যশোরে ঈদের বাজারে মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি

0
36

মোকাদ্দেছুর রহমান রকি
ঈদ যতই নিকটবর্তী ততই স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়েই কেনাকাটা করছেন সব বয়সের মানুষেরা। শারীরিক বা নিরাপদ কোনো দূরত্ব মানার অবকাশ যেন নেই বিপনীগুলোতে বিক্রেতা ও ক্রেতাদের মধ্যে। হাত ধোয়া বা হ্যান্ড স্যানিটাইজড করার জন্যও নেই কোনো সুব্যবস্থা। স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলছে কেনাকাটা।
তাছাড়া, স্বাস্থ্য বিধি না মেনেই ইজিবাই চালকেরা ভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব মানছেনা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শহরের বিভিন্ন সড়কে এবং মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিতে দেখা গেলেও জনতার চাপে তারা অসহায় হয়ে পড়েছেন। ৫ মে বুধবার সরেজমিনে যশোর শহরের মার্কেটগুলো ঘুরে দেখা যায়, বড় বাজারে তৈরি পোশাক, দর্জির দোকান, শাড়ি কাপড়, জুতা স্যান্ডেল ও কসমেটিকসের দোকানে ক্রেতাদের ভিড়। গায়ে গায়ে লাগিয়ে ও এমনকি ধাক্কাধাক্কি করেও পণ্য কিনছেন ক্রেতারা।
এদিকে করোনা ভাইরাসকে পুঁজি করে দোকান বন্ধ হয়ে যাবে এমন কথা বলে দ্রুত বিক্রি করছে বিক্রেতারা। কোনো দরদাম ছাড়াই জামা-কাপড় কিনতে দেখা গেছে ক্রেতাদের। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে নারী ক্রেতাদের চাপ দোকানগুলোতে সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়।
এদিকে মার্কেটগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভীড় দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। শারীরিক সুরক্ষার কথা ভুলে গিয়ে একে অপরের গা-ঘেঁষে কেনাকাটায় মগ্ন হয়ে পড়েছেন তারা। দেখে মনে হয় ঈদ উৎসবের আনন্দে ভুলে গেছেন লকডাউনের কথা। অনেকে বলছেন, যেহেতু আমরা সচেতন নই তাই কোনো কিছু দিয়েই মানুষের ভিড় ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। তবে দোকানে নিরাপদ দূরত্ব মেনে কেনাবেচা করার জন্য দোকানদারদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। নির্দেশনা বাস্তবায়নে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হয় বৃষ্টি। বেলা বাড়ার সাথে কমতে থাকে। যশোরের ঈদ বাজারে সকালে ভিড় কম থাকলেও দুপুরের পর থেকে বাড়তে থাকে মানুষের সমাগম। করোনার সংক্রমণের শঙ্কা যেন কেনাটাকা করতে আসা মানুষের কোনও তোয়াক্কা নেই। মানুষজন কেবল কোনোমতে মাস্কটা ঝুলিয়ে কেনাকাটা করতে ব্যস্ত।
সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শপিং করার কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিলেও তা যেন কারোরই কানে ঢুকছে না। সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ মানছেন না কেউ। ঈদে কেনাকাটা করতে আসা বেশিরভাগেরই সঙ্গে মাস্ক থাকলেও তা সঠিকভাবে পরা নেই। কারোরটা থুতনিতে, কারোরটা কেবল মুখ ঢেকে নাক বাইরে রাখা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রোজার অর্ধেক সময় আমরা ব্যবসা করতে পারিনি। তারপর গণপরিবহন বন্ধ থাকায় অন্যান্য উপজেলা থেকে কাস্টমার আসতে পারছেন না। যার জন্য আমরা সেসব ক্রেতা বঞ্চিত হচ্ছি। নাম না প্রকাশ করার শর্তে একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, একে তো ব্যবসা মন্দা, তারপর শহরের গাড়িখানাস্থ পুলিশ কাব মাঠে সম্প্রতি শুরু হওয়া অস্থায়ী বাজারের নামে পণ্যমেলা শুরু হয়েছে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। এ বিষয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
সুমনা হক নামে এক তরুণী বলেন, এমনিতে রোজার অর্ধেক চলে গেছে। শুরুর দিকে মার্কেট বন্ধ থাকায় ঈদের জামা কেনা হয়নি। এরপরে তো টেইলার কাপড় নেবে না। তাই তাড়াহুড়ো করে গজ কাপড় ও থ্রিপিস কিনলাম। এবার যাবো টেইলার্সে।
