করোনা: তথৈবচ অবস্থা!!

0
13

আবু নাসের অনিক
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুসারে তৃতীয় ধাপের মত লকডাউন চলছে। কিন্তু লকডাউন বা বিধিনিষেধ যেটাই বলি না কেনো, সেটি কী আদৌও হচ্ছে? মুভমেন্ট বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই তো লকডাউন! অবস্থাদৃষ্টে কী সেটা বোঝা যায়, বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ কোনটা কার্যকর আছে? প্রকৃত অর্থে কিন্তু কিছুই কার্যকর নেই। এবং সরকারও জানে, এটা কিছুই হচ্ছে না। যা হচ্ছে সেটা লক ডাউনের নামে তামাশা।
প্রতিনিয়ত জনসমাগম এড়িয়ে চলার কথা বলা হলেও মার্কেট-শপিং মলের দিকে তাকালেই বোঝা যায় কতো ঘনত্বে জনসমাগম ঘটছে। যেখানে শারীরিক দূরুত্ব বজায় রাখার কথা, সেখানে আত্মীয়-অনাত্মীয় একজন আরেক জনের গায়ের সাথে লেপ্টে থাকছে। অধিকাংশই মাস্ক ব্যবহার করছে না। ব্যবসায়ীদের স্বাস্থ্যবিধি পালনের হার খুবই নাজুক। অথচ দোকান মালিক সমিতির পক্ষ থেকে উচ্চ কন্ঠে বলা হয়েছিলো, স্বাস্থ্যবিধি মেনে তারা দোকান খুলবেন।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে মার্কেট আর শপিং মল এই মুহুর্তে যে চালু রাখা যায় না তা ইতিমধ্যে বারে বারে প্রমাণিত হয়েছে। সংক্রমণের নাজুক পরিস্থিতিতে যতোবার এমনভাবে মার্কেট খোলা হয়েছে, কোনবারই না মার্কেট কর্তৃপক্ষ না ক্রেতা কারো পক্ষেই স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি। গত বছরের অভিজ্ঞতা বলে, মার্কেটে জনসমাগম ও ঢাকা থেকে দলে দলে লোকজন দেশের নানা প্রান্তে যাবার কারণে সংক্রমণ ঈদের পর উচ্চ হারে বেড়ে গিয়েছিলো। সেটার অভিজ্ঞতা থাকার পরেও আমরা পূর্বের থেকে যেকোন শিক্ষা গ্রহণ করিনা, এটাই তার বাস্তব প্রমাণ।
গত ঈদের সময়ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ মার্কেট খোলা, বাড়ি যাবার সুযোগ তৈরি করার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। এবারও করছেন। কিন্তু সরকার গতবারের মত এবারও কর্ণপাত করছে না। গত বছর ঈদের পরেই শনাক্তের হার ২২-২৩% এ পৌঁছেছিলো। তার তুলনায় এবার পরিস্থিতিটা আরো অনেক বেশি নাজুক।
কয়েক দিন আগে মানুষ অবাধে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে গেছে, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান করে জনসমাবেশ ঘটিয়েছে। আর সরকার নিশ্চুপ থেকে সেগুলো করতে দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়াতে সংক্রমণ অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। সরকার বলা শুরু করলো, জনগণ ঘোরাঘুরি করে এই অবস্থা সৃষ্টি করেছে। এখনও এই লকডাউনের মধ্যে ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নিমূর্ল) আইন-২০১৮’ ভঙ্গের মাধ্যমে সরকার সবকিছু ওপেন করে দিয়ে জনসমাগমের পরিবেশ সৃষ্টি করছে। এর প্রতিক্রিয়ায় সংক্রমণ আবোরো বেড়ে যাওয়ার আশংকা তৈরি হচ্ছে। সরকার যথারীতি পূর্বের ন্যায় বলবে, মানুষ-জন মার্কেট-শপিংমলে যেয়ে এই অবস্থা সৃষ্টি করেছে।
অথচ সরকার কিন্তু জানে, এভাবে একসাথে সবকিছু ওপেন করে দিলে জনগণকে সামলানো যাবে না। তাদেরকে স্বাস্থ্যবিধিও মানানো যাবে না। তারপরেও মার্কেট খুলে দেওয়ার অর্থ হলো সংক্রমণ পরিস্থিতি নাগালের বাইরে নিতে সহায়ক ভূমিকা নেওয়া। আজ থেকে ভারতসহ সকল আন্তর্জাতিক ফাইট ওপেন করা হয়েছে।
