উৎপীড়িত কেনো উৎপীড়কের সাথে!!

0
44

আবু নাসের অনিক

বেশ কিছু সময় ধরেই মনের মধ্যে কিছু প্রশ্নগুচ্ছ ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার নিজের কাছে নিজের মত করে কিছু উত্তর হয়তো আছে সেসব প্রশ্নের। কিন্তু তার মধ্যেও সংশয় আছে। নিজে যেটি উত্তর মনে করছি উত্তর হয়তো সেটি নয়। কিন্তু উত্তরটা খুঁজে বের করা এই সময়ের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক।

গত কয়েকদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ গণমাধ্যমগুলোতে মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ নিয়ে লেখা হচ্ছে। পক্ষে-বিপক্ষে দুটি মতই আছে। আদর্শিক অনেক বন্ধুরাও লিখছেন। কেনো মানুষ এতো কষ্ট-দুর্ভোগ উপেক্ষা করে, মহামারীকে তাচ্ছিল্য করে বাড়ীর দিকে ছুটে চলেছে? কী তাদের মনস্তত্ব? দুর্ভোগের জন্য দায়ী কারা? তাদের লেখায় উঠে আসছে। দায়ীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।

দেশের মানুষের বাক স্বাধীনতা নেই। অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বিদ্যমান। ডিজিটাল আইনের মাধ্যমে কন্ঠরোধ করা হচ্ছে। শ্রমিকরা আট ঘন্টার কাজের দাবীতে বিক্ষোভ করলে পুলিশ গুলি করে হত্যা করছে, মামলা দিচ্ছে। ন্যায্য ছুটি পাওনা দাবি করলেও গুলি চালানো হচ্ছে। বিক্ষোভ দমনে গুলি চলছে, প্রান্তিক মানুষ জীবন হারাচ্ছে, একটি সংসারের সমস্ত স্বপ্ন নিভে অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে।

লকডাউনে শ্রমজীবী মানুষের খাবারের নিশ্চয়তা নেই। কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের কাজের ব্যবস্থা নেই। গার্মেন্টস শ্রমিকরা ঈদের আগে বেতন-বোনাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বড়লোকদের জন্য এক রকম আর গরীবের জন্য ভিন্নভাবে আইনের প্রয়োগ হচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। আর এসব কাদের জন্য হচ্ছে, শাসকগোষ্ঠীর বিশেষ করে সরকারের ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র টিকিয়ে রাখার স্বার্থে।

যে সমস্ত অনাচারের, অন্যায্যতার কথা উল্লেখ করলাম এর বাইরেও আরো নানা ধরনের গণবিরোধী কর্মকান্ডের বিষয়ে বামপন্থী-প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক শক্তি প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বন্ধ পাটকল শ্রমিকের পাশে, এস আলম গ্রুপের পাওয়ার প্লান্টে গুলিতে নিহত, আহত শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে, ক্ষুদ্র আঙ্গিকেও হলেও প্রতিবাদ গড়ে তুলছে। গ্রেপ্তার হয়ে জেলেও যাচ্ছে। গার্মেন্টস এর ছুটির দাবীতে গুলিবিদ্ধ শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে, চিকিৎসার ব্যবস্থা, প্রতিবাদ করছে, বেতন-বোনাস আন্দোলনের সাথে থাকছে।

লকডাউনে খেতে না পাওয়া শ্রমজীবী মানুষের জন্য ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও শ্রমজীবী ক্যান্টিন, কমিউিনিটি কিচেন, মানবতার বাজার, অক্সিজেন সরবরাহসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে বামপন্থী-কমিউনিস্টরা। মিছিল করছেন, প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। গুলিবিদ্ধ গার্মেন্টস শ্রমিক কাঞ্চন মিয়ার চিকিৎসার জন্য সার্বক্ষনিক তাঁর পাশে থাকছেন। তাঁর হয়ে দাবী উত্থাপন করছেন।

