করোনার দ্বিতীয় ঢেউ, এবার দেখা মেলেনি মানবতার ফেরিওয়ালাদের

0
97

সত্যপাঠ ডেস্ক
‘ইবারকার লকডাউনে আমাগের কেউ আর তিরান (ত্রাণ) দিচ্ছে না। আগেরবার সব্বাই আমাগের দিকি খ্যায়াল করিলো। এবার কেউ তাকাইও দেখতেছেনা’-কথাটা শহরের জেল রোড এলাকার বাসিন্দা গোলে বানুর। শুধু গোলে বানু নন, যশোরের দিনমজুর, খেটে খাওয়া সকল সাধারণ মানুষের মুখেই যেনো একই আক্ষেপ ঝরে পড়ছে।
করোনাভাইরাসের প্রভাব থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সরকার দেশে লকডাউন ঘোষণা করায় সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ। গত বছর এসময় সরকারি সহায়তার পাশাপাশি ব্যক্তি ও সংগঠন পর্যায়ে অনেকে অসহায় ও দরিদ্রদের খাদ্য সহায়তা দিয়ে পেয়েছিলেন মানবতার ফেরিওয়ালা খেতাব। কিন্তু, এবার সে ধরনের কোনো উদ্যোগ এখনো লক্ষ্য করা যায়নি। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে পবিত্র রমজান। সামনে ঈদ। এ পরিস্থিতিতে দিনমজুর, রিকশাওয়ালা, ইজিবাইকচালক, পরিবহন শ্রমিক, ছোট ছোট কল-কারখানার শ্রমিকরা বাড়িতে বেকার বসে আছেন। তার ওপর বাজারে নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম। সবার পরিবারে নেমে এসেছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা। কেউ কেউতো রীতিমতো পরিবার-পরিজন নিয়ে দিশেহারা হয়ে উঠেছেন। আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কী হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু, অসহায়দের জন্য ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ সেইসব মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের কোনো উদ্যোগই এবার দেখা যাচ্ছে না।
কয়েকদিন যশোরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পরিস্থিতি অনুধাবন করার চেষ্টা করা হয়। এসময় কথা হয় অর্ধশত দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের সাথে যারা দিন আনেন দিন খান। এসব পরিবারের কেউ কেউ লকডাউনের খবরে সামান্য যা পূঁজি ছিল তা দিয়ে বাজার করে রেখেছিলেন। দু’তিন দিনের মধ্যেই সে বাজার উদোরে চালান হয়ে ভাড়ার শূন্য হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ পুলিশ ও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমে কিছু ইনকাম করছেন। তবে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। অধিকাংশই বাড়িতে অলস বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
সবার মুখে একই কথা, ‘ভাই এভাবে চললেতো আর পারবো না। না খেয়ে মরা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না’।
শহরের শংকরপুর এলাকার রিকশাচালক হামিদ গাজী, মনিরুল ইসলাম, ফজলুর রহমান জানান, গতবার করোনার সময় পুলিশ সুপার রাতে নিজে তাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। হাতে ছিল চাল, ডাল , তেল ও সাবান। কিন্তু এবার তারা কেউ আর আসেননি।
গোলপাতা মসজিদ এলাকার দিনমজুর টিটো বলেন, গতবার পৌরমেয়র তাদের চাল, ডাল, তেল দিয়েছিলেন। পৌরসভা থেকে কার্ডও দেয়া হয়। ওই কার্ডে পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে তারা খাদ্যদ্রব্য এনেছিলেন। কিন্তু, এবছর কেউ কোনো খবর নেননি।
একই কথা বলেন বেজপাড়া চোপদারপাড়া ব্রাদার্স ক্লাবের শ্রমজীবী কয়েকজন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নতুন মেয়র হয়েছে কিন্তু তিনি এখনো পর্যন্ত সাহায্যের হাত বাড়াননি।
নীলগঞ্জ তাঁতীপাড়া, শংকরপুর হারানের কোলোনি, বেজপাড়া আনসার ক্যাম্প বস্তির কয়েকজন দরিদ্র মানুষ জানান, তাদেরকে গতবার এমপি নাবিল ও শাহীন চাকলাদারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নেতাকর্মী খাবার পাঠিয়েছিলেন। এবার তাদের দিকে কেউ মুখ তুলে চাননি।
নওয়াপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আলতাফ বলেন, গত বছর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন ও চেয়ারম্যান নাসরিন সুলতানা খুশি একাধিকবার খাবার ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য দিয়েছেন। কিন্তু এবার আর দিচ্ছেন না। শহরের মোল্লাপাড়ার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, গতবার তাদের এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শেখ হারুনুর রশিদ ফুলু চারশ’ প্যাকেট চাল দিয়েছিলেন। এবার আর দেয়নি।
