এবার গানে গানে কৃষকের ধান কেটে দিলেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা

0
50

মোকাদ্দেছুর রহমান রকি

যশোর জেলায় গানে গানে দরিদ্র কৃষকের ধান কেটে দিলেন যশোরের সাংস্কৃতিক কর্মীরা। শ্রমিক সংকট থাকায় জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বানে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কৃষকের ধান কেটে দিয়েছেন তারা। ৩০ এপ্রিল শুক্রবার ভোর ৬ টায় যশোর সদর উপজেলার পতেঙ্গালী এলাকায় কৃষক ইমরান হোসেনের জমির ধান কেটে কার্যক্রমের সূচনা করেন।

আয়না চলে ঘোমটা খুলে নয়ন ভরে দেখ, দেখলি যদি নিরবধি সরল হয়ে দেখ এমন লালনগীতিসহ বিভিন্ন ধরনের গানের সুরে সুরে কৃষকের ধান কাটেন যশোরের সাংস্কৃতিক কর্মীরা। গানে উজ্জীবিত হয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বিঘার পর বিঘা কৃষকের ধান কেটে দিচ্ছেন তারা।

জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতারা জানিয়েছেন, করোনার মহামারির কারণে গত বছর শ্রমিক সংকট দেখা দেওয়ায় প্রথমবারের মতো স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কৃষকের ধান কাটেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় আজ তারা কৃষকের ধান কেটে দেওয়ার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করেছেন। প্রথম দিনে সদর উপজেলার পতেঙ্গালী, লাউজানি ও মালঞ্চী গ্রামের সাত কৃষকের আট বিঘা জমির ধান কেটে দেন তারা। যতদিন মাঠে ধান থাকবে ততদিন স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে তাদের কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন তারা।

ধান কাটায় অংশ নেওয়া খবির শিকদার নামে এক সাংস্কৃতিক কর্মী বলেন, ‘শহরের মানুষ হিসেবে কৃষকের ধান উৎপাদন ও ঘরে তোলার শ্রম সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। গতবছর করোনার কারণে প্রথম কৃষকের ধান কাটার কাজে অংশ নিই। ভালোই লেগেছিল। যে কারণে সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বানে এবছরও ধান কাটতে এসেছি। কৃষকের জন্য সামান্য হলেও কিছু করতে পেরে খুব ভালো লাগছে।’

ধান কাটার ফাঁকে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডাভোকেট মাহমুদ হাসান বুলু বলেন, ‘মহামারি করোনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক কর্মীরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। তাছাড়া এ সময়ে কৃষকরাও আর্থিক ও শ্রমিক সংকটের শিকার। ফলে তাদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। এজন্য সাংস্কৃতিক কর্মীরা কৃষককে সহায়তা করেছে। নিজে কৃষকের ধান কাটছি। ভালো লাগছে। অনেক দিন পর নিজেকে প্রফুল্ল মনে হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তাছাড়া মহামারির এসময় মানুষ নানাভাবে নিজেদের উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি চিকিৎসকরা নাচ-গানের মাধ্যমে নিজেদের উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করছেন যা দেশবাসী দেখেছে। তেমনি আমাদের এখন মঞ্চ নেই, মঞ্চে আলো নেই। ফলে সাংস্কৃতিক কর্মীরা ধান কাটার মাধ্যমে নিজেদের উজ্জীবিত করে তুলছেন।’

যশোর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু বলেন, ‘মানুষের সাথে, মানুষের পাশে এবং মানুষকে নিয়েই সংস্কৃতি। সেই চিন্তা থেকেই এ উদ্যোগ। কৃষক আমাদের অন্নদাতা। যারা দেশের অর্থনীতির চাকা, উৎপাদনের চাকা সচল রাখে সংকটকালে তাদের পাশে দাঁড়াতেই সাংস্কৃতিক কর্মীরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ধান কাটছে। এর মাধ্যমে মাটির সাথে, কৃষকের সাথে সম্পর্ক তৈরি হবে। সকাল ছয়টায় ধান কাটা শুরু হয়েছে। সাড়ে আটটার মধ্যে চারজন কৃষকের তিন বিঘার বেশি ধান কাটা হয়ে গেছে। আজ মোট সাতজন কৃষকের ধান কাটা হবে। যতদিন মাঠে ধান থাকবে ততদিন এ কার্যক্রম চলবে।’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় সদস্য সুকুমার দাস বলেন, ‘গত বছর আমরা পহেলা মে ধান কাটা শুরু করেছিলাম। এ বছরও একইদিনে ধান কাটা শুরুর ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এবছর খরতাপ হাওয়ায় দ্রুত ধান পেকে গেছে। এজন্য আজ থেকেই ধান কাটা শুরু করেছি। গত বছর ১২ দিনে শতাধিক বিঘা জমির ধান কাটা হয়েছিল। এ বছর তার থেকে কিছু বেশি জমির ধান কাটার ইচ্ছা আছে।’

এদিকে, শ্রমিক সংকটের এই সময়ে বিনা খরচে ধান কাটাতে পেরে খুশি বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। পতেঙ্গালি গ্রামের ইমরান হোসেন জানান, তিনি দেড় বিঘা জমিতে ধান করেছেন। শ্রমিক সংকটের কারণে নিজেই পাঁচ শতক জমির ধান কেটেছেন। এরপর সাংস্কৃতিক কর্মীরা ধান কাটবে খবর শুনে তাদের সাথে যোগাযোগ করেন। তারা আজ বাকি জমির ধান কেটে দিয়েছেন। এতে তিনি খুব খুশি।

পঙ্কজ সরকার নামে অপর একজন জমির মালিক বলেন, ‘আমার দেড়বিঘা জমিতে ধান রয়েছে। শ্রমিক সংকট থাকায় ধান কাটাতে পারছিলাম না। আজ সকালে শুনতে পারি, আমাদের মাঠে সাংস্কৃতিক কর্মীরা ধান কেটে দিচ্ছে। বিষয়টি সত্য কিনা দেখতে আসি। সাংস্কৃতিক কর্মীদের মাঠে ধান কাটতে দেখে তাদের আমার জমির ধান কেটে দেওয়ার অনুরোধ করি। এরপর তারা আমার জমির ধান কেটে দেন। এজন্য তারা কোনো পারিশ্রমিক নেননি। কেবল বাড়ি থেকে পানি এনে পান করিয়েছি তাদের। এছাড়া পাশের লাউজানি এলাকার এক নারী এসে অনুরোধ করায় তার জমির ধানও কেটে দিয়েছেন তারা। সাংস্কৃতিক কর্মীদের এমন মহৎকাজের জন্য তাদের মঙ্গল কামনা করেন কৃষকের পরিবার বর্গ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here