আলোচনায় অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট

0
38

রাশেদ মেহেদী

বাংলাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে এই প্রথমবারের মতো মামলা দায়ের হয়েছে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। সচিবালয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সরকারি নথি ‘চুরির চেষ্টার’ অভিযোগে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে হেনস্তা করার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে এবং পেনাল কোডের অপর দুটি ধারায় মামলা দায়ের করেন। এর পর থেকেই দেশের সর্বস্তরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে বহু বছর ধরে প্রায় পরিত্যক্ত এই আইনটি। এই আইনে কী আছে? এই আইনে কেনই বা মামলা দেওয়া হলো পেশাদার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে? কিংবা এই আইন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায় কিনা- এসব প্রশ্ন নিয়ে এখন চলছে জোর আলোচনা। আইন ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯২৩ সালের এই আইনটি ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইন এবং ২০১১ সালে প্রণীত জনস্বার্থসংশ্নিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইনের পরিপন্থি। তারা বলেন, প্রেক্ষাপট বিচারে ব্রিটিশ আমলের এই আইনটি এখন একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক এবং এটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার বিষয়টি নিঃসন্দেহে অপপ্রয়োগ।
কেন প্রণীত হয়েছিল এই আইন :ইতিহাস অনুসন্ধানে দেখা যায়, ব্রিটিশ আমলে ১৮৯৯ সালে ব্রিটিশ-ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবার ‘ইন্ডিয়ান অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল, সে সময়কার ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনকারীরা যেন সরকারি তথ্য বা নথি না পায়, তা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, ব্রিটিশদের অধীনে চাকরিরত ভারতীয় কর্মকর্তারা যেন স্বদেশিদের গোপনে তথ্য না দিতে পারেন সে জন্য সামন্ত যুগের ‘গুপ্তচর বৃত্তি’ এখানে আইনের ধারা হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। ১৯০৪ সালে এই আইনটি সংশোধন করে আরও কঠোর করা হয়। এর পর ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন তার দায়িত্বের মেয়াদ শেষ করেন। পরে ১৯২১ সালে আর্ল অব মিন্টো ভাইসরয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘ইন্ডিয়ান অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ নতুন করে সংশোধনের উদ্যোগ নেন। এ দফায় এ আইন প্রয়োগের আওতা আরও বাড়ানো হয়। আইনটির নতুন নাম হয় ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩।’ স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ৩০ জুন প্রণীত ‘দ্য বাংলাদেশ লজ (রিভিশন অ্যান্ড ডিকারেশন) অ্যাক্ট’-এর ?দ্বিতীয় তফসিলে দুটি শব্দ পরিবর্তন করে সরকারি গোপনীয়তা সংক্রান্ত ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ আইনটি আত্তীকরণ করা হয়।
এর পর ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় সেই ঔপনিবেশিক অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টকে সংযুক্ত করে সরকারি অফিসের ফাইল বা নথির ছবি ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে সংগ্রহ করাকে গুপ্তচর বৃত্তি উল্লেখ করে সর্বোচ্চ ১৪ বছর সাজার মেয়াদ করা হয়।
সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে প্রশাসন মামলা দায়েরের পর ২০০৯ সালে ভারতের দিল্লির একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আইন সাংবাদিক কিংবা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে না বলে রায় দেন। আইনটি পাকিস্তানের আইনেও আত্তীকরণ করা হয়েছে। ইংল্যান্ডে ১৯৮০ সালে সামগ্রিক আইন সংস্কার করা হলে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট বাতিল হয়ে যায়।
