মৃত মুনিয়া, টাকায় বিক্রি হওয়া মগজ ও সুগার ড্যাডিদের ভয়াল রূপ

0
41
শান্তা মারিয়া

শান্তা মারিয়া

মুনিয়া বলতে প্রথমেই একটি ছোট, সুন্দর, নাজুক পাখির কথা মনে আসে। মৃত মেয়েটিও সুন্দর ছিল দেখতে। কত বয়স তার? একুশ। একটি সুন্দর বিকশিত জীবন প্রাপ্য ছিল তারও। তা, এমন কত জীবনই তো অকালে ঝরে যায়। কেন তাকে নিয়ে এত আলোচনা? কারণ সে বিক্রি হয়েছিল এদেশের ধনকুবের বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম আনভীরের কাছে। নারী মাংসের ক্রয় বিক্রয়ের কাহিনী আমাদের কাছে এমনিতেই খুব রসালো। তার উপর মেয়েটির সুন্দর মুখের ছবি অনেকের প্রচ্ছন্ন কামনাকে আরও উসকে দেয়। মনের ভিতরে আফশোস জেগে ওঠে, ‘আহা টাকা থাকলে আমিও এমন একটি মুনিয়া কিনতে পারতাম।’ সেই আফশোসের নিচে থাকে সায়েমের মতো লাম্পট্য করার সুপ্ত বাসনা।

বাবা মা হারানো এতিম মুনিয়া আমার সন্তানের বয়সী। মেয়েটির চেহারা দেখে বার বার মনে হচ্ছে, আমার সন্তানকে আমি কত কষ্টে সর্বশক্তি দিয়ে আগলে রাখছি। আর এই মেয়েটি ছিল নরখাদকদের দুনিয়ায় একা। সে লোভে পড়ে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।

সায়েমের কাছে বিক্রি হওয়া মেয়েটির যদি দোষ থাকে তাহলে সায়েমের মিডিয়ায় কর্মরত যে সাংবাদিকরা তাদের মন মেধা বিবেক বুদ্ধি সব বিক্রি করে দিয়ে বসে আছে তাদের কতবার মৃত্যু পাওনা হয়ে গেছে?
আমি এখানে পেটের দায়ে চাকরি করা মধ্য ও নিম্ন স্তরের সাংবাদিকদের কথা বলছি না। তারা অসহায় দু মুঠো ভাতের জন্য, চাকরির জন্য। আমি নিজেও সংবাদকর্মী হিসেবে ২৪ বছর চাকরি করেছি। নিজে সৎ থাকলে কি হবে? চাকরি করতে হয়েছে অনেক দুর্বৃত্ত পুঁজিপতির অধীনে।

কিন্তু যে সাংবাদিকরা উচ্চপদে কাজ করেন, যারা মাসে মাসে সায়েমের টাকায় বিদেশ ভ্রমণ করেন, পার্টি দেন, ফ্যাট, গাড়ি বাড়ির মালিক হন তারা কি ভাতের অভাবে দালালি করেন? নিশ্চয়ই না। তারা নিজেদের বিক্রি করেন লোভে। মুনিয়া যদি ‘রক্ষিতা’ হয় তাহলে তারা কি? তারাও তো সায়েমের পোষা কেপ্ট।

এবার আসি মূল অপরাধী প্রসঙ্গে। আনভীর সায়েম নামক ব্যক্তি এদেশের ধনকুবের। তিনি অভিযুক্ত। তারপরও তার নাম বলতে ভয়ে বুক কাঁপে। কারণ আমার মতো তুচ্ছ মানুষকে গায়েব করে দেয়া তাদের কাছে কোন ব্যাপারই না। তাদের অঙুলি হেলনে এমন অনেক মুনিয়া মরে গেছে অতীতেও, ভবিষ্যতেও মরবে। এই যে টাকার জোরে রাতকে দিন করে দেয়া, সুবিচারকে পায়ের নিচে পিষে ফেলা এটা পুজিবাদী সমাজে কোন ঘটনাই নয়। সমাজ অতি শীঘ্র সায়েমের নাম ভুলে যাবে। যেমন ভুলে গেছে আপন জুয়েলার্সের মালিকের ধর্ষক ছেলের নাম।

