দ্রোহ ও প্রেরণার অনন্ত উৎস-সরদার ফজলুল করিম

0
57

মার্জিয়া লিপি
স্বপ্নের মৃত্যু নেই, স্বপ্নদর্শী জীবনের মৃত্যু নেই। আজ থেকে ৯৬ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহান শিক্ষক সরদার ফজলুল করিম। সরদার ফজলুল করিম মানব মুক্তির দর্শনে আজীবন বিশ্বাসী বাঙালি জাতির জন্য এক বাতিঘর। তিনি আমাদের কালের এক অসাধারণ মানুষ, আলোর পথযাত্রী- এ যুগের সক্রেটিস। ভালোবাসতেন নিজেকে কৃষকের সন্তান বলে পরিচয় দিতে। এই পরিচয়ে স্মরণ করতেন উৎসের কথা; জানিয়ে দিতেন উত্তর জীবনে তার সকল পরিবর্তন, উত্তরণেও জীবনের নিশান মাটির সঙ্গে প্রোথিত। নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষকসন্তান জ্ঞানের শক্তিতে উপলব্ধি করেছেন নিজের মধ্যে, প্রভাবিত করতে চেয়েছেন সেই শক্তি অপরের মাঝেও। তার স্বপ্টেম্ন, তার কর্মে, প্রবহমানতায় মহৎ জীবন সৃষ্টির সংগ্রামকে সমর্পিত করতে চেয়েছেন অনাগত প্রজন্মে, কালের পরিক্রমায় মানব সমাজে।
জ্ঞানতাত্ত্বিক সরদার ফজলুল করিম ১৯২৫ সালের ১ মে বরিশালের আটিপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ৮৯ বছরে মৃত্যুবরণ করেন; ১৬ জুন ২০১৪। তার ভাষায়, ‘মানুষের মৃত্যুদিন হচ্ছে তার সত্যিকারের জন্মদিন। কাজেই আমরা যে জন্মদিবস পালন করি কেউ পঞ্চাশে, কেউ চল্লিশে বা ষাটে- এটা খুব একটা যথার্থ নয়। তখনো পর্যন্ত পুরো পোর্ট্রেটটা আমাদের সামনে নেই। আমার নিজেরও সার্কিটটা পূর্ণ হয়নি এখনো। এখনো কমপ্লিট হয়নি, তবে এখন এ বয়সে আমি পেছনের দিকে একবার তাকাতে পারি। লুক-ব্যাক। স্মৃতি, আমার বেশ ভালোই আছে, যদিও ঘটনাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আমার মনে নেই। ‘
কালোত্তীর্ণ বাতিঘর, ছোটখাটো দেহের প্রচন্ড আশাবাদী মানুষ সরদার ফজলুল করিম- যিনি মনে করতেন তার পুরো জীবনটাই লাভের; ১১ বছরের জেলজীবন, ৫৮ দিনের অনশন, বিলেতে বৃত্তির আমন্ত্রণপত্র ছিড়ে ফেলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়া- এ সকল অভিজ্ঞতার কোনো কিছুই তার হিসাবে লোকসান নয়।
তার কথায়, ‘বর্তমান বাংলাদেশের জিজ্ঞাসু যে প্রজন্ম তাকে আমি কী দিতে পারি? আমি বড় প-িত নই, বড় গবেষক নই। তারা বড় বড় সমস্ত প্রবন্ধ লেখেন জীবনের গতি, জীবনের ধারা, পরিবর্তন, পরিবর্তনের ইতিহাস ইত্যাদি সম্পর্কে। এসব আমি তেমন কিছুই জানি না। এমন আমি, কী দিতে পারি আমার পরবর্তী প্রজন্মকে? আমি দিতে পারি আমার জীবনটাকে। ‘
সরদার ফজলুল করিম (১৯২৫-২০১৪) কর্মপরিধি কেবল তাত্ত্বিকতায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। সারা জীবন নির্লোভ-নির্মোহ থেকে বাম রাজনীতির মূলধারায় সরাসরি অংশ নিয়ে সমাজবদলের বিপ্লবী সংগ্রামে নিবেদিত ছিলেন। আজীবন অসম্মত ছিলেন আত্মসমর্পণে। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন বিপ্লবের স্বপ্টম্ন মাথায় নিয়েই। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ২৬ বছরের শাসনামলে সরদার ফজলুল করিমকে চার দফায় ১১ বছর কারাবন্দি থাকতে হয়েছে।
বরিশাল জিলা স্কুলে পড়ার সময়ে তিনি সংস্পর্শে আসেন সমগ্র ভারতের বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দলের (আরএসপি) সক্রিয় এক রাজনৈতিক কর্মী মোজাম্মেল হকের সঙ্গে। সহপাঠী মেধাবী সেই বন্ধুর কাছে রাজনীতির হাতেখড়ি। সহপাঠী মোজাম্মেল একদিন চুপি চুপি একটি বই হাতে ধরিয়ে দিয়ে বালক সরদার ফজলুল করিমকে বলেন, ‘লুকিয়ে পড়তে হবে’!’ কিশোর সরদার ফজলুল করিম দেখলেন, বইটার মলাট ছেঁড়া, বইয়ের নাম ও লেখকের নাম ঘন কালো কালিতে মুছে দেওয়া। বালকের মনে প্রচন্ড কৌতূহল আর শিহরণ :নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি তার আকর্ষণ দুর্বার। বলেছিলেন, ‘এই বইয়ের কথা কেউ যেনো জানতে না পারে। তা হলেই তোমাকে জেলে যেতে হবে। ‘
বরিশাল শহরে তখনও বিজলী বাতি ছিল না। রাস্তায় রাতে ঝোলানো থাকতো গ্যাসের বাতি। সে রাতে নিম্ন মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের এক কিশোর মুরুব্বীদের ভয়ে হারিকেনের দু’দিকে কাগজের ঢাকনা দিয়ে এক রাতের মধ্যে পড়ে শেষ করেন ‘পথের দাবী’। ভারতী, অপূর্ব, সব্যসাচীর স্বাধীনতা আন্দোলনের রোমাঞ্চকর এক কাহিনি। ‘ঘটনাস্থল সুদূর বার্মার রেঙ্গুন শহরের অন্ধকার কাঠের ঘর, গাছপালা ঘেরা শহরতলীর নদী। একটি গুপ্ত দল। যে দল স্বাধীনতার কথা বলে, ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে, স্বাধীন করতে চায় ভারতকে। ‘ সেই কাহিনি কিশোর সরদার ফজলুল করিমের চোখে স্বাধীনতার স্বপ্টম্ন জাগিয়ে ছিল। দীক্ষিত করেছিল, দেশের প্রতি ভালোবাসায় স্বদেশি রাজনীতিতে।
