শ্রমিক হত্যা: রাষ্ট্রের শ্রেণী বহিঃপ্রকাশ

0
173

আবু নাসের অনিক

১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের বাংলাদেশে ১৭ এপ্রিল, ২০২১ একটি অন্ধকারময় দিন। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এস.আলম গ্রুপের নির্মাণাধীন কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে আন্দোলনরত শ্রমিকদের বিক্ষোভ দমনে পুলিশ গুলি করে ৫ জন শ্রমিককে হত্যা করলো। ২০১৬ সালে এই এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে একই রকম ভাবে পুলিশ গুলি করে চারজনকে হত্যা করেছিলো। একই স্থানে ৫ বছরের মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হলো মোট ৯ টি তাজা প্রাণ। কী সস্তা জীবন!! প্রতিটির মূল্য মাত্র ৩ লাখ টাকা। এটাই পঞ্চাশ বছরের অর্জন!! অবশ্য ক্রসফায়ারে যাদের গুলি করে হত্যা করা হয় তারা পুরোটাই বিনা মূল্যে, নো ডিসকাউন্ট, নো প্রাইস!
গত ২০ দিনে বিক্ষোভ দমনকে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে নিহত হলো ১৮ জন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক ১৮ টি হত্যাকান্ড ঘটলো, এরপরেও কী বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে গণতান্ত্রিক সরকার বলে আখ্যায়িত করার সুযোগ আছে?? পাশের দেশ মিয়ানমার এর সেনাশাসক বিক্ষোভ দমনে গুলি করে শত শত মানুষকে হত্যা করছে। দুই সরকারই তো বিক্ষোভকারীদেরকে হত্যা করছে, তাহলে এদের মধ্যে পার্থক্য কী? ব্যবহারিক কাজের মাত্রা বিবেচনা করলে পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। একটি সামরিক স্বৈরাচার অন্যটি তথাকথিত নির্বাচিত স্বৈরাচার! পার্থক্য এটুকুই।

শ্রমিকরা বিক্ষোভ করছিলো যৌক্তিক দাবিতে। মাসের ৫ তারিখের মধ্যে বেতন পরিশোধ, রমজান মাসে কর্মঘন্টা ১০ ঘন্টা থেকে কমিয়ে ৮ ঘন্টা করা, ইফতারি, সেহেরী ও নামাজ পড়ার সময় দেওয়া, শুক্রবার কর্মঘন্টা ৬ ঘন্টা করা। এরুপ দাবির প্রেক্ষিতে যে বিক্ষোভ সংঘটিত হয়, সেটি অ-বৈরিমূলক পরিবেশেই সমাধান হয়ে যাবার কথা। কিন্তু এই বিক্ষোভ দমনে পুলিশের গুলি চালানো এবং ৫ জন নিহতসহ ৩০ জনের উপর শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে পাঁচ বছর পূর্বে ৪ জন শ্রমিক হত্যার মধ্যে দিয়ে। কারণ ঐ হত্যাকান্ডের বিচার হয়নি, এই হত্যাকান্ডেও পার পেয়ে যাবে এটা পূর্ব থেকেই নির্ধারিত হয়ে আছে।
এরশাদ সামরিক স্বৈরাচারের শাসনামলে বিক্ষোভ দমনে পুলিশের গুলিতে যে সংখ্যক নিহত হয়েছে, তার চাইতে আরো অনেক বেশি বিক্ষোভকারী হত্যাকান্ডের স্বীকার হয়েছে তথাকথিত নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার বিএনপি আর আওয়ামী লীগ আমলে। অর্থাৎ ’৯০ পূর্ববর্তী আর পরবর্তী প্রত্যেক সরকার রুপে, গন্ধে, স্বাদে এক ও অভিন্ন। এদের প্রত্যেকের ব্যবহারিক কার্যাবলি সেটিই প্রমাণ করে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে এ পর্যন্ত প্রত্যেকটি সরকার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কে তাদের দলীয় বাহিনী হিসাবে ব্যবহার করেছে।
অল্প একটু পেছনে তাকান, ১৯৯৫ সালে মার্চ মাসের ১৫ তারিখে কৃষকদের সারের দাবিতে বিক্ষোভ দমনে পুলিশের গুলিতে সারাদেশে ১৮ জন কৃষক নিহত হয়। তখন সরকারে বিএনপি, বিরোধী দলে আওয়ামী লীগ। ঠিক ২৫ বছর পর, বিক্ষোভ দমনে সেই পুলিশের গুলিতেই ১৮ টি তাজা প্রাণ ঝরে গেলো। ২৫ বছর আগের আর পরের মোট ৩৬ জন এরা সবাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর, কৃষক-শ্রমিক আর তাদের সন্তান। কী অদ্ভুত মিল!! আসলেই কী অদ্ভুত, মোটেও নয়! আজ ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ আর বিরোধী অংশে বিএনপি। উভয় লুটেরা ধনীক শ্রেণীর রাজনৈতিক দল। উভয় এস.আলম গ্রুপের মতো লুটেরা বেনিয়াদের স্বার্থ রক্ষা করে আর শ্রমিক-কৃষকের দিকে বন্দুকের নল তাক করে গুলি করে।
২০১৫ সালে বাংলাদেশ পুলিশ কর্তৃক ‘অপরাধ তদন্ত নির্দেশিকা’ একটি গাইডলাইন প্রকাশিত হয়। নির্দেশিকাটির মুখবন্ধে বলা হচ্ছে,‘ফৌজদারি অপরাধ তদন্তে অধিকতর উৎকর্ষতা আনয়নের লক্ষ্যে পুলিশের সকল পর্যায়ের তদন্তকারী কর্মকর্তাগণের জন্য আইন-বিধি ও নির্দেশনার ভিত্তিতে কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ উপযোগী একটি তদন্ত নির্দেশিকার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হয়ে আসছে। জেলা পুলিশ, মেট্রোপলিটন পুলিশ, পুলিশের বিশেষায়িত সংস্থা, সিআইডি, পিবিআই, র‌্যাবসহ মাঠ পর্যায়ে নিয়োজিত তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ এ নির্দেশিকাটি যথাযথভাবে অনুসরণ করবেন’। আসুন, আমরা একটু নজর বুলিয়ে নিই এই নির্দেশনা অনুসারে পুলিশ কী ভূমিকা পালন করছে।