এদিকে, গত বছরের তুলনায় এবার নিত্যপণ্যের মূল্যও বেড়েছে অনেক বেশি। গত বছর সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৯০ টাকা লিটার। সেই তেল এবার লিটার হয়েছে একশ’ ১৫ থেকে একশ’ চল্লিশ টাকা। ‘একদিকে উপার্জন নেই, অন্যদিকে কিনে খাবো সেই স্বক্ষমতাও নেই। আর কয়েকদিন পর ছেলে মেয়ে নিয়ে পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না’দুঃখের সাথে কথাগুলো বলেন রিকশাচালক বাবর আলী।
এ চিত্র শুধু যশোর শহর কিংবা সদর উপজেলার না, প্রতিটি উপজেলার। কোথাও করোনার এই মহামারিতে ঘরে বসে থাকা অসহায়দের পাশে এসে দাঁয়াননি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। সরকার পরিবার প্রতি আড়াই হাজার টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দিলেও তা পাওয়ার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। সেই পর্যন্ত যদি লকডাউন বা চলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকে তাহলে শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের দুরাবস্থার কোনো অন্ত থাকবে না বলে মনে করেন সমাজ বিশ্লেষকরা।
এ ব্যাপারে কয়েকজন রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার কর্মীদের সাথে কথা হলে সবাই পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বক্তব্য দিয়েছেন। তারা বলেছেন, নির্বাচন সামনে ছিল বিধায় গত বছর অনেক নেতা, পাতিনেতা, উপনেতা কিছু খাদ্য সহায়তা দিয়েছিলেন। নির্বাচন শেষ- হওয়ার সাথে সাথে সহায়তাও শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন তারা। তাদের ভাষায়, কেউ জনপ্রতিনিধি হওয়ার খায়েশে আবার কেউ দলীয় পদ-পদবী পাওয়ার আশায় আবার কেউ আত্মপ্রচারের আলোয় আসতে ওইসব নেতা কিছু সহায়তা করেছিলেন। এখন নির্বাচন শেষ-‘মানবতার ফেরিওয়ালা’রাও হাত গুটিয়ে নিয়েছেন বলে মনে করেন তারা।
এদিকে, আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরে সারা দেশে এক কোটি নয় হাজার নয়শ’ ৪৯টি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেজন্য ৪৫০ কোটির ওপর টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে তা বিতরণের উদ্যোগ এখনো শুরু হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে সরকারের সহায়তা প্রদানের বিষয়টি আপাতত স্থগিত আছে। পরবর্তী নির্দেশনা আসা মাত্রই আমরা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ শুরু করবো’।
যশোর পৌরসভার সচিব আজমল হোসেন বলেন, ‘গতবার একটানা তিনমাস পৌরসভা থেকে সাহায্য করা হয়েছে। এবার বাজেট নেই তাই সম্ভব হচ্ছে না’।
যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন বলেন, গতবার তিনি শহরের অলিতে গলিতে খাবার পৌঁছে দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার এখনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। তবে তিনি আশ্বস্ত করেন-শিঘ্রই এ কার্যক্রম শুরু হবে।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, কেন্দ্র থেকে যশোরে করোনার সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করা হচ্ছে। সময় হলে তারা এ কর্মসূচি শুরু করবেন।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তৌহিদুল ইসলাম (পিপিএম) বলেন, গতবার তারা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সেক্টরের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু এবার এখনো তাদের ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়নি। কবে নাগাদ শুরু হবে সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত নন বলে জানান।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রফিকুল হাসান বলেন, এখনো পর্যন্ত তাদের কোনো বরাদ্দ আসেনি। ঈদ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে কিছু অনুদান আসার কথা ছিল। কিন্তু আপাতত সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি বলে তিনি জানান।
সূত্রঃ গ্রামের কাগজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here