সংবাদকর্মীর নিগ্রহ: বিল্ট-ইন!

0
46

আবু নাসের অনীক
দেশ ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত অনুসন্ধানী সিনিয়র সংবাদকর্মী রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ের মতো জায়গায় ৬ ঘন্টা আটকে রেখে নির্যাতন করা হলো। অতঃপর শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয় চুরির মামলা দিয়ে। কেউ কী বলতে পারেন, সচিবালয়ে কী টর্চারসেল আছে? রোজিনাকে বিধ্বস্ত অবস্থায় যেভাবে সচিবালয় থেকে বাইরে বের করে এনেছে, মনে হয়েছে সেখানেও থানার মতো টর্চার সেল আছে। দুর্নীতির রিপোর্ট করলে আগামীতে এই টর্চার সেলে অন্যদেরও যেতে হতে পারে, রোজিনাকে দিয়ে সেই বার্তাটিই দেওয়া হলো।
বাংলাদেশের জন্মকালীন সময় থেকেই স্বাধীন গণমাধ্যম চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। সৃষ্টির পর থেকেই ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র দিয়েই যাত্রা শুরু। যা বর্তমানে জেকে বসেছে বাংলাদেশের বুকে জগদ্দল পাথরের মতো। একটি গণতান্ত্রিক-জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ব্যতীত গণমাধ্যমের স্বাধীন ভুমিকা কোনভাবেই বিকশিত হতে পারে না। সেক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যম চর্চা না হতে পারা, সংবাদকর্মী নিগ্রহ ‘বিল্ট ইন’ অবস্থায় ছিলো!
৫০ বছরে হোঁচট খেতে খেতে এখন এক্সট্রিম পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। ৯০ দশকে’র শুরুতে গণমাধ্যমের মৌলিক চরিত্রও পাল্টে যেতে থাকে। গণমাধ্যমের মালিকানায় লুটেরা পুঁজির অনুপ্রবেশ তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে পাল্টে দেয়। অধিকাংশ গণমাধ্যম চরিত্রের বদল ঘটিয়ে তথাকথিত কর্পোরেট হাউজগুলোর বাণিজ্যিক প্রচার মাধ্যমে রূয়ায়ায়ায়াপান্তরিত হয়। সংবাদ কর্মীরাও বাণিজ্যিক প্রচারকর্মী হিসাবে আর দশটা সাধারণ চাকুরীজীবীর মতো হয়ে পড়ে। যাদের মধ্যে কর্পোরেট হাউজগুলোর স্বার্থ রক্ষা ছাড়া অন্যকিছুই আর অবশিষ্ট থাকেনি।
লুটেরা শাসক আর মালিকগোষ্ঠী একাকার হয়ে যায়। উভয়ের স্বার্থ এক ও অভিন্ন হয়ে ওঠে। এর মধ্যেও কিছু গণমাধ্যম আর সংবাদকর্মী তাদের মৌলিক ভূমিকায় অবিচল থেকেছেন। যে কারণেই রোজিনা ইসলামদের মতো কিছু অবাধ্য সংবাদকর্মী প্রবল বাঁধার মুখে পড়েও অসম সাহসীকতায় দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। যার কারণে এই লুটেরা শাষকগোষ্ঠী তাদের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেছে। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তুলেছে।
রোজিনার অপরাধ ‘৩৫০ কোটি টাকার জরুরি কেনাকাটায় অনিয়ম’, ‘এখন এক কোটি দেব, পরে আরও পাবেন’, ‘জরুরি কেনা কাটায় সমন্বয়হীনতা’, ‘পড়ে আছে জীবন রক্ষাকারী সামগ্রী’ এই সমস্ত শিরোনামে তিনি অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছেন। একটি রিপোর্ট নিয়েও কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি, রিপোর্টগুলি মিথ্যা বা ভিত্তিহীন। এসব রিপোর্টের কারণেই সরকার তাকে দেশের চরম শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেছে। কিন্ত জনগণের কাছে রোজিনা বীর, লুটপাটকারী ঐ সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব আর আমলারা গণশত্রু হিসাবেই বিবেচিত হচ্ছে।
সংবাদকর্মী রোজিনা’র নামে অফিসিয়াল সিক্রেক্ট অ্যাক্ট ১৯২৩ এর ধারা ৩ ও ৫ এর আওতায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই আইনের ধারা ৩-গুপ্তচর বৃত্তির জন্য শাস্তি ঃ সরকারি গোপন বিধি’১৯২৩ এ গুপ্তচর বৃত্তির জন্য নিম্মোক্তরূপ শাস্তির বিধান রয়েছে ঃ (১)যদি কোন ব্যক্তি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অথবা স্বার্থের পরিপন্থী কোন উদ্দেশ্যে; (ক) কোন নিষিদ্ধ এলাকার নিকটে গমন করে, পরিদর্শন করে, অতিক্রম করে সান্নিধ্যে আসে অথবা
