স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন, প্রশ্নটা বরাদ্দের নয়, ব্যবস্থাপনার

0
79

আমাদের দেশে বরাদ্দের অপ্রতুলতা যেমন সত্য; বরাদ্দ অর্থ সদ্ব্যবহারের ব্যর্থতাও তেমনই বাস্তব। সদ্ব্যবহার দূরে থাক, বরাদ্দ অর্থ ফেরত যাওয়ার নজিরও বিরল নয়। বিশেষত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি বাস্তবায়নের েেত্র বরাদ্দ অর্থ ব্যয় করতে না পারার চিত্র আমরা প্রায় প্রতি বছরই দেখে থাকি। আমাদের মনে আছে, চলতি অর্থবছরেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সাত হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ অব্যয়িত ছিল; পরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি কাটছাঁটের মাধ্যমে তা ‘অ্যাডজাস্ট’ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও এই প্রবণতার বাইরে নয়। স্বাস্থ্য বা শিার মতো যেসব ‘জনমুখী’ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি আমরা প্রতি বছর তুলি, সেখানেও বরাদ্দ অর্থ ফেরত যাওয়া নাগরিক প্রত্যাশার সঙ্গে উপহাস ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু সার্বিক ও চিরায়ত এই চিত্রের সঙ্গে চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিপুল বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার বিষয়টি তুলনীয় হতে পারে না। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে আগের তুলনায় বিপুল বরাদ্দ আমরা সবাই সমর্থন করেছিলাম। অনেক মৃত্যু ও স্বজন হারানোর বেদনার মধ্য দিয়ে আমরা সবাই উপলব্ধি করেছিলাম যে, স্বাস্থ্য খাতের সমতা বৃদ্ধি ও অব্যবস্থাপনা হ্রাসের বিকল্প নেই। কিন্তু বুধবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের এমন তথ্য আমাদের হতাশই করেছে যে, চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে জুলাই থেকে মার্চ মাসে কমবেশি মাত্র আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে।

ব্যয়ের এই পরিমাণ খাতটিতে বরাদ্দ মোট অর্থের ২০ শতাংশ মাত্র। ৯ মাসে যদি ২০ শতাংশ মাত্র ব্যয় হয়; বাকি তিন মাসে ৮০ শতাংশ ব্যয় যে অসম্ভব, তা সহজেই অনুমেয়। করোনাকালের অগ্রাধিকার বিবেচনায় অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে যথাযথভাবেই স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ, প্রায় ৯৫ শতাংশ অর্থ ছাড় করা হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্পষ্টতই সরকারের অগ্রাধিকার ও সদিচ্ছা এবং নাগরিক প্রত্যাশার মূল্য দিতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এটাও এখন স্পষ্ট যে, প্রশ্নটা বরাদ্দের নয়; ব্যবস্থাপনার। স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনার যে চিত্র করোনার সময় উন্মোচিত হয়েছে, তার মূল কারণ অর্থের অপ্রতুলতা নয়। এর কারণ বরং অদতা। আর অদতাই সব ধরনের অনিয়মের প্রসূতি। আমরা মনে করি, অন্যতম প্রধান জনগুরুত্বসম্পন্ন এই খাত নিয়ে গভীর ভাবনা-চিন্তার সময় হয়েছে। করোনার মতো সর্বব্যাপ্ত দুর্যোগও যাদের গদাইলশকরি চাল পরিবর্তন করতে পারে না; তাদের দিয়ে কীভাবে একটি জাতীয় লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়া সম্ভব? অর্থবছরজুড়ে বরাদ্দ অর্থ ব্যয় না করে শেষ মুহূর্তে এসে তাড়াহুড়ার যে নজির আমরা বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য খাতে দেখেছি, সেটাও সাদা চোখে দেখার অবকাশ নেই। তাড়াহুড়ার ছদ্মাবরণে নয়ছয়ের অভিলাষ থাকে গোষ্ঠীবিশেষের। করোনার জন্য বাড়তি বরাদ্দের েেত্রও একই অঘটন ঘটলে তা হবে আত্মঘাতী।

আমরা চাই, কী কারণে বরাদ্দ ও ছাড়কৃত অর্থ যথাসময়ে সদ্ব্যবহার করা গেল না, তার জবাবদিহি হতে হবে। যাদের অবহেলা বা ঔদাসীন্যেই এটা ঘটে থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি বাকি অর্থ যাতে যথাযথ খাতে যথানিয়মে ব্যয় হয়, তাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে বাড়তি অর্থ আগামী অর্থবছরে ব্যয় হবে; কিন্তু তাড়াহুড়া ও নয়ছয় কদাচ নহে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে ভাবতে হবে, এডিপির বরাদ্দের অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করতে না পারার দুষ্টচক্র থেকে আমরা কীভাবে বের হয়ে আসতে পারি। এটাও মনে রাখতে হবে, বরাদ্দ অর্থ ব্যয় না হওয়া মানে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রস্তুতিতেও ঘাটতির লণ। এও ভুলে যাওয়া চলবে না- বরাদ্দ অর্থ ফেরত যাওয়া কিংবা সংশোধিত এডিপির মাধ্যমে বরাদ্দ কমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজে জোগান সংকট। এর ফলে নাগরিকরাও বঞ্চিত হয় প্রাপ্য সেবা থেকে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের অদতা, অবহেলা ও ঔদাসীন্যের কারণে এভাবে বছরের পর বছর সামষ্টিক স্বার্থ বিঘ্নিত হতে পারে না। করোনার মতো জীবন-মরণ দুর্যোগের সময় তো প্রশ্নই আসে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here