পাটকল বন্ধ হয়ে যে শ্রমিকরা বেকার হয়ে গেছে, যে শ্রমিকদের উপর গুলি চলছে, যে শ্রমিকরা বেতন-বোনাস পাচ্ছে না, যে কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যে রিক্সাওয়ালা লকডাউনে বের হলে রিক্সা উল্টে দেওয়া হয়েছে, যে মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আকাশসম বাঁধা পেরিয়ে ঈদে বাড়ি যাচ্ছে, তাদের সবার কাছেই কিন্তু দিনের আলোর মত পরিস্কার কাদের কারণে তাদের জীবনের এই দুর্ভোগ। কারা তাদের হত্যা করছে! তাদেরকে বুর্জোয়া-সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদ বোঝানো ছাড়াই, তারা এখন নিজেরাই স্পষ্ট বোঝে তাদের শত্রু কারা! শোষণের স্তর সম্পর্কে পুরোটাই জীবন দিয়ে ওয়াকিবহাল। এটাও জানা, এই সংকটকালীন সময়ে এসে কারা স্বল্প শক্তি নিয়ে হলেও তাদের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে।

কিন্তু ট্রাজেডি অন্যখানে! দিন শেষে এই নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষ কিন্তু তাদের উপর যারা নিপীড়ন চালায় সেই শাসকগোষ্ঠীর ছায়া তলেই ভিড় করে। দিন শেষে তাঁরা নৌকা-শীষ প্রতীকেই বিভক্ত হয়ে আছে। দেশের অধিকাংশ শ্রমিক-কৃষক লীগে বা দলে সংগঠিত। প্রশ্নটা এখানেই, কেনো এমনটি ঘটছে?? যারা তাদের পক্ষে কথা বলছেন, তাদের সাথে না থেকে যারা তাদের উপর নিপীড়ন চালাচ্ছে প্রতিনিয়তো, তাদের সাথে গাটছাঁড়া বাধছেন।

বন্ধুরা, যারা মানুষের এতো বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে ঈদে বাড়ি যাওয়ার কারণ গবেষণা করছেন, কেনো তাদের ট্রল করা হচ্ছে এই গবেষণা করছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন এটা নিয়ে গবেষণা হওয়া, কী কারণে তাঁরা আপনাদের সাথে থাকছে না। কেনো তাঁরা আপনাদের প্রতি আস্থাশীল না হয়ে তাদের নিপীড়কের উপরেই আস্থাশীল হয়ে আছে।

কারণ, এই যে, যা গবেষণা আর লেখালেখি হচ্ছে সেটা ঐ নিপীড়িত মানুষের কথা ভেবেই। তাদের ঈদে বাড়ি যাওয়ার মনস্তত্ব বোঝা এটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, তার চেয়ে আরো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়া উচিত, ৫০ বছরের বাংলাদেশে এতো নিপীড়নের পরেও গরীব কৃষক-শ্রমিক-মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত মানুষ কেনো তাদের নিপীড়কদের সাথে একাত্ব হয়ে আছে! এই বিষয়ে গবেষণার হার শূন্য!!

কেনো তাদের মধ্যে কার্যকর কোন শ্রেণী ঘৃণা তৈরি হচ্ছে না, কেনো প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না? এ বিষয়ে তাদের মনস্ততাত্ত্বিক ব্যাখা কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া এখন অনেক বেশি জরুরী। ব্যর্থতা-সীমাবদ্ধতা এগুলো বিশ্লেষণ ব্যতীত কারণ বের হয়ে আসবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ যদি না বোঝা যায় তবে ভুল চিকিৎসা হবে। সুতরাং সুস্থ হবার তো প্রশ্নই আসে না, বরং মৃত্যু হবার সম্ভাবনাটাই বেশি!!

৭০-৮০’র দশকে যে সংখ্যক কৃষক-শ্রমিক-মধ্যবিত্ত তাদের নিজেদের সংগঠনে সংগঠিত ছিলো আজকে ২০২১ সালে দাঁড়িয়ে বলা যায়, তুলনামূলক বিচারে তা শূন্যের কোটায়। কিন্তু বিষয়টি তো উল্টো হবার কথা ছিলো! সেই সময়ের সংকটের চাইতে এই সময়ের সংকট তো আরো অনেক বেশি প্রকট। তাহলে উল্টো চিত্র কেনো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

আজকের প্রজন্মকে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে। প্রগতিশীল ছাত্র বন্ধুদেরও ভাবতে হবে, তারা শ্রমিক-কৃষকের সন্তানদের শিক্ষার অধিকারের কথা বলছে, নির্যাতিত ছাত্রের পাশে দাঁড়াচ্ছে, কিন্তু সেই সন্তানরা সংগঠিত হচ্ছে তাদের উপর জুলুমকারী সংগঠনের সাথে। এ ক্ষেত্রে তাদের মনস্তত্ব কী বলে? একে অপরের সমালোচনার ভিতর দিয়ে হয়তো নিজের জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হতে পারে। কিন্তু তাতে আদৌও সমাধানের, প্রশ্নের উত্তর মিলবে না।