বিচার চাই বিচার চাই করে গলা ফাটিয়ে কি করতে পারবো আমরা? সায়েমের মতো লম্পট সুগার ড্যাডিরা কয়েকদিন পর আরেকটি মুনিয়া কিনবে। তাকে সোনার খাঁচায় রাখবে। তারপর শখ মিটে গেলে মেরে ফেলবে।
যারা ভিকটিম ব্লেইমিং করছেন তাদের বলি, ভিকটিম ব্লেইমিং ছেড়ে দিয়ে লম্পট সায়েমের কথা বলুন আর প্রশ্ন তুলুন এটা হত্যা না আত্মহত্যা? এসব বিষাক্ত ধনী অপরাধীদের মুখোস খুলুন।

মেয়েটির যে বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে সে অনেক কিছু পাড়ি দিয়ে এসেছে, জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা তাকে নিতে হয়েছে। কারণ বাবা মা হারানো এতিম একটি মেয়ে। সে এত সহজে আত্মহত্যা করবে, এত ইমোশোনাল হবে এটা আমার কাছে কিছুতেই মনে হচ্ছে না। বরং মেয়েটিকে মেরে ফেলা হয়েছে কিনা সেটি ভালোভাবে তদন্ত হওয়া দরকার সবার আগে। এই ধরনের দুর্বৃত্ত ধনীরা রাতকে দিন করতে পারে টাকার জোরে।

তারা এমন অনেক মেয়ের জীবন নষ্ট করে অভ্যস্ত। এইসব লম্পট ধনীদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার সময় এসেছে বৈকি। বদমাশ সায়েমের বিরুদ্ধে এবং এর মতো অন্য বদমাশদেরও সামাজিকভাবে বয়কট করুন। ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করি।

আর যারা এসব বদমাশ লোকদের চামচাগিরি করে তাদের প্রতি ঘৃণা ও ঘৃণা।

প্রথম থেকেই মিডিয়ায় মেয়েটির চরিত্র হনন, ময়না তদন্ত ছাড়াই আত্মহত্যার কথা প্রচার শুনে মনে হচ্ছে এ কেসটিও যবনিকার আড়ালে চাপা পড়তে যাচ্ছে অতি দ্রুত। মনে পড়ছে অভি নামক এক কুখ্যাত ক্যাডারের হাতে খুন হওয়া মডেল তিন্নির কথা। সে মামলার কোন সুরাহা হয়নি আজও। অভি এখন বহাল তবিয়তে আছে বিদেশে।

সায়েমকে অবশ্য বিদেশেও থাকতে হবে না। তিনি দেশেই বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবেন। কতিপয় চামচা সাংবাদিক (বা মিডিয়া গোলাম) তাদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে সায়েমের প্রশংসা করে বলেছেন, তার নাকি মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি কলিজা। তার কলিজা নাকি হিমালয়ে চেয়ে বড়। বাহ কি সুন্দর অভিব্যক্তি। চামচার বাচ্চা চামচাদের চাটুকারিতার ভাষা শুনলে বমি আসে।

সায়েমের মতো সুগার ড্যাডিদের কলিজা বড়ই হয়। তারা কলিজার নিচে চাপা ফেলে দেয় মুনিয়াদের। সমাজ থেকে এইসব লম্পট, ধনকুবের কোনদিনই বিদায় হবে না যতদিন না আমরা এই দুর্গন্ধযুক্ত কলিজাওয়ালা সমাজটাকেই ফেলে দিয়ে নতুন সমাজ নির্মাণ করতে পারবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here