ভিতরে প্রবেশ করে, অথবা (খ) কোন স্কেচ, প্লান, মডেল অথবা নোট তৈরি করে, যা প্রত্যেক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে শত্রুপক্ষের উপকারে আসবে বলে মনে করা হয়, ধারণা করা যায় অথবা নিশ্চিত হওয়া যায়, অথবা (গ) যদি কোন ব্যক্তি শত্রুপক্ষের ব্যবহারে আসতে পারে, আসবে বলে ধারণা করা যায় অথবা নিশ্চিত হওয়া যায়, এমন কোন অফিসিয়াল গোপন কোড অথবা পাসওয়ার্ড অথবা নোট অথবা অন্য কোন দলিলপ্রত্রাদি অথবা তথ্য আহরণ করে, সংগ্রহ করে, রেকর্ড করে প্রকাশ করে অথবা অন্য কোন ব্যক্তির নিকট পাচার করে।
এই ধারা মূলত প্রয়োগ হয় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা স্বার্থের পরিপন্থী কোন উদ্দেশ্যে। সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করে কী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থের পরিপন্থী কোন কাজ করেছে? তাহলেতো ধরে নিতে হবে আমাদের রাষ্ট্র-সরকারের কাছে দুর্নীতি একটি স্বাভাবিক বিষয়। এবং এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে সেটা অপরাধমূলক কাজ। মাননীয়গণ, আপনারা আদালতকে বলুন এই মর্মে একটি আদেশ জারি করতে। অথবা নির্বাহী আদেশেও সেটি ঘোষণা করতে পারেন। তাহলে তো লেঠা চুকে যায়!
আইনের ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে কোন ‘নিষিদ্ধ এলাকা’। প্রশ্ন হচ্ছে সচিবালয় কী আদৌ কোন নিষিদ্ধ এলাকা? যদি নিষিদ্ধ এলাকা না হয়, তবে এই ধারায় রোজিনার নামে কী মামলা হতে পারে ? অবশ্যই পারে না।
খেয়াল করুন, ধারায় বলা হয়েছে, আয়ায়ায়্#া৩৯;শত্রুপক্ষের’ ব্যবহারে আসতে পারে। শত্রুপক্ষ কে? এ ধারায় মামলা গ্রহণ করে তো শত্রুপক্ষ বানানো হলো দেশের জনগণকে, যে জনগণকে আবার রাষ্ট্রের মালিক বলা হয়! সরকারের দুর্নীতি প্রকাশ করলেই যদি তার অবস্থান হয় শত্রুপক্ষ, তবে তো সরকারের দুর্নীতি দমন কমিশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান রাখার প্রয়োজন নেই। অবশ্য প্রতিষ্ঠানটি এমনিতেই নখদন্তহীন।
এই আইনটি করেছিলো ১৯২৩ সালে তৎকালীন কলোনিয়াল শাসকগণ। প্রত্যেকটি আইন তৈরির একটি মোরাল ও প্রেক্টিক্যাল গ্রাউন্ড থাকে। তৎকালীন সময়ে তাদের (বৃটিশ) কোন ধরনের অপতৎপরতা যাতে নেটিভরা (তাদের ভাষায়) চ্যালেঞ্জ করতে না পারে। সেই সুরক্ষা দেবার জন্যই এই আইন করা হয়েছিলো।
সেই আইনে যখন একজন অনুসন্ধানী সংবাদ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়, তখন বুঝতে হবে ১৯২৩ সালের কলোনিয়াল শাসকের সাথে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর আদতে মৌালিক কোন পার্থক্য নেই।
মতাদর্শগত জায়গায় তাদের অবস্থান অভিন্ন। যদি অভিন্ন না হতো তবে স্বাধীনতার ৫০ বছরে এই সমস্ত ঔপনিবেশিক আইনের খোলনলচে পাল্টে ফেলা হতো। কিন্তু কিছুই পাল্টেনি, বরং দিনকে দিন আরো গণবিরোধী আইন তৈরি করা হচ্ছে।
রোজিনা ইসলাম অনুসন্ধানী সংবাদকর্মী। একটু আলোকপাত করতে চাই, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কী? ইউনেস্কোর প্রকাশনা ‘ষ্টোরি বেইজড এনকোয়ারি’ হ্যান্ডবুকে বলা হচ্ছে,‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য হচ্ছে, গোপন বা লুকিয়ে রাখা তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা। সাধারণত ক্ষমতাবান কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এসব তথ্য গোপন রাখে; কখনো হয়তো-বা বিপুল ও বিশৃঙ্খলভাবে ছড়িয়ে থাকা তথ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, যা চট করে খুাঁজে পাওয়া কঠিন। এই কাজের জন্য একজন সাংবাদিককে সাধারণত প্রকাশ্য ও গোপন নানা উৎস (সোর্স) ব্যবহার করতে হয়, ঘাটতে হয় নানা ধরনের নথিপত্র’।
বিষয়টি কিন্তু জলের মতো পরিস্কার, অফিস সিক্রেটস আইনের আওতায় তাঁর নামে অভিযোগ গঠনের কোন সুযোগ নেই! যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে হয়রানী করবার অভিপ্রায় না থাকে! বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, অফিস সিক্রেটস অ্যাক্ট রাখা হয়েছে যাতে প্রয়োজনমতো শাষকগোষ্ঠী এগুলো ব্যবহার করতে পারে। তাদের বিচেনায় রাষ্ট্রের তথাকথিত শত্রু রোজিনা ইসলামদের মতো অনুসন্ধানী সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে। যাতে তারা ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র নিয়ে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করতে না পারে।
