছেন। অন্তত প্রাণকেন্দ্রের একটা উদ্যান নিয়ে তাদের দায়িত্বহীন হতে দেখিনি। সংরক্ষণের নাম করে সমূলে আমূল বদলে ফেলতে দেখিনি।
আর যদি আপনি ব্যতিক্রমী উদাহরণ কিছু দেখাতেও পারলেন, তাতে কী? ভালো-মন্দের ব্যবধান আমরা তো সবাই করতে পারি। কেন আমাদের সবুজ প্রকৃতির বাইরে গিয়ে কংক্রিট-নির্ভর উন্নয়ন করতে হবে?
আমেরিকার ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের সংরক্ষণ টাইমলাইনটা দেখুন। প্রতিনিয়তই দেখবেন তারা ইতিহাসের পাশাপাশি প্রকৃতিকে সংরক্ষণের ব্যাপারে আরো বেশি করে মনোযোগী হয়েছে। তারা বেশি হলে প্রকৃতির মধ্যে হাইকিং ট্রেইল তৈরি করছে। তবুও উদ্যানের আদিরূপ গ্রহণে অরণ্যের অভিবাসনকেই প্রাথমিক দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছে।
কানাডা তাদের অতীত ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য যেসব চিহ্নমূলক উপাদান আছে, সেসব যেমন আছে ঠিক তেমনি করে রেখে দেয়ার আলাদা রকম নিয়মবিধিই চালু করেছে। সরকারের নানা অঙ্গের সঙ্গে হেরিটেজ কানাডা ফাউন্ডেশন এসব বিষয়ে যোগ্য ওকালতিটা করে যেন সে দেশের ঐতিহ্যের মূল্যমান ও জীবনকালের উত্তরোত্তর স্ফীতি ঘটে।
যে জায়গা ইতিহাসে বিরান অরণ্যময় ছিল, সে অরণ্যই কি তার চিহ্নমূলক ঐতিহ্য উপাদান নয়? সে জায়গাটাকে তেমনি বিরান বা অরণ্যনিবিড় করে রাখাই যে প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণÍএ সহজ জ্ঞান হতে তো কোনো প্রকার বিদ্যাধারী হওয়ার প্রয়োজন দেখি না।
বিপুল জনসমাগমের বিরান উদ্যানে কংক্রিটের ঢেউ খেলানো পেইভমেন্টের ছড়াছড়ি আর কার পার্কিংয়ের দফারফা আমাকে কেমন ধারায় ইতিহাসের ওইদিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, আমি দুঃখিত, তা আমার কল্পনায় ঠিক আসে না।
উদ্যানের বৃক্ষসারি আর খোলা মাঠের সবুজ ঘাসের সংরক্ষণ আমার কাছে মায়ের আদি মুখচ্ছবি আর বাল্যকালের কাঁচা হাতের লেখা অবিকল সেভাবে রেখে দেয়ার মতোই মনে হয়।
খোলা জায়গায় পাঁচিল আর আরো আরো সিমেন্ট-ইট-পাথরের রাস্তা তুলে দিয়ে এ ধরনের সংরক্ষণের কোনো উপকার হয় না বলে মনে করি। গাড়ি-বাড়ি দিয়ে উদ্যান ভরিয়ে ফেললে উদ্যানটা আর কোথায় থাকল? উদ্যানেই কেন এত পার্কিংয়ের ঘনঘটা হবে? অন্যত্র পরিকল্পনা করেই তো পার্কিং সমস্যার সমাধান মেলানো সম্ভব হওয়ার কথা।
জীবন আর জীবিকার প্রয়োজনে এই যে বহু মানুষের ঢাকায় আসা আর থেকে যাওয়া, তা আজ এ শহরকে কত লাখ মানুষের প্রাণের আধারে পরিণত করেছে! ভাবলে অবাকই লাগে যে ২০২১ সালে ঢাকায় বসবাস করছে প্রায় ২ কোটি ১৭ লাখ মানুষ (২,১৭,৪১,০৯০ জন, ৩.৫০ শতকরা বৃদ্ধি হারে)।
যদি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শতকরা ১ দশমিক ৯৮ করেও ধরা হয়, ২০৩৫ সালে ঢাকার মানুষের এ সংখ্যাটা প্রায় ৩১ কোটি ২৩ লাখে গিয়ে ঠেকবে।
এখানে বলা প্রয়োজন যে একজন মানুষ বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন ৫০০ লিটার বিশুদ্ধ অক্সিজেন নিঃশ্বাস নিতে ব্যবহার করে। তাহলে দৈনিক ২ কোটি ১৭ লাখ মানুষ প্রতিদিন কতখানি অক্সিজেন ব্যবহার করবে, তা ক্যালকুলেটরে প্রণিধানযোগ্য।
আমি বরং ততক্ষণ মরিয়া হয়ে ভাবি যে এত অক্সিজেন বৃক্ষহীন ঢাকার বাতাসে এত মানুষ কেমন করে পাবে? আবার যে বাতাস থেকে আমরা অক্সিজেন গ্রহণ করছি, সেখানে অন্ততপক্ষে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ অক্সিজেনের উপস্থিতি থাকতে হয়। বাকি প্রায় ৭৮ শতাংশই থাকে নাইট্রোজেন আর অন্যান্য উপাদান অন্য বাকি অংশে। আমরা বিশুদ্ধ বাতাস বৃক্ষের উপস্থিতি ছাড়া কীভাবে পাব?
