মধ্যপ্রাচ্য সংকটে নতুন খেলুড়ে চীন

0
21

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চলতি মাসের জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছে চীন। ঠিক একই সময়ে গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে। চীন চাইছে নিরাপত্তা পরিষদের সাময়িক এ নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে সংকটের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে। সর্বশেষ রোববার অনুষ্ঠিত পরিষদের বৈঠকে এ নিয়ে চার দফা সুপারিশ দিয়েছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। একই সঙ্গে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি নেতাদের সংলাপে বসারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে চীন এখন অনেক বেশি সোচ্চার হয়ে উঠেছে। এ সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে ক্রমাগত সমালোচনা করে চলেছে দেশটি। চীন বলছে, এ সংঘাত নিরসনে বেইজিংয়ের ভূমিকা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠবে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, শান্তি ও আলোচনার দাবিতে আমরা আমাদের প্রয়াস বৃদ্ধি অব্যাহত রাখব। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের চেয়ার হিসেবে আমাদের দায়িত্বও পরিপূর্ণভাবে পালন করব। আমরা ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিদের শান্তি আলোচনার জন্য চীনে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
এ সময় ফিলিস্তিনের দ্রুত স্বাধীনতা নিশ্চিতের মাধ্যমে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের আহ্বান জানান চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি ১৯৬৭ সালের সীমানায় ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে দুই দেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে সংকট সমাধানের পথে বাধাদানের অভিযোগ তুলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জোর সমালোচনাও করেছেন।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শুধু ফিলিস্তিন-ইসরায়েল নয়, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি সংঘাতেই এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে দিয়েছে চীন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও এখন অঞ্চলটি থেকে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছে। এর বিপরীতে অঞ্চলটির চলমান বিভিন্ন সংকটে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে চীন। অঞ্চলটিতে চীনকে আরো প্রভাবশালী হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতমুখর পরিস্থিতি।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার বৈরিতায়ও চীনকে দেখা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে। কিছুদিন আগেই তেহরানের সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদি ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ (সিএসপি) চুক্তি করেছে বেইজিং। এ চুক্তির আওতায় ইরানে ৪০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ করবে চীন। ওয়াশিংটনের প্রতি বৈরী দুই দেশের মধ্যকার এ চুক্তি নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বৈরী দেশগুলোকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নেই। ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠতম মিত্রদের দিকেও হাত বাড়িয়েছে চীনে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), মিসর এমনকি ইসরায়েলের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরালো করে তুলেছে দেশটি।
এ বিষয়ে কূটনৈতিক ভাষ্যকাররা বলছেন, চীনের মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উপস্থিতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ। প্রাথমিকভাবে এ অঞ্চলের বিপুল জ্বালানি সম্পদে প্রবেশাধিকার চাইছে বেইজিং। পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বেইজিংকে প্রযুক্তিগতভাবেও লাভবান করবে। এ কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইসরায়েলেও বিনিয়োগ বাড়িয়ে তুলেছে চীন। এছাড়া বেইজিংয়ের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের হাইফা ও ইরানের বন্দর আব্বাসকে দেখা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর হিসেবে। দুটি বন্দরেই বড় বিনিয়োগ রয়েছে চীনের। সব মিলিয়ে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণেও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নিরসন ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে সোচ্চার হয়ে উঠেছে চীন।
যুক্তরাষ্ট্রকে ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। অন্যদিকে এ সংঘাতে চীনের অবস্থান কৌশলী। ফিলিস্তিন ইস্যুতে ঘোর সমালোচনা করলেও ইয়েমেনে ওয়াশিংটনের এতদিনকার অবস্থানকে অনেকটা নীরব সম্মতি দিয়ে গিয়েছে চীন। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মূলত রিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়েই ইয়েমেন ইস্যুতে মৌন ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে চীন। এক্ষেত্রে বেইজিং এতদিন সৌদি নেতৃত্বাধীন গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) ও জাতিসংঘের নেতৃত্বে শান্তি আলোচনায়ই সমর্থন দিয়ে গিয়েছে। আবার এর পাশাপাশি ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়া থেকেও নিজেকে বিরত রেখেছে চীন। দেশটি মানবিক সংকটে বিপর্যস্ত ইয়েমেনে শুরু থেকেই ব্যাপক ত্রাণসহায়তা দিয়ে এসেছে। এছাড়া ইয়েমেনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে আনতে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিও দীর্ঘদিন ধরেই জোর আবেদন জানিয়ে এসেছে।
বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনেও চীনের বড় স্বার্থ জড়িত রয়েছে। বেইজিং ইয়েমেনের যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনকালে বড় অংশীদার হতে চায়। দেশটির কূটনীতিকরাও এ নিয়ে খোলাখুলি বক্তব্য দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইয়েমেনে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে চীনের উচ্চাভিলাষী বিআরআই প্রকল্পের জন্য তা লাভজনক হবে। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য হলো চীনের ইউরোপের সঙ্গে নৌবাণিজ্যের অধিকাংশই হয় এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগর দিয়ে। অন্যদিকে ইয়েমেন ও ইথিওপিয়ার মধ্যকার বাব এল মানদেব এবং ইরানের হরমুজ প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করে দেশটি। সব মিলিয়ে চীনের নৌবাণিজ্য পথে ভূকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে ইয়েমেন। এ কারণে চীনের কাছে ইয়েমেনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব অনেক বেশি।
এছাড়া ইয়েমেনে চীনা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের জন্য ২০১১ সালের আগেকার অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনাকেও অপরিহার্য হিসেবে দেখছে চীন। এছাড়া দেশটির যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনকালীন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বড় ভাবনা রয়েছে চীনের। বেইজিংয়ের মৌন অবস্থানের পেছনে সৌদি আরবকে খুশি রাখার পাশাপাশি এ বিষয়টিকেও বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিধ্বস্ত সিরিয়ায়ও যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের দিকে চোখ রয়েছে চীনের। এ যুদ্ধে দেশটির ভূমিকা সামনে না এলেও দৃশ্যপটে একেবারে অনুপস্থিত নেই বেইজিং। গৃহযুদ্ধ ও সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাসার আল আসাদ সরকারকে সমর্থন দিয়ে এসেছে চীন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন অবরোধকে উপেক্ষা করেই দামেস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে চীন। যদিও এ সংঘাতে শুরু থেকেই অনেক সতর্ক ও কৌশলী অবস্থান বজায় রেখেছে।
তবে নিরাপত্তা পরিষদে সিরিয়া ইস্যুতে ভোটাভুটির সময় এলে রাশিয়ার সঙ্গে একযোগে বাসার সরকারের পক্ষ নিয়েছে চীন। সিরিয়ায় কোনো ধরনের সামরিক অভিযান চালানো থেকে বিরত থাকতে তুরস্কের প্রতিও বারবার আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। পর্যবেক্ষকদের মতে, সিরিয়া ইস্যুতে চীনের অবস্থানের পেছনে দুটি উদ্দেশ্য কাজ করেছে। প্রথমত নিরাপত্তা হুমকি। দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক স্বার্থ। এর মধ্যে দামেস্কের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে চীন। অন্যদিকে এক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবেও বিআরআই প্রকল্পসংশ্লিষ্ট স্বার্থ আদায়ের তাগিদেও দামেস্কের প্রতি সমর্থন দিয়ে চলেছে দেশটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতদিন পর্যন্ত নিজ ভূখ-ের বাইরে শুধু আফগান জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে নিয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছে চীন। কিন্তু আইএসের উত্থানের পর থেকেই সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ের ক্ষেত্রে সিরিয়াকে নতুন উদ্বেগের জায়গা হিসেবে দেখছে দেশটি। ধারণা করা হচ্ছে, চীন থেকে পালিয়ে যাওয়া উইঘুরদের একাংশ সিরিয়ায় পালিয়ে আইএসে যোগ দিয়েছে। অন্যদিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে সিরিয়ারও চীনের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগিতে খুব একটা নারাজি নেই।
একই কারণে চীনও বরাবর পশ্চিমা দেশগুলোকে বোঝানোর চেষ্টা করে এসেছে, বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থেই সিরিয়ার পরিবেশ স্থিতিশীল হয়ে ওঠার বিষয়টি জরুরি। এ মুহূর্তে এটি ততক্ষণই সম্ভব, যতক্ষণ বাসার আল আসাদ ক্ষমতায় থাকবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিরিয়ায় চীনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়গুলো একটি আরেকটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বিশেষ করে বিআরআই প্রকল্পের দিক থেকে। ভূমধ্যসাগরে প্রবেশে সুয়েজ খালের বিকল্প পথ হিসেবে সিরিয়া ও লেবানন সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময়। ভূমধ্যসাগরের বন্দরগুলোয় বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ইউরেশীয় বাণিজ্যপথকে ফিরিয়ে আনতে চায় বেইজিং। এ বাণিজ্য করিডোর ইউরোপ, আফ্রিকা ও বিশ্বের অন্যান্য অংশের সঙ্গে চীনের কানেক্টিভিটিকে আরো সরব করে তুলবে। এক্ষেত্রে বিআরআইয়ে সিরিয়ার তারতুস বন্দর ও দামেস্কের সংযুক্তি লেভান্ত অঞ্চলে চীনকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here