সরেজমিনে যশোরের বাজারে দেখা যায়, শিশু পোশাকের দোকানে বেশি ভিড়। শহরের বারান্দি মোল্যাপাড়ার বাসিন্দা জিল্লুর রশিদ বলেন, বড়দের কথা তো বাদই দিলাম। তবে শিশুদের ঈদে নতুন পোশাক না হলে কীভাবে হয়। জানি না ঈদের সময় কি পরিস্থিতি হয়। তারপরও নতুন পোশাক তো লাগে।
গার্মেন্টস ব্যবসায়ী দেখা ফ্যাশনের প্রোপাইটর মান্না দে লিটু বলেন, গেল ২/৪ দিন বেচাকেনা বেড়েছে। তবে রাত ৮ টায় দোকার বন্ধ করার নির্দেশ থাকায় ইফতারের পরে কোনা কাস্টমার বাজার মুখি হচ্ছেন না। তিনি আরও বলেন এবার দেশি পোশাকের চাহিদা বেশি। ভিসা বন্ধ থাকায় ইন্ডিয়ান পোশাক আনতে পারেনি ব্যবসায়ীরা। তবে লকডাউনের কারণে ঢাকায় গিয়ে ঈদের পোশাক এবার আনা সম্ভব হয়নি। মোবাইল বা ল্যাবটপে পোশাকের ছবি বা ক্যাটালক দেখে পোশাকের অর্ডার দিতে হচ্ছে এবং তা কুরিয়ারে আসছে। এ ব্যবসায়ী আরও বলেন, এবছর পোশাকের দাম রিজেনেবল। রোজার প্রথম ১৫ দিনে ব্যবসা ভালো হয়। সেটা না পুষাতে পারলেও শেষ কদিনে বিক্রি ভালো হবে বলে আশা করছি।
ছিট কাপড় ব্যবসী যশোর কথ স্টোরের প্রোটাইটর বজলুর রশিদ বলেন, মূলত রোজার প্রথম দিকে আমাদের দোকানে কাস্টমারের চাপ হয়। তবে এবছর করোনা ও লকডাউনের কারণে দোকান বন্ধ ছিলো। চলতি সপ্তাহে ব্যবসা ভালো হচ্ছে।
জুতা ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বছরের অন্য সময়ের তুলনায় দুই ঈদে সবচেয়ে বেশি জুতা বিক্রি হয়। ঈদে বেচাকেনা ভালো হলে জুতাখাতের করোনার ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
যশোর শাড়ি কাপড় ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তন্ময় সাহা বলেন, দোকানে বেশি ভিড় করতে দেই না। পছন্দ না হলে ক্রেতাদের দ্রুত দোকান ত্যাগ করতে বলি। তাছাড়া এবার সামান্য লাভ হলেই বিক্রি করে দিচ্ছি। বর্তমান করোনা সমস্যা কারো একার সমস্যা নয় এটা সবার সমস্যা। তাই সব ক্রেতাদেরকে অনুরোধ করছি তারা যেন নিজেরা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ম মেনে কেনাকাটা ও চলাফেরা করেন। সেই সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক পক্ষ ও সমিতির দোকান মালিকদের নির্দেশনা দেয়া আছে তারা নিজেরা স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী ক্রেতাদের দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টার করার মাধ্যমেই ব্যবসা-বাণিজ্য অব্যাহত রাখবেন।
রিমা রহমান নামের এক ক্রেতা বলেন, দোকানপাট যদি আবারও সব বন্ধ করে দেয় সরকার। এজন্য তাড়াতাড়ি করে কেনাকাটা করতে এসেছি। বাচ্চাদের তো নতুন জামাকাপড় দিতে হবে ঈদে। এভাবে মার্কেটে বিচরণ করলে তো করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবাই তো আসতাছেন। কেউ তো আর মার্কেট করা বাদ দেয় নাই। বাচ্চারা কান্নাকাটি করে।
কেনাকাটা করতে আসা ফাতেমা বেগম জানান, তিনি তার ১২ বছর বয়সী ছেলের জন্য জুতা আর নিজের জন্য একটি থ্রিপিস কিনতে এসেছেন। নিজে মাস্ক পড়লেও ছেলের মুখে মাস্ক ছিল না। এভাবে ঝুঁকি নিয়ে কেনাকাটার কারণ জানতে চাইলে ওই গৃহবধূ কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলেন, করোনা নিয়ে আর ভয় দেখাবেন না। যা হবার হবে। এখন একটু কেনা-কাটা করতে দিন।
শিশু পোশাক ব্যবসায়ী ডোরেমনের প্রোপাইটর রিপন হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, করোনা ও লকডাউনের কারণে ব্যবসা এতো দিন বন্ধ ছিল। ঈদকে সামনে রেখে খোলার সুযোগ পেয়েছি। ক্রেতারাও আসছে অনেক। এত মানুষের জন্য তো স্বাস্থ্যবিধি মানা কষ্টকর। তবে আমরা মাস্ক ব্যবহার করছি। ক্রেতাদের মাস্ক পরতে সচেতন করছি। বিভিন্ন টেইর্লাসের মালিকেরা বলেন, গত বছরও করোনার জন্য ব্যবসা ভালো হয়নি। এবছরও লকডাউনের কারণে অর্ডার পায়নি। এপ্রিলের ২৫ তারিখ থেকে দোকান খোলার সুযোগ হয়েছে। এর মধ্যে ভালো অর্ডার পাচ্ছি। সময় মতো তা সরবরাহ করতে পারবো কিন বলতে পারছিনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here