বায়ুদূষণের দিক থেকে আমাদের এই নগরী সারা বিশ্বে প্রথম সারিতে থাকে। হায় সেলুকাস, সেখানে দূষণ থেকে বাঁচানো গাছেদের প্রতি আমাদের এ নির্দয় আচরণ!
দিনকে দিন নানা দূষণের উপাদানের মাত্রা ঢাকায় তাদের স্ট্যান্ডার্ড মাত্রা ছাড়াচ্ছে, ছাড়িয়েই চলেছে। প্রতিদিন ঢাকার বাতাসে দূষণের ইনডেক্স আরো বাড়ছে। ২০২১-এর জানুয়ারির এক বৃহস্পতিবারে পলিউশন ইনডেক্স ৩২৬ পর্যন্ত উঠেছিল। এই লকডাউনের সময়েও এতখানি! অতিমাত্রায় দূষণ হলেই যা সম্ভব হয়। জানুয়ারির ২১ তারিখে ঢাকা এভাবেই বায়ুদূষণে প্রথম স্থান অধিকার করে। প্রায় প্রতিদিন এ বিষয়ে প্রথম সারির অবস্থান থেকে ঢাকানগরী নেমে আর আসে না।
এই ঢাকার বাতাসকে বিশ্লেষণ করলে কী পরিমাণে বিষাক্ততা পাওয়া যায়? তা নিয়ে লিখলেও তো আরেকটি রচনা হয়ে যায়। সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোঅক্সাইড, নানা রকম আরো যত দূষণের উপাদান আছে তা প্রতিনিয়ত আমাদের শ্বাস নেয়ার বাতাসকে আরো ভারি করে তুলেছে।
আমরা এমন বৃক্ষবিদ্বেষী হয়ে ভবিষ্যতে বাঁচব কী করে? আরেকটা প্রাসঙ্গিক উদাহরণ মাথায় এল। এ ব্যাপারটা ক্যাম্পাসের ছাত্ররা ভালো বুঝবেন। শীতকালে নানা রকম অতিথি পাখি গিয়ে সবুজের অভয়ারণ্য বলে খ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়। সেখানে জলাশয় আছে, খোলা প্রান্তর আছে, আছে সবুজের এক বিশাল মেলা। তাই সেখানে শীতকাল এলেই অতিথি পাখিরা আসে। তা দেখতে আমরাও যাই বৈকি। সেখানেও কিন্তু ইট-সিমেন্টের নির্মাণকাব্যেরও উপস্থিতি আছে।
কিন্তু ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা ডিএমসি বা বুয়েটের এই এলাকায় কাক ছাড়া আর কয়টা পাখি দেখা যায়? শালিক, ময়না, কাঠঠোকরা, চিল, আর প্যাঁচাদের যদি কিছু দেখা যায়, তা দেখা যায় ওই রমনাতেই।
অথচ ইতিহাসের পাতায় এ প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকৃত জায়গাসব অধিকাংশে বৃহত্তর রমনারই অংশ ছিল, নয় কি? গাছগুলোকে কাটছেন কেন? আরো কেন কাটছেন??
আজকের দিনে এখানে শ্বাস নেয়ার কয়টা জায়গা আছে বলতে পারবেন? ওইটুকু রমনা পার্ক আর উন্মুক্ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানÍএই এরা মিলে ঢাকার এক বিপন্ন ফুসফুসের মতোই নয় কি? এ জায়গাটাকে জাতিগত চেতনার হৃদপিন্ড বললে কি ভুল বলা হয়?
অনেক দূরদূরান্ত থেকে হাঁটাচলা আর ব্যায়ামের প্রয়োজনে ঢাকার অ্যাথলিট আর সাধারণ মানুষ এ জায়গাগুলোয়ই তো আসে! সবুজের মাঝে থাকার যে কত উপকারিতা, সে সম্পর্কে এ লেখা এতদূর পর্যন্ত পড়ে আসা একজন পাঠককে নতুন করে বলার আবশ্যিকতা নেই। এ জায়গাটুকুতেই একটু বাড়তি অক্সিজেনের দৃশ্যত নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। এই মাঠ-ঘাট, গাছপালাদের জন্যই তো তা পাওয়া যাচ্ছে। তাদের এমন নির্মম বিনাশে অক্সিজেন কি কমে আসবে না?
শুধুই কি অক্সিজেন? আমাদের প্রাকৃতিক প্রতিবেশের অভাব আমাদের মানসিক বিষণ্নতার কারণ হবে। তখন নানা ধরনের অপরাধ প্রবণতাও কি আরো বাড়বে না?
ঐতিহাসিক স্থানে কালের সাক্ষীবহ ভাস্কর্য বা চিহ্ন নির্মাণ নিয়ে অবশ্যই দ্বিমত নেই। কিন্তু এত বয়সী গাছগুলো কেটে প্রকৃতি ধ্বংস করা আত্মদাম্ভিক ডিজাইনারের স্রেফ ড্রাফটিং বোর্ডে আঁকা মনের মাধুরী মেশানো আঁকিবুঁকিকে এই এমন অবিচারে প্রতিষ্ঠিত করতে হচ্ছে কেন?
তাও হচ্ছে এমন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক জায়গায়!
পঞ্চম (শেষ) বর্ষের ছাত্র, স্থাপত্য বিভাগ, বুয়েট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here