শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় মানুষের মনোরঞ্জন করেছেন যিনি সেই মাস্টার চিত্তরঞ্জন ভদ্রের স্মৃতিকথা

0
51

লক্ষ্মণ চন্দ্র মন্ডল, শালিখা
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার নারিকেলবাড়ীয়া ইউনিয়নের খানপুর গ্রামের এক নি¤œমধ্যবৃত্ত পরিবারে ১৯৪৮ সালের ২০ জানুয়ারী সোমবার রাত ০৮ ঘটিকায় জন্ম নিয়েছিলেন চিত্তরঞ্জন ভদ্র। পিতার নাম নিত্যানন্দ ভদ্র। মাতা কৃষ্ণদাসী ভদ্র। পিতা মাতার ৪ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তানের মধ্যে চিত্তরঞ্জন ভদ্র ছিলেন সবার বড়। পিতা নিত্যানন্দ ভদ্র ছিলেন খানপুর তথা অত্র অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের পুরোধা ব্যাক্তিত্ব। খানপুর গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শুরু থেকে তিনিই ছিলেন শিক্ষক। ১৯৩৬ সালে খানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয়।
বিদ্যালয়টি স্থাপনের পিছনে অনেক ইতিহাস রয়েছে। খানপুর তথা অত্র অঞ্চলের শিক্ষিত এমন কোন ব্যক্তি নেই যার হাতে খড়ি হয়নি স্যার নিত্যানন্দ ভদ্রের কাছে। সেই বাবা নিত্যানন্দ ভদ্রের কঠিন শাসন ও সঠিক নির্দেশনায় গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় উত্তীর্ন হওয়ার পর নারিকেলবাড়ীয়া বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে কমার্স বিভাগ নিয়ে ১৯৬৩ ইং সালে এসএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ন হন।
এর পর যশোর এমএম কলেজে ভর্তি হয়ে কমার্স বিভাগ থেকে ১৯৬৮ সালে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী নিয়ে বের হন। এর পর একবছর ধরে শর্ট হ্যান্ড ও টাইপ শিক্ষা করেন। কলেজ জীবনেই তিনি যাত্রা জগতে প্রবেশ করেন। গ্রামের কয়েকজন প্রথিতযশা যাত্রাশিল্পীদের সাহচর্যে ২০টি যাত্রা পালায় অংশ গ্রহন করেন। এসব যাত্রা পালা নিজ গ্রামে এবং বাইরের গ্রামেও মঞ্চস্থ হয়। স্কুলে শিক্ষকতা কালীন স্কুলের স্বাধীনতা দিবসের রাতে নিজের রচিত নাটক ছেলেদের দিয়ে “এরাও মানুষ“ এবং মেয়েদের দিয়ে “ছুটি“ নাটক মঞ্চস্থ করায়েছিলেন।
খানপুর গ্রামের নজীর আহমেদ একসময় ছিলেন নারিকেলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। ঐ সময় চেয়ারম্যান নজীর আহমেদের প্রচেষ্টায় ইং ১৯৭০ সালে খানপুর জুনিয়ার হাই স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সকলের সম্মতি নিয়ে চেয়ারম্যান নজীর আহমেদ ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে চিত্তরঞ্জন ভদ্রকে নিয়োগ দেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে চিত্তরঞ্জন ভদ্র এলাকায় খুব প্রশংশিত হয়ে উঠেন।
১৯৭১ সালের ২ জানুয়ারী তিনি শালিখা উপজেলার বাউলিয়া গ্রামের নগেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের কনিষ্ঠ কন্যা পারুল রানীকে বিয়ে করে দাম্পত্য জীবন গ্রহন করেন। পরবর্তীতে তিনি (১) মেয়ে অনন্যা ভদ্র (২) ছেলে সৈকত ভদ্র নামের ২ সন্তানের জনক হন। ইং ১৯৮৪ সালে তিনি বিএড ডিগ্রী অর্জন করেন। সেই জুনিয়ার স্কুলটি ধীরে ধীরে বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়।