নির্দেশিকার ১৬তম অধ্যায়ে ১৬.২ এ মানবাধিকার রক্ষায় পুলিশের ভুমিকা-‘(চ) সকলের প্রতি সদয় আচরণ ও ভদ্র ব্যবহার করে। (ছ) বৈষম্যমূলকভাবে কাউকে গ্রেপ্তার, হয়রানি, আটক, তল্লাশি ও মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার না করে। (জ) প্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের প্রতি কোন প্রকার শারীরিক, মানসিক নির্যাতন এবং অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ না করে’। ১৬.৪.২ গ্রেপ্তার বিষয়ক অংশে-‘(খ) গ্রেপ্তারের সাথে জড়িত আইন শৃঙ্খলা সদস্যদের পরিচয় প্রদান। (গ) গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে কোথায় রাখা হবে, তা সুস্পষ্টভাবে জানানো’। আপনি যদি পুলিশের ব্যবহারিক কর্মকান্ড ও আচারণের সাথে মেলাতে চান, তবে শতভাগ হতাশ হতে হবে। একজনকে তুলে নেওয়ার পরেও সংশ্লিষ্ট থানা পর্যন্ত ঘটনা অস্বীকার করে, কোথায় রেখেছে সেটিও জানায় না। আপনাকে বা আমাকে হতাশ করার মতো বহু নজির চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যাবে। কার্টুনিষ্ট কিশোর বা মুশতাক এর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা ভাবুন!! ১৬.৪.৫ এ বলা হচ্ছে-‘বেআইনি সমাবেশ দমন করতে বল প্রয়োগ ও অস্ত্র ব্যবহারের পূর্বে বারবার মৌখিকভাবে সতর্কীকরণ। বল প্রয়োগর ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে পর্যায়ক্রমে বল বৃদ্ধি করা। যতক্ষন পর্যন্ত সম্ভব অস্ত্র ব্যবহার না করা’। ১৬.৭ মৌলিক আইন প্রয়োগের ক্ষমতা, শক্তি, প্রয়োগ ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার-‘(খ) আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার নিশ্চিত করতে সব সময় শেষ চেষ্টা হিসাবে দেখতে হবে। আগ্নেয়াস্ত্র শুধু তখনই ব্যবহার করা যাবে যখন বিশেষ পরিস্থিতিতে মৃত্যু বা মারাত্বক জখম হওয়ার আশঙ্কা থাকবে, শুধু জীবন বাঁচানোর উদ্দেশ্যে অপরিহার্য হলে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা যাবে’।

