করোনার টিকা নতুন ধরন রোধে কতটা কার্যকর?

0
33

আব্দুল কাইয়ুম
আমরা প্রায়ই দেখছি, বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসের নতুন নতুন রূপ বা ভেরিয়েন্ট আসছে। এগুলোর কোনো কোনোটি মারাত্মক হারে সংক্রমণ ছড়ায়। রোগের তীব্রতাও বেশি। সম্প্রতি ভারতের দিল্লিসহ কয়েকটি রাজ্যে করোনার একটি নতুন ভেরিয়েন্ট খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। একপর্যায়ে হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন–সংকট বড় সমস্যা হয়ে ওঠে। সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বাড়তে থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশও শঙ্কিত হয়। অনেক দেশ করোনা চিকিৎসায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়।
এ পরিস্থিতিতে আবারও প্রশ্ন দেখা দেয়, নতুন নতুন ভেরিয়েন্টের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে করোনার টিকা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে? এর আগে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ভেরিয়েন্ট নিয়েও এ প্রশ্ন উঠেছে।
দুই-চার দিন আগে পত্রিকায় সুসংবাদ এসেছে, ভারতের করোনাভাইরাসের নতুন ভেরিয়েন্টের বিরুদ্ধে টিকা কার্যকর সুরক্ষা দেয়। এ বিষয়ে আমরা অন্তত একটি বিষয়ে স্থির নিশ্চিত হতে পারি, সবার টিকা নেওয়া থাকলে করোনাভাইরাস রোধে কার্যকর সুরক্ষা পাওয়া যাবে। যদিও অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম থাকবে। কারণ, যাঁদের বয়স অনেক বেশি বা যাঁদের জটিল রোগ থাকে, তাঁদের ক্ষেত্রে টিকার কার্যকারিতা কম হতে পারে। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, করোনার বিভিন্ন ভেরিয়েন্টের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য টিকার ভূমিকা অনেক বেশি।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছেন। ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ার অধ্যাপক ও যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএর (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) ভ্যাকসিন অ্যাডভাইজারি প্যানেলের সদস্য ড. পল অফফিট বলেছেন, করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করার ক্ষেত্রে প্রথম ডোজ টিকার তুলনায় ১০ গুণ অ্যান্টিবডি সৃষ্টিতে দেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে উদ্দীপ্ত করে। দ্বিতীয় ডোজ টিকা সেলুলার ইমিউনিটির সৃষ্টি করে এবং এর ফলে শুধু যে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা পাওয়া যায়, তা-ই নয়, নতুন ভেরিয়েন্টের বিরুদ্ধেও ভালো সুরক্ষা পাওয়া যায়।
সুতরাং আমরা বলতে পারি, করোনাভাইরাসের বিভিন্ন স্ট্রেইন হয়তো বেশি দ্রুত ছড়াতে পারে বা খুব দ্রুত রোগের তীব্রতা বাড়াতে পারে। কিন্তু টিকা নেওয়া থাকলে সুরক্ষা পাওয়া যাবেই। আর সংক্রমণ ঘটলেও এর তীব্রতা তেমন বেশি হবে না। হয়তো বাসায় নিজ ব্যবস্থাপনায় আইসোলেশনে কয়েক দিন থাকলে সুস্থ হয়ে ওঠা যাবে। অবশ্য নিয়মিত পালস-অক্সিমিটারে অক্সিজেনের মাত্রা দেখতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

সংক্রমণ আরও কমিয়ে আনতে করণীয়
এখন আমাদের প্রধান কাজ হলো স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলা। ঈদের আনন্দ অবশ্যই থাকবে, কিন্তু সেটা স্বাস্থ্যবিধির পরিসীমার মধ্যেই রাখতে হবে। যাঁদের দুই ডোজ বা এক ডোজ টিকা নেওয়া হয়ে গেছে, তাঁদের জন্যও একই নিয়ম প্রযোজ্য। তাঁদের এমন ভাবনা ঠিক হবে না যে টিকা নেওয়ার ফলে আর সংক্রমণের ভয় নেই। যত দিন পর্যন্ত দেশের জনসংখ্যার অন্তত ৭০-৮০ শতাংশ মানুষের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা না হবে, তত দিন সংক্রমণের আশঙ্কা কমবেশি সবারই থাকবে। টিকা নিলেও তাঁদের মাধ্যমে করোনাভাইরাস অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সুতরাং এ বিষয়ে সবার সচেতনতা দরকার।

জীবন ও জীবিকার জন্য
সীমিত চলাফেরা ও পদে পদে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মাস্ক পরা, আশপাশের মানুষের সঙ্গে অন্তত ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রাখা প্রভৃতি নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলা কঠিন হলেও সমাজের সবার মঙ্গলের কথা ভেবে আমাদের চলতে হবে। অবশ্য এখানে জীবিকার প্রশ্নটিও বড়। কারণ, যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের জন্য জীবিকার প্রশ্নটি উপেক্ষা করা যায় না। এখানে সরকার ও সমাজের বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এককালীন অর্থসহায়তা বা দুমুঠো চাল-ডাল সরবরাহের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা যেন প্রকৃত অভাবীদের কাছে পৌঁছায়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। হয়তো দ্রুতই আমরা সংকট কাটিয়ে উঠব। মনে রাখতে হবে, করোনার চলতি দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর আবার তৃতীয় ঢেউ আমাদের দেশে আসবে কি না, তা নির্ভর করে আমাদের সার্বিক সতর্কতার ওপর। এখানে আমরা চীনের উদাহরণ বিবেচনায় রাখতে পারি। সেখানে কিন্তু প্রথম ঢেউয়ের পরই করোনা শেষ। দ্বিতীয়-তৃতীয় ঢেউয়ের সুযোগই দেওয়া হয়নি। কারণ, স্বাস্থ্যবিধির প্রতিটি পদক্ষেপ কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। চীন পারলে আমরা পারব না কেন?
মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here