অবশ্য কিছু শর্তারোপ করা হয়েছে। ট্রাজেডি হল, তারা এই সকল শর্ত যথাযথভাবে পালন করতে পারে না। পারে না বলেই দেশ আজ কোভিড সংক্রমিত। ইউকে, দ:আফ্রিকা ভ্যারিয়েন্ট দেশে ঢুকতে পেরেছে। লকডাউন চলাকালীন সময় পর্যন্ত অন্তত এ সমস্ত ফাইট খুলে না দেওয়া, অন্য সবকিছু বন্ধ রাখা যুক্তিযুক্ত ছিল।
সংক্রমণ পরিস্থিতি গত কয়েক দিনের তুলনায় একটু স্তিমিত পর্যায়ে এসেছে। এটাকে গত ১৪ দিনের লকডাউনের হাফ রেজাল্ট হিসাবে ধরা যায়। কিন্তু তার অর্থ এই নয়, এটা নিয়ন্ত্রণ হয়ে গেছে। গত ১৫ দিনে (১৭এপ্রিল-১ মে) শনাক্ত হয়েছে ৪৮ হাজার ৮০৫, টেস্ট হয়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজার ৩৬১। শনাক্তের হার ১৩.৯২%, মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৩২৮, মৃত্যুর হার ২.৭২%(করোনা.গভ.ইনফো)। এগুলো সরকারের পরিসংখ্যান, এটাই যথেষ্ঠ এলার্মিং। এখানে টেস্টের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে ২০% আছে স্ক্রীনিং টেস্ট। সে হিসাবে শনাক্তের হার ১৭.৪১%। ১৩-২৬ এপ্রিল এই ১৪ দিনে উপসর্গে মৃত্যু ১৯ জন (বিপিও)। অর্থাৎ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সংক্রমণের যে তথ্য জাতিকে জানায়, প্রকৃত পরিস্থিতি আরো অনেক বেশি নাজুক।
বর্তমানে করোনা সংক্রমণ বিষয়ে তিনটি প্রধান ঝুঁকি রয়েছে। প্রথমত, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সংক্রমণের ভয়াবহ পরিস্থিতি, দ্বিতীয়ত, দেশে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে লাগামহীন জনসমাগম, আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের ঢাকা ছাড়ার সম্ভবনা। এই তিনটি ঝুঁকিই দেশের সংক্রমণ পরিস্থিতিকে পূর্বের যেকোন সময়ের চাইতে ভয়াবহ করে তুলতে পারে। তিন ঝুঁকি এড়াবার প্রশ্নে, সরকার জনস্বাস্থবিদদের পরামর্শ উপেক্ষা করছে।
ভারতের বিজ্ঞানীরা ফেব্রুয়ারির শুরুতেই করোনার ভারতীয় ধরন (বি.১.৬১৭) শনাক্ত করেন। মার্চের শুরুতেই জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিজ্ঞানীদের পক্ষ থেকে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারকে এই ভাইরাসের ভয়ংকর পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করা হয়। সরকার তা অয়াত্তা দেয়নি। সংক্রমণ প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞরা এপ্রিলের শুরুতেই ভারতজুড়ে লকডাউনের পরামর্শ দিলেও সরকার সেটি শোনেনি। বরং লাখ লাখ মানুষ মাস্ক না পরে, শারীরিক দুরত্ব না মেনে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব, ভোটের সমাবেশে যোগ দিয়েছে। ফলে সংক্রমণ শুরুর পর থেকে গত শুক্রবার ভারতে সারা বিশ্বের মধ্যে রেকর্ড হয়েছে, একদিনে ৪ লাখের বেশি মানুষ শনাক্ত হওয়া। একদিনে ৩ হাজার ৬৩৭ জনের মৃত্যু(ওয়ার্ল্ডওমিটার)।
বাংলাদেশ ও ভারতের শাষকগোষ্ঠীর মধ্যে এ ক্ষেত্রে খুবই সাদৃশ্য পাওয়া যায়। কারণ উভয়ই কর্তৃত্ববাদী। বাংলাদেশের সরকারও একইভাবে জনস্বাস্থ্যবিদদের, বিজ্ঞানীদের অধিকাংশ পরামর্শ উপেক্ষা করে। তাঁরা বারে বারেই ভারতের উদাহরণ সামনে রেখে সর্তক করলেও, তাঁদের পরামর্শ উপেক্ষা করে লকডাউনের মধ্যে মার্কেট-শপিংমল, আন্তর্জাতিক ফাইট ওপেন করে দিয়েছে। এই মুহুর্তে সতর্কতার সাথে প্রতিরোধে পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে যেকোন সময় আমাদের পরিস্থিতি ভারতের মতো টার্ন করতে পারে। এ বিষয়ে বারে বারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেও সরকার বধির হয়ে আছে।
