বাংলাদেশ যেন স্পেনের মতো অপ্রস্তুত না হয়ে যায়

0
34

অনলাইন ডেস্ক
গত বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ইতালির কভিড-১৯ পরিস্থিতি গোটা বিশ্বেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ওই সময় দেশটিতে সংক্রমণ ছড়াচ্ছিল বেশ দ্রুতগতিতে। মানুষও মারা যাচ্ছিল অনেক। মহামারীর প্রাদুর্ভাব সে সময় দেশটির স্বাস্থ্য খাতকে পুরোপুরি রীতিমতো ধসিয়ে দেয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যায় চীনকে ছাড়িয়ে যায় ইতালি। দেশটির একের পর এক অঞ্চলে আরোপ করা হচ্ছিল কঠোর লকডাউন। ঠিক একই সময়ে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছিল ইতালির নিকটবর্তী আরেক ইউরোপীয় দেশ স্পেনে।
ইতালির উত্তরাঞ্চলের পুরোটাই লকডাউনের আওতায় আসে গত বছরের ৮ মার্চ। ঠিক একই দিনে রাজধানী মাদ্রিদসহ সারা দেশে বড় আকারে নারী দিবসের শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। তাতে অংশ নেয় লাখ লাখ মানুষ। দেশটিতে করোনার সংক্রমণ তখনো ততটা ভয়াবহ রূপ নেয়নি। আইবেরিয়ান উপদ্বীপের বিশালায়তনের দেশটিতে ততদিনে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ৫২০ জনের। মৃতের সংখ্যা ছিল ১০।
স্পেনে প্রথম কভিড-১৯ শনাক্ত হয় ৩১ জানুয়ারি। দেশটিতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে এর দুই সপ্তাহের মাথায় ১৪ ফেব্রুয়ারি। তবে সে তথ্য মার্চের শুরুর দিকের আগে জনসমে আসেনি।
ওই শোভাযাত্রা আয়োজনের পরদিন থেকেই স্পেনে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যা ব্যাপক মাত্রায় বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে মৃতের সংখ্যাও। গোটা স্পেনে মারাত্মক প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় কভিড-১৯-এর। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা হয় রাজধানী মাদ্রিদে। দেশটির কয়েকজন মন্ত্রীও আক্রান্ত হন। শোভাযাত্রা আয়োজনের ছয়দিনের মাথায় গোটা দেশ অবরুদ্ধ করে দিতে বাধ্য হয় স্পেন। জারি করা হয় বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর লকডাউনগুলোর একটি। ১৪ মার্চ শুরু হয়ে এ লকডাউন জারি থাকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত। লকডাউন এড়াতে সে সময় অনেক মানুষ মাদ্রিদ থেকে অন্যান্য শহরে নিজের প্রকৃত আবাসে ফিরে যায়। সঙ্গে করে বয়ে নিয়ে যায় নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। দ্রুতই গোটা স্পেনে কভিডের সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এরপর দেশটি যখন করোনার বিপে সর্বাত্মক যুদ্ধে নামে, ততদিনে দেরি হয়ে গিয়েছে অনেক। লম্বা হতে থাকে মৃত্যুর মিছিল। ভয়াবহ রূপ নেয় সংক্রমণ পরিস্থিতি। এ সমস্যাকে আরো প্রকট করে তোলে প্রস্তুতির অভাব। পুরোপুরি ধসে পড়ে স্পেনীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা।
অথচ শুরু থেকেই স্পেনে কেউ বিষয়টিকে পাত্তা দেয়নি। একেবারে নিকটবর্তী দেশ ইতালি যখন মহামারীতে ধুঁকছে, তখনো খেলাধুলাসহ সব ধরনের রাজনৈতিক সমাবেশ চলেছে পুরোমাত্রায়। অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতও প্রস্তুত ছিল না মহামারী মোকাবেলায়। এ ঔদাসীন্যের প্রতিফল হাতেনাতে পেয়েছে স্পেন। করোনা মোকাবেলা করতে গিয়ে একই সঙ্গে মেডিকেল সরঞ্জাম, টেস্ট কিট ও সুরা উপকরণের অভাবেরও মুখোমুখি হতে হয় স্পেনকে।
স্পেনের ঘটনারই পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা এখন বাংলাদেশে। প্রতিবেশী ভারতে মহামারী মারাত্মক আকার ধারণ করলেও বাংলাদেশে এ পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা দেখা যাচ্ছে খুব কমই। চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও তা পালন হচ্ছে ঢিলেঢালাভাবে। অফিস-আদালত বন্ধ থাকলেও খুলে দেয়া হয়েছে সব বিপণিবিতান। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে সবখানে, এমনকি কাঁচাবাজারগুলোতেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা হচ্ছে খুব কম। পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব রয়েছে স্বাস্থ্য খাতেও।
প্রতিবেশী ভারতে কভিডের প্রাদুর্ভাব এখন মারাত্মক আকার নিয়েছে। টানা এক সপ্তাহ ধরে দেশটিতে নভেল করোনাভাইরাসের দৈনিক সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যা তিন লাখের বেশি। দেশটিতে এখন প্রতিদিনই সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যা আগের দিনের রেকর্ডকে ভেঙে দিচ্ছে। গতকালও সকাল পর্যন্ত সারা ভারতে ২৪ ঘণ্টায় ৩ লাখ ৬০ হাজার ৯৬০ জনের সংক্রমণ শনাক্তের কথা জানিয়েছে দেশটির সরকার। এরই মধ্যে দেশটিতে মোট সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখের কাছাকাছি। অন্যদিকে গতকালই দেশটিতে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে নয়াদিল্লি। এর মধ্যে দেশটিতে করোনায় মৃতের নিশ্চিতকৃত সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৩৫ কোটি মানুষের দেশটিতে প্রকৃত চিত্র এ পরিসংখ্যানের চেয়েও আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপে ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এরই মধ্যে ধসে পড়েছে। এ ধসকে আরো প্রকট করে তুলেছে খাতটিতে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবলের অভাব। বাংলাদেশে ভারতের এ চিত্রের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ইতালি যখন করোনায় ধুঁকছিল প্রতিবেশী স্পেনে তখন বিষয়টি আমল দেয়া হয়নি। দেশটিকে এর ফল ভোগ করতে হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতেও এখন এরই পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
