অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম কতটুকু সহায়ক?

0
14

পিন্টু ভৌমিক
কভিড মহামারির কারণে গত বছরের মার্চ মাসে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা হলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দাবি ওঠে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালুর। এ সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এই দাবিতে বেশি সোচ্চার হতে দেখা যায়। এর বড় কারণ ছিল এই প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণভাবে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের ফির ওপর নির্ভরশীল। খুব সংগত কারণেই আশঙ্কা দেখা দেয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হলে সংশ্নিষ্ট শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মীদের বেতন-ভাতাদিও বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের দাবিটি অনেকের বিবেচনায় গুরুত্ব পেতে থাকে।
এমনিতেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা বেশ ব্যয়বহুল। এর ওপর যদি শিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যেতে হয়, তবে তা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এ ধরনের ভাবনায় কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকার কথা নয়। বিষয়টি শুধু মোটা অঙ্কের টিউশন ফি প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তা নয়। এর পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থীকে শহরে বাড়ি ভাড়া অথবা মেসে থেকে পড়তে হয়, এতেও প্রয়োজন হয় অতিরিক্ত অর্থের। বোধ করি, এতসব ভাবনা থেকেই অনেক অভিভাবক অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের প্রতি মৌন সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। এ সময় অনেক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ রাস্তায় প্রতিবাদ তুলেছিল। তাদের এই প্রতিবাদ অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের বিরুদ্ধে- এমনটা বলা কোনোভাবেই সংগত হবে না। করোনাকালীন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের দুরবস্থার কথা বিবেচনা করে টিউশন ফিসহ অন্যান্য ফি মওকুফ করা হোক- এ দাবিতেই আন্দোলন করেছিল তারা। ঠিক এ সময় খুব পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, কোনো কোনো মহল থেকে এই বাস্তবতার বিপরীতে যুক্তি প্রদর্শন করে বলা হলো- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা মূলত ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলেমেয়ে। অতএব করোনাকালীন শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করার মতো তাদের যথেষ্ট আর্থিক সংগতি রয়েছে। এর ফলস্বরূপ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিটিও শেষ পর্যন্ত উপেক্ষিত হলো। এ রকম পরিস্থিতিতে ইউজিসির সঙ্গে আলোচনা করে সরকারের কিছু বেঁধে দেওয়া শর্তে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি লাভ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
এ সিদ্ধান্তের পর খুব সাধারণভাবে প্রথমেই যে চিন্তাটি মাথায় আসে তা হলো- কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করবে? শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা, তাদের সামর্থ্য, প্রযুক্তিগত সুবিধাদি, শিক্ষকগণের দক্ষতা, সর্বোপরি এর পরিচালন ব্যবস্থাপনাটি কেমন হবে? হয়তো এমন ভাবনাগুলো কম-বেশি সবার মধ্যেই কাজ করেছে। প্রয়োজন ছিল সীমিত সময়ের মধ্যে হলেও এ নিয়ে স্টাডি অথবা বিশ্নেষণের। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ রকম কিছু করেছে বলে শুনিনি। প্রায় এক বছরের মতো এ ধরনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আরও কত দিন চলবে তাও অনুমান করা কষ্টসাধ্য।
কিন্তু এ পর্যায়ে এসে অভিভাবক হিসেবে আমাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, তারা কি কাজটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোনো গাইডলাইন তৈরি করেছে? সত্যিকার অর্থেই কি কাজটি সুনির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইনের আওতায় চলছে? নাকি যে যার মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন? যদি দ্বিতীয়টি ঘটে থাকে তাহলে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ভয়ানক হুমকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
সাধারণ বিবেচনা বোধ থেকে বলতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাস, পরীক্ষা, ফলাফল ইত্যাদি পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম/নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু করোনাকাল স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। বলতে গেলে গোটা পৃথিবী প্রায় স্থবির হয়ে গেছে। কাজেই এই পরিস্থিতিতে কী ধরনের নিয়ম-শৃঙ্খলায় কার্যক্রমটি পরিচালিত হবে বা হচ্ছে তার জন্য সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত নির্দেশনা তৈরি ও অনুসরণ জরুরি বলেই মনে করি। এই সংকটের সময় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির বিষয়টি বিবেচনা না করে চালু করা এই পদ্ধতিতে ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষার্থী সমস্যায় পতিত হয়েছে এবং হচ্ছে।