জনগণের কাছে যাতে সকল ধরনের তথ্য আড়াঁল করে নির্বিঘ্নে লুটপাট চালিয়ে যাওয়া যায়। একটি গণবিরোধী সরকার এভাবেই নিজের অলিখিত চতুর্থ স্তম্ভ ধ্বংস করে ফেলছে। তাদের বক্তব্য অনুসারে, চতুর্থ স্তম্ভটি সঠিকভাবে কাজ করতে না পারলে বাকি তিনটি স্তম্ভও সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যার পরিণতি ভয়াবহ।
সিপিআই ২০২০ অনুযায়ী, ১৮০ টি দেশের মধ্যে দুর্নীতিতে নিচের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২ তম। গত দুই বছরে সূচক পূর্বের তুলনায় পিছিয়েছে। পেছানোর অন্যতম কারণ হিসাবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক দুর্নীতি এবং মত প্রকাশ ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অভাব। যার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে রোজিনার অনুসন্ধানী রিপোর্টগুলিতে এবং বর্তমানে রোজিনার সাথে সংঘটিত ঘটনাবলী।
গত কয়েক মাস আগে আমাদের মাননীয় প্রধান বিচারপতি দেশের ‘ভাবমূর্তি’ নিয়ে ব্যাপক বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। ৭ মার্চ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একজন আসামীর জামিন আবেদনের শুনানিতে তিনি বলেন, ‘দেশের ইমেজ সবার আগে’। কিসে দেশের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয় এটা মাননীয় বিচারপতির কাছে জিজ্ঞাস্য! মুক্ত গণমাধ্যমের সূচকে ১৮০ টি দেশের মধ্যে শেষের দিক থেকে ১৫২তম হয় তখন কী ইমেজ বাড়ে না কমে!!
গ্লোবাল ইনভেষ্টিগেশন জার্নালিজম নেটওয়ার্ক যখন রোজিনার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিক্রিয়াতে তাদের টুইটার পেজে লেখে ‘ÔWhat is going on in # Bangladesh? One of the countryÕs most respected women journalists is detained for hours. Hey, Health Ministry: journalism is not a crime! The world is watching.’ মাননীয়, দেশের ইমেজ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে কী বলেন!!
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ব্যতীত অন্য সকল স্তর থেকে সাংবাদিক রোজিনার সাথে ঘটে যাওয়া জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়েছে। আর এ বিষয়ে নিশ্চুপ হয়ে আছে সেই সমস্ত নারী সাংবাদিকগণ, যারা ‘নারী সাংবাদিকদের চরিত্রহীন’ বলায় দেশে একাধিক মানহানীর মামলা করেছিলেন, বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন! নারী সাংবাদিক রোজিনার সাথে ঘটে যাওয়া জুলুম কী আপনাদের কাছে তার চেয়ে অধিকতর গৌন ঘটনা?? বিষয়টি তুলনামূলক বিচারে আরো ভয়াবহ। আপনাদের কারণেই নৈতিকমূল্যবোধ আজ এতোটা অধপতিত! আর কত দালালী করবেন!!
সাগর-রুনী, তনু, মেজর সিনহা বা এ ধরনের আরো অনেক বিনা বিচারে হত্যা, মুনিয়ার মৃত্যু, ধর্ষণ, শ্রমিক বিক্ষোভে গুলি করে শ্রমিক হত্যা, পঙ্গু করা, গাছ উজাড় করে উন্নয়ন, দুর্নীতি, লুটপাট এসব কোন কিছুই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কিন্তু আমরা বিচ্ছিন্ন করে দেখছি। একটি ইস্যু সামনে আসছে আমরা সেটি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সপ্তাহের মাথায় ভুলে যেয়ে আরো একটি ইস্যুতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ছি। এভাবেই আমাদের ব্যস্ত রাখা হচ্ছে!
ক্ষমতাসীন সরকার একটা ‘ভুলভুলাইয়া’র মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমরা ক্রমাগত ঘুরপাক খেয়েই চলেছি! যা কিছু হচ্ছে তা লুটেরা রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার ফলাফল। এই লুটেরা রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা উচ্ছেদ ব্যতীত এই সংকট থেকে মুক্তির বিকল্প অন্য কোন পথ নেই। সুতরাং আওয়াজটি তুলতে হবে ব্যবস্থাপনা উচ্ছেদের!!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here