উপরেল্লেখিত নির্দেশনা অনুসারে বাঁশখালীতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ দমনে পুলিশ কোন নির্দেশনাই অনুসরণ করেনি। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই সেদিন শ্রমিকদের মব থেকে সম্পদ রক্ষা, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি থাকে, তবে লাঠি চার্জ বা ফাঁকা গুলি করলেই মব ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতো। কিন্তু এর কোন কিছুই পুলিশ অনুসরণ না করে খুব কাছ থেকে প্রথমেই গুলি ছুঁড়েছে। যারা নিহত হয়েছেন তাদের সুরতহাল রিপোর্টেই বলা হয়েছে গুলি শরীরে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে বেরিয়ে গেছে। গুলিবিদ্ধ প্রত্যেকের গুলি লেগেছে মাজার উপরিভাগে।

একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। তারা ২০১৬ সালের মতো বলবে, পুলিশের কোন দায় নেই, সকল দায় শ্রমিকদের। ইতিমধ্যে তাদের নামে মামলাও দেওয়া হয়েছে দুটি। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে এমনই হয়ে আসছে। যে স্বাধীনতা এ দেশের শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের যৌথ লড়াইয়ে অর্জিত, সেই স্বাধীনতা এখন লুটেরা ধনীক শ্রেণীর একক স্বাধীনতায় পরিণত হয়েছে। যাদের স্বার্থ রক্ষায় এ দেশের পুলিশ তাদেরই তৈরি নির্দেশিকাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে গুলি করে কৃষক-শ্রমিক আর তাদের সন্তানদের হত্যা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিাধাগ্রস্থ হয় না।

কেন হয় না?? কারণ প্রত্যেক শাষকগোষ্ঠীর একটি শ্রেণী চরিত্র থাকে। সেই অনুসারেই সে ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের চাপে সিভিল রাইট সম্পর্কিত কিছু বিধি-নিষেধ বা নির্দেশিকা প্রণয়ন করলেও সেটি প্রতিপালন করে না। এর ভুরি ভুরি নজির আমাদের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রয়েছে। গত দুই দিন আগে লিখেছিলাম, করোনা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগ বিষয়ে। দুর্যোগ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ আইন সরকার যথাযথভাবে প্রয়োগ করছে না, সেই লুটেরা ধনীক শ্রেণীর স্বার্থেই। এই মহামারির সময়ে লাখ লাখ শ্রমিককে স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়ে, শ্রমজীবী মানুষের খাবারের নিশ্চয়তা না দিয়ে তাদেরই স্বার্থ রক্ষা করছে।

’দুনিয়ার মজদুর এক হ ‘ শ্লোগান দেওয়া শ্রমিক লীগ, শ্রমিক দল, শ্রমিক কল্যান ফেডারেশন বা হেফাজত কেউই কিন্তু শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে আওয়াজ তোলেনি। তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, যারা কয়েকদিন আগে হেফাজতের মোদি বিরোধীতা দেখে তাদের মধ্যে দেশ প্রেমিকতা খুঁজে পেয়েছিলেন, তাদের কে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে বিবেচনা করছিলেন, কেনো বামপন্থীরা এদেরকে সাথে নিয়ে আন্দোলন করেনা বলে প্রশ্ন তুলেছেন, আজকে যখন শ্রমিক হত্যা হয় তখন তাদের নিশ্চুপ ভূমিকার ব্যাখা দিবেন কী? সবকিছুই আসলে শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি।
ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র উচ্ছেদ ব্যতীত পুলিশের গুলি করে শ্রমিক হত্যা বন্ধ করা যাবে না। আর হেফাজত এর মতো উগ্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক অপশক্তি লুটেরা ধনীক শ্রেণীর রাজনৈতিক চর্চার উপজাত। তাকে সাথে নিয়ে পথচলা আর এই লুটেরা শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা একই বিষয়। এই রাষ্ট্র আমার নয়, লুটেরার। জনগণের শক্তিকে সংগঠিত করাই মুক্তির একমাত্র পথ!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here