দেশে এরই মধ্যে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গতকালও সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৭৭ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ সময়ের মধ্যে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে তিন হাজারের কাছাকাছি সংখ্যক মানুষের। সর্বশেষ ১৩ দিনেই দেশে করোনায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার অতিক্রম করেছে।
এর মধ্যেই খুলে দেয়া হয়েছে বিপণিবিতান ও শপিং মল। গতকালও রাজধানীর বিপণিবিতান ও শপিং মলগুলোয় ক্রেতাদের অস্বাভাবিক ভিড় দেখা গিয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা কম দেখা গিয়েছে ক্রেতা-দোকানদারদের মধ্যেও। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বা মাস্ক ব্যবহার করতেও অনীহা দেখা গিয়েছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে। এসব বিপণিবিতান খুলে দেয়া হয়েছিল যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের শর্তে। তবে তা পরিপালন করা হচ্ছে কিনা, সে বিষয়টি নিয়ে তদারকির অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমানে করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে এ বিধিনিষেধের উপস্থিতি শুধু কাগজে-কলমেই। গতকালও ঢাকার সড়কগুলোয় মারাত্মক যানজট দেখা গিয়েছে। পথচারীদের ভিড়ও ছিল অনেক। স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের বালাই নেই রাজধানীসহ সারা দেশের কাঁচাবাজারেও।
বিষয়টিতে আতঙ্কিত বোধ করছেন দেশের স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের অনেকেই বলছেন, বর্তমানে যেভাবে সবকিছু চলছে, তাতে সামনের দিনগুলোয় আরো বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভারতে শনাক্ত হওয়া করোনার নতুন ধরন এখন ইউরোপকেও আবার বিপদে ফেলে দিয়েছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে এ নিয়ে বড় ধরনের ঔদাসীন্য দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় সামনের দিনগুলোয় পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সে বিষয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে করোনা প্রতিরোধে সরকারের গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের প থেকে কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে—যেমন সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া, কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা; এসব ভালো। তবে লকডাউনের নামে যা হচ্ছে, তাতে ভাইরাসের সংক্রমণ তেমন একটা ঠেকানো যাবে না। ভারত থেকে আসা ভাইরাস বাদেও দেশের ভেতরে যে সংক্রমণ রয়েছে, সেটি মোকাবেলায় সাধারণ মানুষ ও সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের পদপে নগণ্য। বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া না হলে সংকট আরো প্রকট হতে পারে।
আশঙ্কা রয়েছে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও। দেশে এরই মধ্যে আইসিইউ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। বর্তমানে শিশুদের মধ্যে করোনা সংক্রমণের প্রবণতা বাড়ছে। অভাব রয়েছে শিশুদের চিকিৎসায় ব্যবহার্য পিআইসিইউরও। অন্যদিকে সংক্রমণ বাড়তে থাকলে বাংলাদেশেও ভারতের মতো অক্সিজেন সংকট দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ভারত থেকে রফতানি বন্ধ থাকায় আশঙ্কা রয়েছে করোনার টিকাদান কার্যক্রম নিয়েও।
বর্তমানে ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমরা সরকারকে ভারতের ভাইরাসের ধরন মোকাবেলার পরামর্শ দিয়েছিলাম। সরকার সীমান্ত বন্ধ করেছে। বিধিনিষেধ দিয়েছে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমরা হয়তো স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যেতে পারব, কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা না বাড়লে সংকট ঠেকানো কঠিন হবে।
তবে জনগণের মধ্যে বিধিনিষেধ মেনে চলা ও স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে সরকারি প্রণোদনার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল কর্মজীবীদের জন্য তা অপরিহার্য বলে অভিমত তাদের। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, প্রথমদিকে মারাত্মক বেগ পোহাতে হলেও স্পেনে পরিস্থিতি সামাল দেয়া গিয়েছিল জনগণের লকডাউন পরিপালন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কারণে। সবাইকে ঘরে রাখতে গিয়ে স্পেন সরকার দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৃহত্তম প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করে। এটিকে কাজে লাগিয়ে নাগরিকদের আয় নিয়ে দুশ্চিন্তা দূর করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে মহামারীর অভিঘাত থেকেও সুরা দেয়া সম্ভব হয়। বাংলাদেশেও এ মুহূর্তে শ্রমজীবী মানুষকে করোনার অভিঘাত থেকে সুরা দিতে নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার বিকল্প নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here