একদিকে টিউশন ফি, অন্যদিকে আহার-বাসস্থানের খরচ, এর ওপর ব্যয়বহুল ইন্টারনেট সার্ভিস ক্রয় করে ভিডিও কলের মাধ্যমে কাস করতে গিয়ে মহাফ্যাসাদে পড়ে গেছে অনেক শিক্ষার্থী। যুক্ত আছে নেটওয়ার্ক সমস্যা। কখনও শব্দ আসে তো ছবি আসে না, শিক্ষার্থীরা খোলা মাঠ বা ছাদে গিয়ে নেট পাওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে, কিছুই বুঝে উঠতে না পেরে একপর্যায়ে হাল ছেড়ে দিচ্ছে কেউ কেউ, সময়মতো কাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারছে না। এ ধরনের সমস্যায় অনেকেই কাস-পরীক্ষার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে- এগুলোই হলো বর্তমান অনলাইন সিস্টেমের বাস্তব চালচিত্র।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সম্মানিত শিক্ষকের মুখেও এ ধরনের কথা শুনেছি। তারা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে যেটা বলেছেন- অনলাইনের কিছু কাসে উপস্থিতি ভালো পেলেও ধীরে ধীরে তা কমে এসেছে। আবার কাস চলাকালীন যাদের প্রথমে দেখা যাচ্ছে তাদের মাঝখানে বা শেষের দিকে দেখা যাচ্ছে না। এসবের জন্য তারা প্রধানত নেট সার্ভিসের দুর্বলতাকেই দায়ী করেছে। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে কি ভয়ানক কষ্ট করে শিক্ষার ব্যয় মিটিয়ে চলেছেন, তা কি ভেবে দেখছেন কেউ? ইতোপূর্বে অনেক শিক্ষার্থী টিউশনি করে পড়াশোনার ব্যয় মিটিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে সে সুযোগটিও নেই বললেই চলে। ফলে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত।
স্বাভাবিক ধারার বাইরে সম্পূর্ণ নতুন ধারায় হাজারো সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে পড়ালেখায় শিক্ষার্থীদের কতটা মনোযোগী হওয়া সম্ভব, তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে অগ্রসর হলে অনেক শিক্ষার্থী শেষ প্রান্তে এসে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়বে। এ ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা কি শুধু কাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ? পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান, লাইব্রেরি, নিয়ম-নীতি এগুলো সব সময় শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিতে বড় ধরনের অবদান রাখে। সে সুবিধা অনলাইনে কোনোভাবেই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
অনেক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দেশেও সম্ভব নয় বলেই আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়। এমন অনেক বিষয়/কাস রয়েছে, যা মুখোমুখি পাঠদান ছাড়া অনলাইনে বোঝানো সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে সরাসরি পাঠদানের সঙ্গে যুক্ত সম্মানিত শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিশেষ উদ্যোগ জরুরি। বিশেষ করে যারা নানা কারণে সিডিউল অনুযায়ী কাস-পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না, তাদের প্রতি বিরাগভাজন না হয়ে তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং কার্যকর সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
কভিড পরিস্থিতি মানুষকে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। শিক্ষার্থীরা এক বছরের বেশি সময় ধরে ঘরবন্দি। ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। কেউ এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারছি না এ সমস্যা সহসাই কেটে যাবে। হয়তো আরও অনেকটা সময় এই ব্যবস্থার মধ্যেই পড়ালেখাসহ সবকিছু চালিয়ে যেতে হতে পারে। আমরা আশা করব, শিক্ষকবৃন্দ শিক্ষর্থীদের শিক্ষাজীবন অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে কার্পণ্য করবেন না। আমরা প্রত্যাশা করি, ইউজিসি উপরোক্ত বিষয়গুলো তাদের মনিটরিংয়ের আওতাভুক্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
কিছুকাল আগে ঈদ-পরবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ঘোষণায় শিক্ষার্থীদের মনে যে উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছিল, তা খুব দ্রুতই মুছে দিল করোনার দ্বিতীয় ডেউ। শিক্ষার্থী, অভিভাবক কেউ জানে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবার কবে স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসবে। এক বছরের অধিককাল ধরে দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থার ব্যাপক প্রভাব পড়ছে শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের ওপর। বিরাজমান পরিস্থিতিতে এ থেকে উত্তরণের পথটি সহজ, তা বলা যাবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের ন্যূনতম ফলাফল নিশ্চিত করতে দরকার সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
উন্নয়ন ও সংস্কৃতি কর্মী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here