দির্ঘ ৪০ বছর অর্থাৎ ইং ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি খানপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এর পর অবসর গ্রহনের পরও দীর্ঘ ৮ বছর স্কুল পরিচালনা পরিষদের সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্কুল পরিচালনা পরিষদের পাশাপাশি গ্রামের সার্বজনীন পুজা মন্দিরের সভাপতি এবং গ্রামের হিন্দু ধর্মীয় শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দিরের সভাপতি হিসাবে ১০বছর যাবৎ দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। মাস্টার চিত্তরঞ্জন ভদ্রের দির্ঘ ৪০ বছর যাবৎ শিক্ষকতা জীবনে বিফলতার চেয়ে সফলতাই এসেছে বেশী বলা যায়। অসংখ্য ছাত্র ছাত্রীদের অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে জ্ঞানের আলো জ্বেলে দিয়ে তাদেরকে মহিয়ান করতে সাহায্য করেছেন।
নারিকেলবাড়ীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেনীতে পড়াশোনা কালীন চিত্তরঞ্জন ভদ্র গান বাজনা, ছড়া-কবিতা লেখা লেখির প্রতি আকৃষ্ট হন। ঐ সময় তার হারমনিয়ামের বাজনা ও গানের গুরুদেব হিসাবে গ্রামের উত্তর পার্শ্ববর্তী চিত্রা নদীর উত্তর পাড়ের হরিশপুর গ্রামের কাজী হাতেম আলী নিযুক্ত হয়েছিলেন। গানের মাস্টার হিসাবে কাজী হাতেম আলীর খুব নামযশ ছিল এলাকায়। চিত্তরঞ্জন ভদ্র লিখেছেন অনেক গান, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, যাত্রা, নাটক ও উপন্যাস। ১। কবিতার বইয়ের নাম ঃ ‘অঞ্জলী‘। বইটিতে ৩৫টি কবিতা আছে। ২। গানের বই ‘সঙ্গীতাঞ্জলী‘ । বইটিতে ৯০টি গান আছে।
৩। গল্পের বই ২টি । এক হচ্ছে-‘এক মুঠো জ্যোছ্না ‘ ও দুই হচ্ছে-‘সেই দুটি চোখ‘। দুটি গল্পের বইয়ে মোট ২০টি গল্প আছে। বিশেষ বিশেষ গল্পগুলো হলোঃ- একমুঠো জোছনা, তাথৈ জল, এক বুক কান্না, অশ্রুভেজা হাসি, ছুঁয়ো না, মেঘের কোলে রোদ, ঝড়, মুক্তি, ফিরলো পাখী নীড়ে, সেই দুটি চোখ, কাঁটার আঁচড়, সে মধু রাত, ঢেউ, আমি তোমারই, মেঘের রথ, মরমী বধু, রাগ মধুরম, অশ্রুর ¯্রােত, ধাক্কা। ৪। উপন্যাস ৩টি। যথাক্রমে সেগুলোঃ(ক) ব্যর্থ পিপাসা, (খ) হারিয়ে খুঁজি ও (গ) সকালে বিকেলের ফুল। ৫। যাত্রা নাটক ৪টি। যথাক্রমে সেগুলো হচ্ছে-(ক) মনি কাঞ্চন (খ) দেবী চায় অর্চনা (গ) দেখেও যাদের দেখে না (ঘ) এক ফোঁটা সিঁদুর। প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে ‘মনি কাঞ্চন‘ ও ‘দেবী চায় অর্চনা‘ এ দুটি যাত্রা পালা গ্রামের শিল্পীদের সমন্বয়ে গ্রামেই দুর্গাপুজা উপলক্ষে মঞ্চস্থ হয়েছিল। বইগুলো সবই প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
২০১০ সালের পর থেকে অবসর জীবন-যাপনের মধ্যদিয়ে বাড়িতে থেকে তিনি গ্রামের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে সময় কাটাচ্ছেন। নিজের রচিত সাহিত্য ও সংস্কৃতিমুলক বইগুলো প্রকাশ করার ব্যাবস্থা হলে দেশের সাহিত্য ভান্ডার অনেকটা সমৃদ্ধশালী হতো বলে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন-“জীবনের সহায় সম্পদের অধিকাংশ প্রায় রোগ ব্যাধিতে শেষ হয়েছে, জীবনের সুর্য্যটা দিগন্তের কোলে হেলে পড়েছে-ডুবু ডুবু করছে। ঈশ্বরের চরণে আশ্রয় পাবার বড় ইচ্ছা-জানি না সে রকম অর্জন হয়েছে কি-না? আমার জীবনে আছে আলো-ছায়ার খেলা, আছে মধুময়ী-দুরাশা, আছে আলোকের কুয়াশা, আছে পরানের পিয়াসা। নেই প্রলয়ের প্রলয়, নেই হৃদয়ের কুসুম কারায় উল্টি-পাল্টি বেদনা রাশির উন্মত্ততা। আছে ¯েœহময়-ছায়াময়-স্বপ্নময়-মায়াময়-মোহময়-মধুময়- আলোকের উল্লাস। প্রথম ফোঁটা পদ্মের মত, সবাইকে ভালবাসতে চেয়েছি, ছোট ছোট মুহুর্তগুলোকে ভালবাসার উৎসবে পরিনত করতে চেয়েছি, চেয়েছি নবীন বসন্ত এসে নবীন জীবন ফুটাক। জীবনের জয়গান হোক্ -দাও প্রেম, দাও শান্তি- দাও নতুন জীবন।‘‘

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here