ইতিমধ্যে যশোরে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসা ১৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। প্রতিদিন এতো পরিমাণ যাত্রী ঢুকছে যে বেনাপোল, ঝিকরগাছা ও যশোর শহরের হোটেলের সিট আর কোয়ারেন্টাইন করার জন্য খালি নেই। তাদের পার্শ্ববর্তী জেলা নড়াইলে পাঠানো হচ্ছে। এমন অবস্থায় এয়ারপোর্ট ওপেন করে দেয়া আরো ঝুঁকি তৈরি করলেও কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তে অনড়।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ যৌথভাবে সরকাররি হাসপাতালে করোনা রোগী প্রতি সরকারের কত টাকা ব্যয় হয় তার ওপর একটি গবেষণা করা হয়। ঢাকা শহরে ৪ টি সরকারি ২ টি বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য গ্রহণ করা হয়। এই ৬ টি হাসপাতালে গবেষণাকালে সেবা নিয়েছে ৭০ হাজার ৩১৪ জন। ৪ টি সরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার জন্য সরকারি ব্যয় হয়েছে ৪৬৬ কোটি ৭ লাখ টাকা। দুটি বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয় ২৪ কোটি ৭৩ লাখ। মোট ৪৯০ কোটি ৮০ লাখ টাকা (প্র.আ.-০১/০৫/২১)। পাঠক, বুঝতেই পারছেন করোনা সংক্রমণের কারণে সরকার ও ব্যক্তি পর্যায়ে যা ব্যয় তা এই সময় লকডাউনের অর্থনৈতিক ক্ষতির চাইতে কোন অংশে কম নয়!
এটা অনেকটা তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের ক্ষতি ও আয়ের সাথে তুলনীয়। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমান ছিলো ৩০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। আর জিডিপিতে তামাক খাতের অবদান ছিলো ২২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। যা এই খাতে অর্থনৈতিক ব্যয়ের চেয়ে ৭ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা কম (বিএনটিটিপি)। অথচ অর্থনৈতিক ক্ষতিকে আড়াঁল করে শুধুমাত্র জিডিপির প্রচারণাটাই করে থাকে সরকার ও তামাক কোম্পানী।
লকডাউনে অর্থনীতির কী পরিমান ক্ষতি হচ্ছে সেটি নিরুপণের কোশেশ হচ্ছে। কিন্তু সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে কী পরিমাণ অর্থনৈতিক ব্যয় ও ক্ষতি হচ্ছে বা লকডাউনের কারনে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এনে এই অর্থনৈতিক ব্যয় কতোটা হ্রাস করা সম্ভব হচ্ছে সেই গবেষণা অনুপস্থিত। কিন্তু এটি করা জরুরি। মানুষের মৃত্যুর কোন আর্থিক মূল্য হয় না, কিন্ত একজন দক্ষ কর্মক্ষম (ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ, চাকুরীজীবী, ব্যবসায়ী বা অন্য কোন পেশার) মানুষ গড়ে তোলার আর্থিক ব্যয় এবং একই সাথে জাতীয় অর্থনীতিতে (জিডিপি) তার আর্থিক অবদান নিশ্চয়ই গবেষণার মাধ্যমে বের করা সম্ভব। করোনা সংক্রমণে যে মৃত্যু ঘটছে এর ধারাবাহিকতায় তার আর্থিক ক্ষতির মূল্যও বের করা সম্ভব। এই সকল ক্ষতির বোঝা এক করলে বোঝা যেতো আসল লাভ-ক্ষতি কোথায়! আমার ধারণা সেটি তামাকের হিসাবের মতোই হয়তো হতো!!
‘বাঙলার বুকে কালো মহামারী মেলেছে অন্ধপাখা আমার মায়ের পঞ্জরে নখ বিঁধেছে রক্তমাখা তবু আজ দেখি হীন ভেদাভেদ! আমরা মেলাব যত বিচ্ছেদ; আমরা সৃষ্টি করব পৃথিবী নতুন শতাব্দীর।।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here