এই সমস্যা কিন্তু শুধু এখানেই নয়। পশ্চিমবঙ্গে সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনের কথা ভাবুন! সেখানেও বামপন্থীরা লুটপাটের বিরোধীতা করছেন, লকডাউনে কমিউনিটি কিচেন করছেন, করোনা আক্রান্ত রোগীর বাড়িতে রাত-বিরাতে অক্সিজেন নিয়ে যাচ্ছেন। যে জনগণের জন্য এসব করা তাঁরা কিন্তু তাদের পাশে না থেকে জোড়া ফুল আর পদ্ম ফুলের পাশেই থেকেছে! অর্থাৎ নিপীড়িত অংশ, যারা নিপীড়ক তাদেরকেই সমর্থন জানিয়েছে, যাতে আগামী পাঁচ বছর তাদের উপর বৈধভাবে নিপীড়ন, লুটপাট চালিয়ে যেতে পারে!!

শ্রমজীবী ক্যান্টিন, কমিউনিটি কিচেন বা মানবতার বাজার মানবিকতা। ক্ষমতা দখলের রাজনীতি আর মানবিকতা এক বিষয় নয়!! এটা বুঝতে না পারাটাই একটা অন্যতম সমস্যা। দেশের যে সমস্ত রাজনৈতিক দল নিপীড়কের বিরুদ্ধে কথা বলে, নিপীড়িতদের পাশে থাকে, এটা এক ধরনের মানবতা। রাজনৈতিক পরিভাষায় যাকে বলে ‘চ্যারিটেবেল মোড’। এই মোডে রাজনীতি পরিচালনা করলে উৎপীড়িত অংশকে উৎপীড়কের বিপরিতে দাঁড় করানো সম্ভব নয়।

যারা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ক্ষমতাতন্ত্র জারি রাখছে তাদের বিপরিতে রাজনীতির মোড যদি হয় চ্যারিটেবল তবে দিন যতো সামনে যাবে উৎপীড়িত অংশ ক্রমান্বয়ে উৎপীড়কের কাছে আরো বেশি জিম্মি হয়ে থাকবে। ‘চ্যারিটেবল মোডের’ রাজনীতি বরং লুটেরা এই রাষ্ট্রের ক্ষতকেই চুড়ান্তভাবে আঁড়াল করছে। বলেছিলাম, ৭০-৮০’র দশকে সংগঠনগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী ছিলো, কারণ বিশ্লেষণে একটি অন্যতম বিষয় সামনে উঠে আসবে সেটি হলো, রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে থাকলেও রাজনীতিটা ছিলো ‘পাওয়ার মোডে’।

অত্যাচারিত মানুষ কেনো বারবার অত্যাচারিত হবার জন্য অত্যাচারীকেই পছন্দ করছে সেটি জানা এখনকার প্রধান কাজ। কেনো অত্যাচারির বিরোধীতাকারী রাজনৈতিক শক্তির সাথে সখ্যতা গড়ে উঠছে না? কেনো লড়াইটা দানা বাঁধছে না?

কেনো ৪০ লক্ষ নিপীড়িত গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে ৫০ হাজার শ্রমিকও চুড়ান্তভাবে সাথে থাকছে না? এ সকল আন্দোলনকে কেনো তাদের নিজেদের আন্দোলন মনে করছে না? অত্যাচারিতদের এই মনস্তত্ব বোঝাটা এখন খুব জরুরী।

যে রাজনীতি নির্ধারণ করেছেন সেখানে ভুল, নাকি রণনীতিতে, রণকৌশলে, নাকি আশু রণকৌশলে? এগুলোর ফয়সালা হওয়া জরুরী এবং সেটি সম্মিলিত যৌথভাবে। আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, শোষণের ধরন বিশ্লেষণ এগুলো যথেষ্ট হয়েছে।

কিন্তু এবার সর্বাধিক মনযোগ দেওয়া প্রয়োজন এর কারণ খুঁজে বের করা এবং সমাধানের পথ তৈরি করা। এই প্রশ্নের মীমাংসা ব্যতীত যতোই শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের মুক্তির জন্য গলা ফাটিয়ে, আর সোসাল মিডিয়াতে আবেগ-আপ্লুত লেখা লিখে ভরে ফেলেন তা অবস্থা পরিবর্তনে বিশেষ কোন ভূমিকা রাখবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here