যা আছে এই আইনে :১৯২৩ সালের ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’-এর ৩ ও ৫ নম্বর ধারায় রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নথি নিজের দখলে নিয়ে অপর পক্ষকে পাচারের বিষয়টি প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড বা ১৪ বছরের জেল এবং সর্বনিম্ন সাজা দুই বছরের কারাদন্ড রাখা হয়। এ ধারায় বলা হয়েছে- নিষিদ্ধ স্থানে যদি কেউ যায় বা যেতে উদ্যত হয় কিংবা ওই স্থানের কোনো নকশা বা স্কেচ তৈরি করে বা কোনো গোপন তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশ করে তবে সে অপরাধী হবে। সামন্ত যুগের প্রভুরাও পাশের মুল্লুকের গুপ্তচর ধরলে মৃত্যুদন্ড দিতেন। ব্রিটিশরা ভারতীয় স্বদেশিদের দমনের জন্য সেই শাস্তির বিধানই রাখে। আইনের ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় সাজা মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত হতে পারে অথবা ১৪ বছরের কারাদ এবং তবে সর্বনিম্ন ৩ বছরের সাজা দিতে পারেন আদালত।
আইনটির সংজ্ঞায় বিধি-নিষেধ-শাস্তি আরোপের ক্ষেত্রে কয়েকটি জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- সরকারি জায়গা, যোগাযোগের মাধ্যম এবং নিষিদ্ধ এলাকা। আইনে ‘সরকারি জায়গা’ বলতে সরকারের যে কোনো বিভাগ কর্তৃক দখলকৃত জায়গাকে বোঝানো হয়েছে, যা ওই বিভাগে ন্যস্ত করা হোক বা না হোক। যোগাযোগ বা যোগাযোগের মাধ্যম বলতে কোনো স্কেচ, প্ল্যান, মডেল, ডকুমেন্ট, আর্টিকেল, তথ্য বা এসবের আংশিক বা সম্পূর্ণ বর্ণনা বা ফলাফল দ্বারা যোগাযোগকে বোঝানো হয়েছে। ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ বলতে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে ঘোষিত নিষিদ্ধ জায়গা বা এলাকাকে বোঝানো হয়েছে।
এ আইনের ৩(১) ধারায় গুপ্তচরবৃত্তির শাস্তির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অথবা স্বার্থের পরিপন্থি কোনো উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ এলাকায় গমন করে, শত্রুপক্ষের উপকারে আসার মতো কোনো স্কেচ, প্ল্যান, মডেল অথবা নোট তৈরি করে কিংবা কোনো অফিসিয়াল গোপন কোড অথবা পাসওয়ার্ড অথবা নোট অথবা অন্য কোনো দলিলপত্র অথবা তথ্য আহরণ করে, রেকর্ড করে অথবা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে পাচার করে; তবে ওই ব্যক্তি এই ধারায় অপরাধী বিবেচিত হবে। ৩(২) ধারায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থের পরিপন্থিমূলক কাজ এবং ৩(৩) ধারায় অপরাধটি বিদেশি শক্তির স্বার্থে করা হয়েছে বলে ধারণা করা গেলে বা প্রমাণিত হলে মৃত্যুদন্ড বা ১৪ বছর কারাদে র বিধান রয়েছে। তবে বিদেশি স্বার্থে পাচার না হলে আদালত সর্বনিম্ন তিন বছরের কারাদ দিতে পারেন।
আইনের ৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে- কোনো বিদেশি এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে খবর সংগ্রহ করা যাবে না। আর আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে- কোনো নিষিদ্ধ এলাকা ও সরকার ঘোষিত কোনো এলাকা সম্পর্কীয় কোনো গোপনীয় অফিসিয়াল কোড বা পাসওয়ার্ড বা কোনো স্কেচ, প্ল্যান, মডেল, আর্টিকেল, নোট, দলিলপত্র অথবা তথ্য কোনো ব্যক্তি আইনসংগত দখলে বা নিয়ন্ত্রণে রেখেও যদি যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন না করে; যদি অন্য কোনো ব্যক্তির নিকট হস্তান্তর করে; তার নিয়ন্ত্রণাধীন তথ্যাদি অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্র ব্যবহার করে, তাতে সেই ব্যক্তি অপরাধী হবে। ৫ (ক) উপধারা অনুযায়ী কোনো প্রতিরক্ষা নির্মাণকাজ, অস্ত্রাগার, নৌ, স্থল বা বিমানবাহিনীর স্থাপনা বা স্টেশন বা খনি, মাইন ক্ষেত্র, কারখানা, ডকইয়ার্ড, ক্যাম্প বা বিমান বা গোপনীয় অফিসিয়াল কোড সংক্রান্ত অপরাধে শাস্তি মৃত্যুদন্ড অথবা ১৪ বছর কারাদ। অন্যান্য ক্ষেত্রে অপরাধের সাজা হবে সর্বনিম্ন দুই বছর।
