নেশাখোর স্বামীর অত্যাচারে ভাঙ্গা চার হাত-পা নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন গৃহবধু রেহেনা

0
73

বাঘারপাড়া প্রতিনিধি
যশোরের বাঘারপাড়ায় নেশাখোর ও যৌতুকলোভী এক স্বামী ও শ্বাশুড়ীর বিরুদ্ধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নিজ স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্বামী ইকরামুলের লাঠির আঘাতে ভেঙ্গে গেছে গৃহবধু রেহেনা খাতুনের দুটি হাত ও দুটি পা।
ইকরামুল সাতক্ষিরার কলারোয়া গ্রামের নূরআলীর ছেলে। তবে সে (ইকরামুল) বাঘরপাড়া উপজেলার জহুরপুর ইউনিয়নের ছোটক্ষুদ্রা গ্রামে মামা নওশেদের বাড়িতে মা জুলেখা বেগমের সঙ্গে বসবাস করে। দুই সন্তানের জননী রেহেনা এখন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৩৪ নম্বর (মহিলা ওয়ার্ড) বিছানায় চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। গৃহবধুর মা ফাতেমা বেগম চার জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। অভিযুক্তরা হলেন মেয়ের জামাই, শ্বাশুড়ী, মামা শ্বশুর ও খালা শ্বাশুড়ী।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে ১ লক্ষ টাকার দেন মোহরে পারিবারিক ভাবে ইকরামুলের সাথে হলদা গ্রামের আনোয়ার হোসেনের মেয়ে রেহেনার বিয়ে হয়। ইকরামুল মামা বাড়ি বসবাস করায় সে সময় (বিয়ের) ছেলের পক্ষে মধ্যস্থতা করেন মামা নওশেদ। এ দম্পতির ঘরে দুই সন্তান আছে। ছেলে ইমরান (৯) দ্বিতীয় শ্রেনিতে পড়ে এবং মেয়ে রুমা (৭) প্রথম শ্রেনিতে পড়ে।
এ বিষয়ে করুণ কন্ঠে কথা বলেন গৃহবধু রেহেনা। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী একজন নেশাগ্রস্থ মানুষ। বিভিন্ন সময়ে বাবার কাছ থেকে টাকা আনতে বলে। টাকা আনতে না পারলেই মারপিঠ শুরু করে। গত বৃহস্পতি বার ১ লক্ষ টাকা আনতে বাবার বাড়ি যেতে বলে। আমি পারবো না বলার সাথেই গাছের ডাল দিয়ে মারপিঠ শুরু করে। কেউ ঠেকাতে আসলে আমার শাশুড়ী তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছিল।
তিনি বলতে থাকেন, মারের সময় আমার ৭ বছর বয়সী মেয়ে চিৎকার করে কাঁদলেও মার থামেনি। এক সময় জ্ঞান হারাই। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় হাসপাতালে ভর্তি হই। এর আগে মঙ্গলবারও আমাকে মারে বলে জানান এ গৃহবধু। এবং এ কাজে আমার মামা শ্বশুর, শ্বাশুড়ী ও খালা শ্বাশুড়ী রিজিয়া বেগমও জড়িত’। বাবা আনোয়ার হেসেন বলেন, ‘মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে বিয়ের সময়ই যৌতুক হিসাবে এক লক্ষ টাকা দিয়েছি। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে জামাইয়ের চাপে আরও ৫০ হাজার (২০ হাজার+ ১০ হাজার +২০ হাজার) টাকা দিয়েছি। এরপর গত কয়েক মাস থেকে আরও ১ লক্ষ টাকার জন্য মেয়েকে চাপ দিতে থাকে। এরই জের ধরে গত মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার মেহগনি গাছের ডাল দিয়ে বেধড়ক পেটায়।
তিনি বলতে থাকেন, মেয়ের বিয়ের পর থেকেই জামাই তাকে শারিরীক ও মানসিকভাবে নির্যাতন শুরু করে। ২০১৩ সালে একবার টাকার জন্য মেয়েকে ‘দা’ দিয়ে কোপায়। আমি আদালতে ছাড়পত্রের (বিবাহ বিচ্ছেদ) জন্য মামলা করি। সে সময় মেয়ের সন্তানের কথা চিন্তা করে এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান দিলু পাটোয়ারির মধ্যস্থতায় মামলা প্রত্যাহার করি। আমার স্ত্রী রাস্তার শ্রমিক হিসাবে কাজ করে এবং আমি ভ্যান চালাই। এ সামান্য আয়ে চলে আমাদের সংসার। তারপরও মেয়ের সংসারের কথা চিন্তা করে বিভিন্ন সময়ে ১লক্ষ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছি। কিন্তু নেশাখোরদের চাহিদার শেষ নেই। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি ওর (ইকরামুল) কাছে মেয়েকে আর পাঠাবো না’।
ইকরামুলের ফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে শ্বাশুড়ী জুলেখা বেগম মারপিটের কথা স্বীকার করেন। গাজা সেবনের অপরাধে ছেলে জেল খাটার কথাও বলেন এ প্রতিবেদককে। তিনি বলেন, ‘আমার বিটার বৌ এর মুখ ভালো না, তাই ছেলে ইকরামুলের কাছে মার খায়’।
বাঘারপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরী বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক সিনথিয়া ফারহানা জানান, গৃহবধুর দুই হাত ও ডান পায়ে ফ্রাকচার (ভাঙ্গা) আছে। তবে বাম পায়ে বেশ ফোলা থাকায় ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। এ ছাড়াও তার শরীরের অনেক জায়গায় আঘাতের চিহ্ন আছে।
বাঘারপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফিরোজ উদ্দিন মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘আজ (রবিবার) মামলা রেকর্ড হবে, আসামি গেপ্তারের চেষ্টা চলছে’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here