চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি

0
25

মো. আব্দুল কুদ্দুস সিকদার
বিপ্লব মানেই সফলতা, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন। ১৭৮৪ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিস্কারের মধ্য দিয়ে প্রথম শিল্পবিপ্লব; ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ আবিস্কারে মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব এবং ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেট আবিস্কারের মধ্য দিয়ে তৃতীয় শিল্পবিপ্লব সংঘটিত হয়। এর ফলে মানব সভ্যতার গতিপথে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হয়ে ব্যাপক পরিসরে দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল বিপ্লবকে বলা হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। বিশ্নেষকদের মতে, অতীতের সব বিপ্লবকে ছাড়িয়ে যাবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। যন্ত্র বা প্রযুক্তি যখন কাজের বিকল্প হবে, তখন কর্মক্ষেত্রে মানুষের চাহিদা কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। ফলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে জনশক্তিনির্ভর অর্থনীতির দেশ বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি বড় অংশ কর্মহীন হয়ে পড়বে এবং স্বল্প পুঁজির রাষ্ট্রগুলোর চ্যালেঞ্জ অনেক বেড়ে যাবে। ৫-জি প্রযুক্তির ইন্টারনেট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে শ্রমবাজারে। যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটাবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। যার ফলে অনেক পেশা পড়বে হুমকির মুখে। তবে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ জনশক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রের জন্য চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হবে বিশাল সম্ভাবনার এবং দক্ষতার মাধ্যমে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার অপার সুযোগ।
এখন জ্ঞানের বহু ওপেন রিসোর্স রয়েছে। ডিজিটাল কাসরুমে শিক্ষক আর এককভাবে জ্ঞানের উৎস নন। তিনি এখন শিক্ষার্থীদের গাইড করছেন। শিক্ষার্থীরা কোন কোন উৎস থেকে তথ্য পেতে পারে, তা স্পষ্ট করে দিচ্ছেন। শিক্ষকদেরও কিন্তু এখন নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিষয় আছে। কিন্তু নতুন পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি কতটুকু? যেহেতু চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হবে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ জনশক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রের জন্য বিশাল সম্ভাবনার, সুতরাং সেই সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় জনগোষ্ঠীকে যেসব দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন, তার প্রয় পুরোটাই নির্ভর করবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। শিক্ষাক্রম হলো নিজস্ব আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক; একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চাহিদার আলোকে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ও শিক্ষার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সুনির্দিষ্ট, সুপরিকল্পিত ও পূর্ণাঙ্গ একটি পথনির্দেশ। আগামী দিনের সৃজনশীল ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সমস্যা সমাধানে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার দিকনির্দেশনাও থাকে শিক্ষাক্রমে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী প্রত্যাশিত শিক্ষাক্রম কেমন হওয়া উচিত, তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। এ ক্ষেত্রে পাঠ্যবইকেন্দ্রিক শিক্ষাক্রম চিন্তা থেকে বের হয়ে কর্মনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মুখস্থ করার পরিবর্তে আত্মস্থ, বিশ্নেষণ ও সূত্রের প্রায়োগিক দিককে শিক্ষাক্রম প্রণয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন এবং মৌলিক অর্জনের ওপর। লার্ন, আন-লার্ন এবং রি-লার্ন পদ্ধতির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। বর্তমানে বিদ্যমান শিখন কার্যক্রমের সঙ্গে ডিজিটালনির্ভর অন্যান্য ব্যবস্থা যেমন ই-লার্নিং এবং অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অর্থাৎ প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার উপযোগী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করতে হবে।
অনেকেই মনে করেন, শিক্ষা পরিকল্পনায় সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন। কিন্তু সাধারণ শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার সমন্বয় সাধন করতে গেলে কোনোদিকেই ভালোভাবে নজর দেওয়া সম্ভব নয়। এ ধরনের মিশ্রিত শিক্ষা চালু করতে গেলে সরকারের ব্যাপক আর্থিক বিনিয়োগ যেমন করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও উভয় শিক্ষার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। তেমনি শিক্ষার্থীরাও দু’ধরনের শিক্ষায় তাল মিলাতে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। তাই নির্ধারিত পর্যায় পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা অর্জনের পর কারিগরি শিক্ষা অর্জনে শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করতে হবে এবং যারা প্রফেশনাল জব ও গবেষণায় আগ্রহী তারা ব্যতীত অন্যদের গণহারে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে অনুৎসাহিত করা উচিত।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। তাই এ ক্ষেত্রে দুর্যোগকালীন শিক্ষাব্যবস্থার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। সাম্প্রতিক করোনাকালে বাংলাদেশে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে শিক্ষাদানসহ পরীক্ষা গ্রহণ কার্যক্রম চলমান। কিন্তু শিক্ষকদের ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে শিক্ষাদানসহ পরীক্ষা গ্রহণ কার্যক্রম পরিচালনায় উপযোগী করে তোলা হয়েছিল কি? ভবিষ্যতে এ ক্ষেত্রে উপকরণ সরবরাহসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়কে পারদর্শী করে তুলতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সফল হলে মানুষের চিন্তা-চেতনা, সুখ-দুঃখ, চাহিদা বা প্রত্যাশার অনেক কিছুরই ভার্চুয়াল বাস্তবায়ন ঘটবে প্রযুক্তির মাধ্যমে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মানবিক মূল্যবোধ। কারণ মানুষের মানবিক মূল্যবোধকে নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে এনে প্রযুক্তির মাধ্যমে কতটা বাস্তব রূপ দেওয়া যাবে- এ বিষয়টি যথেষ্ট ভাবনার। তাই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সফল বাস্তবায়ন নিয়েও মতভেদ রয়েছে। তবে বাস্তবায়নের কৌশল প্রণয়নের ক্ষেত্রে দেশীয় সংস্কৃতি ও নৈতিক শিক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখার বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তাই বর্তমান শিক্ষানীতির সংযোজন-পরিমার্জন করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
সাধারণ সম্পাদক, শিক্ষক পরিষদ, ঢাকা কলেজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here