আইন ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য : সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, আমরা জোর দিয়ে বলতে চাই, বাক স্বাধীনতাবিরোধী এবং বিতর্কিত আইনগুলোর মধ্যে অন্যতম অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট-১৯২৩, যা এখনও বিদ্যমান। এই আইন আমাদের সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের মাধ্যমে আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া এই আইন তথ্য অধিকার আইনের (আরটিআই) সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই আইনে সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে- এর ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক যে কোনো আইনের চেয়ে অগ্রাধিকার পাবে আরটিআই। এর অর্থ হলো, আরটিআই যতদিন আছে, ততদিন অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট কার্যকর হবে না বা আরটিআই দ্বারা এটি রহিত হবে। অথচ অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টেই মামলা হয়েছে। বাংলাদেশের সাংবাদিকরা দীর্ঘদিন এ আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। আমরা মনে করি, এই আইন এমন, যার মাধ্যমে অস্বচ্ছতা, জবাবদিহির ঘাটতি ও দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং জনগণের অর্থ তছরুপের বিষয়গুলোকে উৎসাহিত করে।
সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের এই আইনটি প্রায় পরিত্যক্ত একটি আইন। এটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হওয়ারও কথা নয়। এই আইনকে টেনে এনে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে পেশাগত কাজের দায়ে ব্যবহার করা হয়েছে- এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং সচেতন মানুষের কাছে খুবই মর্মবেদনার। তিনি আরও বলেন, রোজিনা ইসলাম অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে অনেক কর্মকর্তার দুর্নীতির তথ্য জাতিকে জানিয়েছিলেন। সম্ভবত সে কারণেই আক্রোশ থেকে তাকে হেনস্তা করে পরে মামলা দেওয়া হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, ব্রিটিশ আমলের এই আইনে ১৯৮৩ সালে হাইকোর্টের রেকর্ডে একটি মামলা দেখা গিয়েছিল। এর পর এ আইনে আর কোনো মামলার কথা শুনিনি। এখন দেখলাম, সচিবালয়ে একজন সাংবাদিককে সরকারি নথি চুরির দায়ে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা দেওয়া হয়েছে। আসলে তাদের একটা মামলা দেওয়ার দরকার ছিল। খুঁজতে খুঁজতে এই আইন পেয়েছে। ওই যে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রাখা; সম্ভবত তারা যুতসই আইন খুঁজছিল। এই আইনের কথা যেহেতু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় আছে; সেখান থেকেই সম্ভবত এই আইনে মামলা দায়েরের চিন্তা তাদের মাথায় এসেছে। কিন্তু এ আইনে যেভাবে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটা একদম অপ্রাসঙ্গিক। চুরির মামলা দেওয়া হয়েছে; সেটাও তো হয়নি। সরকারি নথিকে কারও সম্পত্তি বা মালপত্র হিসেবে দেখিয়ে মামলার বিষয়টি একেবারেই যুক্তিযুক্ত নয়।
বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়া বলেন, ২০১১ সালে জনস্বার্থসংশ্নিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন পাস হয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে- জনস্বার্থে জরুরি মনে হলে গোপনীয় হলেও সে তথ্য প্রকাশ করা যাবে। এমনকি যদি তথ্যের সমর্থনে ডকুমেন্ট না থাকে কিন্তু তথ্য সত্য বলে বিশ্বাস করার দৃঢ় ভিত্তি আছে, তাহলেও তথ্য প্রকাশ করা যাবে এবং তথ্য প্রকাশকারীর সুরক্ষা দিতে হবে। এমনকি এ আইনে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশকারীকে পুরস্কৃত করার বিধানও আছে। রোজিনা ইসলাম জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ করেছেন কিংবা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। অতএব তাকে আইন অনুযায়ী পুরস্কৃত করার কথা। অথচ সরকারি কর্মকর্তারা তাকে আটকে রেখে হেনস্তা করেছেন। এ কারণে এ আইনের ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী এ ঘটনা ঘটিয়ে সরকারি কর্মকর্তারা ফৌজদারি অপরাধ করেছেন বলেও প্রতীয়মান।
তিনি আরও বলেন, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ঔপনিবেশিক যুগে ভারতীয়দের স্বদেশি আন্দোলন দমন মাথায় রেখে তখনকার ঔপনিবেশিক শাসকরা করেছিলেন। এ আইন স্বাধীন দেশে থাকাটাই অগ্রহণযোগ্য। অথচ সেটার অপপ্রয়োগ হচ্ছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে। এটা খুবই লজ্জার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here