তার যাপিত জীবনে নানা বিস্ময়। স্নাতকোত্তরের পর নিয়মতান্ত্রিক দরখাস্ত ব্যতিরেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষকতা শুরু। বামপন্থি রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা থাকায় তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের কঠোর নজরদারির কারণে পার্টির আদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে ইস্তফা দেন। সরদার ফজলুল করিমের পদত্যাগ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, সরকারি মহলেও আলোচিত ছিল। ১৯৪৮ সালে তার চাকরির নথিতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে লেখা পুলিশ বিভাগের কর্তাদের কৈফিয়ত তলবমূলক বার্তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়- ‘কেন সরদার ফজলুল করিম চাকরি ছেড়েছে এবং তাঁর অবস্থান সম্পর্কে সরকার কে অবগত করা হোক। ‘
তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্যে আত্মগোপন জীবন বেছে নেন। পার্টির পরামর্শে প্রথমে কলকাতায়, পরবর্তী সময়ে কৃষকদের সঙ্গে নরসিংদীর চালাকচর, পোড়াদিয়া ও আশপাশের এলাকায় আত্মগোপনে থাকেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকায় জেলা কমিটির মিটিংয়ে যোগ দিতে এসে গ্রেপ্তার হন সন্তোষ গুপ্তের বাড়ি থেকে। জেলজীবন শুরু। রাজবন্দিদের অধিকারের দাবিতে ৫৬ দিনের অনশনে অংশ নেন তিনি।
কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী রূপে জেল থেকেই পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দুই বছর পর সে গণপরিষদ ভেঙে দেয় স্বৈরাচারী চক্র; তখন তার স্থান হয় আবারও কারাগারে। কারামুক্তির পর ১৯৬৩ তে যোগ দেন বাংলা একাডেমিতে, শুরু করেন অরাজনৈতিক জীবন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাকে আবার নিক্ষেপ করে কারান্তরালে। বাংলাদেশের বিজয়ের পরে মুক্তিলাভ করেন। প্রিয় শিক্ষক জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আহ্বানে ফিরে আসেন দ্বিতীয় পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিয়োগ পান রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। শিক্ষকতার পাশাপাশি দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধ্রুপদি সব গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ, কোষগ্রন্থের বাংলা অনুবাদ করেন। রচনা করেন গ্রন্থ, নানা বিষয়ে বিভিন্ন প্রাসঙ্গিকতায় মৌলিক লেখা। তার গ্রন্থরাজি- বিশ্ব ভাবনা, দেশ-ভাগ, এ দেশের ক্রমোন্মোচিত ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম, দর্শন, মানবিকতা, সমাজভাবনা, রাজনীতি- জীবনদর্শনের মূল্যবান স্মারক।
চিরায়ত গ্রিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলো অনুবাদ করে দেশের বিদ্বৎ সমাজে এবং সাধারণ পাঠক মহলে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেন। সারা জীবন বিদ্যা ও জ্ঞান বিতরণ করেছেন শত-সহস্র ছাত্রছাত্রীর মাঝে; রাজনীতি ও সংস্কৃতি অঙ্গনের নেতাকর্মীদের প্রেরণা জুগিয়েছেন আমৃত্যু। তার স্নেহ-ভালোবাসায় ধন্য হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। কত শত মানুষকে তিনি ভালোবেসেছেন, প্রেরণা জুগিয়েছেন, পথ দেখিয়েছেন, তার পরিমাপ নেই। তিনি কল্পনার কিংবদন্তি নন, বাস্তবের মানুষ। তার স্বপ্টেম্ন, তার কর্মে, চিন্তার প্রবহমানতায় তিনি সমর্পিত হতে চেয়েছেন অনাগত প্রজন্মে, কালের পরিক্রমায় মানব মুক্তির ইতিহাসে।
সরদার ফজলুল করিমের স্মৃতিতে অনিঃশেষ শ্রদ্ধা। মৃত্যুঞ্জয়ী এ মনীষী- তার স্বপ্টেম্ন, তার কর্মে, চিন্তার প্রবহমানতায় তিনি সমর্পিত হতে চেয়েছেন অনাগত প্রজন্মে, কালের পরিক্রমায় মানব মুক্তির ইতিহাসে। তার সমগ্র বিপ্লবী জীবন বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য দ্রোহ ও প্রেরণার অনন্ত উৎস।
গবেষক; লেখক- জীবনীগ্রন্থ: সরদার ফজলুল করিম; সম্পাদক, সরদার ফজলুল করিম : দিনলিপি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here