টিকা সংকটে মুখ থুবড়ে মাস্টারপ্ল্যান

0
34

জয়শ্রী ভাদুড়ী

যুক্তরাষ্ট্রের টিকার কাঁচামাল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া, ভারতে টিকা রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশে টিকা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকট হচ্ছে। এতে যে মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে সরকার গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছিল তা মুখ থুবড়ে পড়ছে। বিকল্প উৎসের খোঁজে নেমেছে সরকার। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে চুক্তির ৩ কোটি ডোজ টিকা নির্ধারিত সময়ে পাওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। গত দুই মাস সেখান থেকে কোনো টিকা আসেনি। ফলে প্রথম ডোজ নেওয়াদের দ্বিতীয় ডোজের পর্যাপ্ত টিকা সরকারের হাতে নেই। টিকা সংকটে ঢিমেতালে চলছে টিকা কর্মসূচি। টিকা সংকট সমাধানে অন্য দেশ থেকে আমদানির জন্য যোগাযোগ শুরু করেছে সরকার। জরুরি প্রয়োজনে করোনাভাইরাসের টিকা পেতে চীনের উদ্যোগে নতুন প্ল্যাটফরমে নাম লেখাতে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ। ‘ইমারজেন্সি ভ্যাকসিন স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি ফর কভিড ফর সাউথ এশিয়া’ নামের এ প্ল্যাটফরমে চীন, বাংলাদেশ ছাড়া বাকি চারটি দেশ হচ্ছে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা। এর মধ্যে দেশে টিকা উৎপাদনে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতেও কয়েক মাস লাগবে। আলোচনা চলছে চীন থেকে টিকা কেনার। এ ছাড়া চীন বাংলাদেশকে ৬ লাখ ডোজ টিকা উপহার হিসেবে দেবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন।

কভিড-১৯ টিকা প্রদান কর্মসূচি এখন পর্যন্ত দেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে সুষ্ঠু কার্যক্রম। এই প্রথম সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেবা নিয়ে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু টিকার ডোজ সংকটের কারণে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়।

ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন দেশের ১ হাজার পাঁচটি কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হচ্ছে। টিকাদান কর্মসূচি শুরুর প্রথম সপ্তাহে দিনে গড়ে ১ লাখ ২৯ হাজার মানুষ টিকা নিয়েছেন। কর্মসূচির দ্বিতীয় সপ্তাহে দিনে গড়ে টিকা নিয়েছেন ২ লাখ ৩৩ হাজার মানুষ। ১৮ ফেব্রুয়ারি ২ লাখ ৬১ হাজার ৯৪৫ জন টিকা নিয়েছেন, যা এক দিনে সর্বোচ্চ। তবে এখন দিনে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়ার সংখ্যা ২০ হাজারে নেমে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী শুরুর প্রথম দুই মাসে ১ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার কথা ছিল। সরকার পাঁচ মাসের মধ্যে দেড় কোটি মানুষকে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।

কিন্তু আড়াই মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর প্রথম ডোজ টিকা পেয়েছেন ৫৭ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ। ৭ এপ্রিল দেশে দ্বিতীয় ডোজ টিকা প্রদান শুরু হয়। সারা দেশে টিকার দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ২১ লাখ ৫৫ হাজার ২৯৬ জন। চুক্তি অনুযায়ী ৩ কোটি ডোজ টিকার মধ্যে এখন পর্যন্ত দুই দফা চালানে ৭০ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে বাংলাদেশ। মার্চে টিকার চালান আসেনি, এপ্রিলের চালানও এখন পর্যন্ত আসার কোনো আভাস পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের টিকার কাঁচামাল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া, ভারতে কভিড আক্রান্ত অনেক বেড়ে যাওয়া এবং টিকা রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশে টিকা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশের কাছে ভ্যাকসিনের মজুদ ছিল ২১ লাখের কিছু বেশি। এখন প্রতিদিন ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টিকা দেওয়া হচ্ছে। এ হারে টিকা দেওয়া চলতে থাকলে আগামী ১৮-২০ দিনের মধ্যে টিকা ফুরিয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার একটি উৎসের ওপর নির্ভর করায় সংকটে পড়তে হচ্ছে বাংলাদেশকে। গত বছর সেপ্টেম্বরে করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল কোনো একটি টিকার জন্য কাজ না করে একাধিক উৎসের সঙ্গে যোগাযোগ ও টিকা সংগ্রহের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার।

টিকা দ্রুত পেতে অগ্রিম টাকা জমা দিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল কমিটি। কিন্তু সরকার শুধু অক্সফোর্ড টিকা আমদানি করেছে। চীনের সিনোভ্যাক বাংলাদেশে ট্রায়ালে আগ্রহী থাকলেও সিদ্ধান্তহীনতায় তা আর হয়নি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা একাধিক উৎস থেকে ভ্যাকসিন আনার পরামর্শ দিয়ে এসেছি। কিন্তু এর পরও একটিমাত্র উৎসের ওপরই সরকার নির্ভর করে ছিল। তবে এখনো এ সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে। এখন দেশের বেসরকারি যে দুটি টিকা ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট আছে সেগুলো সরকার যেন দীর্ঘমেয়াদের জন্য ভাড়া নিয়ে রাশিয়ার টিকা উৎপাদন করে। এ ছাড়া সরকারের ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের যে ভ্যাকসিন উৎপাদন প্লান্ট রয়েছে তা আধুনিকায়ন করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এখন প্রথম ডোজ টিকা আপাতত বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ প্রথম ডোজ যাদের দেওয়া হয়েছে তাদের সবাইকে টিকার দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে। তবে একটি স্বস্তির বিষয় হলো, প্রথম ডোজ নেওয়ার ১২ থেকে ১৬ সপ্তাহ পর্যন্ত টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া যাবে। তাই আমাদের হাতে এখনো দু-তিন মাস সময় রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সেরামের বাইরে অন্য যেসব দেশে অক্সফোর্ড/অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উৎপাদন করা হচ্ছে সেখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব টিকা সংগ্রহ করতে হবে।’ সরকার এখন অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার বাইরে অন্য উৎস থেকে টিকা কেনার বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে।

এ ছাড়া মে মাসে বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্স থেকে দেশে আসবে ফাইজার-বায়োএনটেকের ১ লাখ ডোজ টিকা। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের মাধ্যমে সরকার অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ৩ কোটি ডোজ টিকা আমদানির চুক্তি করেছে। এখন পর্যন্ত সেরাম ৭০ লাখ ডোজ টিকা দিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী এখনো পাওনা রয়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ ডোজ। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে উপহার দেওয়া হয়েছে একই টিকার ৩৩ লাখ ডোজ। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত মোট ১ কোটি ৩ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here