Monday, April 12, 2021
Home জাতীয় হাজী সেলিমের সাজা বহাল, আলোচনায় বাকিরা

হাজী সেলিমের সাজা বহাল, আলোচনায় বাকিরা

0
12

অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা

   

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের মামলায় পুরান ঢাকার আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিমের ১৩ বছর কারাদণ্ডের মেয়াদ কমিয়ে ১০ বছর বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত এক আপিলের শুনানি শেষে বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হক সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এ রায় ঘোষণা করেন। প্রায় দুই যুগ আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা ওই মামলায় পৃথক দুটি ধারায় হাজী সেলিমকে ১০ বছর ও তিন বছর কারাদণ্ড দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত।

শুধু হাজী সেলিম নন, উচ্চ আদালতে দুদকের করা এ ধরনের আরও অন্তত ২০টি মামলা বিচারাধীন। যার প্রায় প্রতিটিতে সরকারি অথবা বিরোধী দলের নেতারা নিম্ন আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। উচ্চ আদালতে হাজী সেলিমের সাজা বহাল থাকার পর গতকাল মঙ্গলবার অন্য মামলাগুলোও ছিল জনগণের আলোচনায়। তাদের সাজা বহাল থাকবে কিনা, বহাল থাকলে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কোন দিকে যাবে- মুখে মুখে ছিল এ রকম নানা প্রশ্ন।

গতকাল হাইকোর্ট হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে একটি ধারায় বিচারিক আদালতের দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখেন; বাতিল করেন তিন বছরের সাজা। এ ছাড়া রায়ের কপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তাকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। তবে এ রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন হাজী সেলিমের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা। এ ছাড়া আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় মারা যাওয়ায় এই মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে দি ত হাজী সেলিমের স্ত্রী গুলশান আরার সাজা বাতিল করেন হাইকোর্ট। তবে দুর্নীতির মাধ্যমে তার অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

সাজা বহালের রায় ঘোষণার পর হাজী সেলিমের ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্যপদ থাকার বৈধতা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে- এই রায়ের পর তার সংসদ সদসপদ থাকবে কিনা বা তাকে এই পদে রাখাটা নৈতিক বিবেচনায় কতটা সমর্থনযোগ্য হবে।

সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একজন সংসদ সদস্য নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত হলে তার পদ বাতিল হবে এবং মুক্তি পাওয়ার পর পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হন না। আর ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারা অনুযায়ী তার সাজার রায় স্থগিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হবেন না।


সংবিধান অনুযায়ী তার সংসদ সদস্যপদ থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। রায়ের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সাজা বহালের পূর্ণাঙ্গ রায় প্র্রকাশের পর সেটি দুদকের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পাঠানো হবে। এরপর হাজী সেলিমের সংসদ সদস্যপদ বাতিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন স্পিকার।

এর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি উভয় পক্ষের শুনানি শেষে রায়ের জন্য এ দিন ধার্য করেছিলেন হাইকোর্ট। আদালতে হাজী সেলিমের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার ও সাঈদ আহমেদ রাজা। দুদকের পক্ষে ছিলেন খুরশীদ আলম খান এবং রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল তামান্না ফেরদৌস।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন এবং ৫৯ কোটি ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ১৩২ টাকার তথ্য গোপনের অভিযোগে রাজধানীর লালবাগ থানায় মামলা করে দুদক। ওই মামলায় ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল হাজী সেলিমকে দোষী সাব্যস্ত করে দুদক আইনের দুটি ধারায় মোট ১৩ বছর কারাদ দেন সংসদ ভবন সংলগ্ন বিশেষ জজ আদালত। পাশাপাশি ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অবৈধ সম্পদ অর্জনে সহায়তা করার অভিযোগে এ মামলায় তার স্ত্রী গুলশান আরা বেগমকে (বর্তমানে প্রয়াত) তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন ওই আদালত।

২০০৯ সালের ২৫ অক্টোবর হাজী সেলিম বিচারিক আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন। পরে ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি তার সাজা বাতিল করে রায় দেন হাইকোর্ট। পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করে দুদক। ওই আপিলের শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায় বাতিল করে পুনরায় হাইকোর্টকে হাজী সেলিমের আপিলের শুনানি করতে নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। ওই নির্দেশনার পর গত বছর ৯ নভেম্বর মামলাটি শুনানির জন্য উদ্যোগী হয় দুদক।

এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১১ নভেম্বর আপিলের শুনানিতে হাজী সেলিমের মামলার যাবতীয় নথি (এলসিআর) তলব করেন হাইকোর্ট। ওই নথি পাওয়ার পর ৩১ জানুয়ারি শুরু হয় হাইকোর্টে পুনঃশুনানি। গতকাল রায় ঘোষণা করেন আদালত। এ মামলায় হাজী সেলিম বর্তমানে জামিনে আছেন।

অন্য যাদের মামলা বিচারাধীন :দুর্নীতি মামলার সাজা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আপিল আবেদন করেছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাজনৈতিক নেতা ও আলোচিত ব্যক্তি। বিশেষ জজ আদালতে ও হাইকোর্টে এখন পর্যন্ত তাদের সাজা বহাল রয়েছে। এর মধ্যে সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ১০ বছরের সাজার রায় বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।

সূত্র জানায়, ওয়ান ইলেভেন ও তার পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে কয়েক ডজন আলোচিত রাজনৈতিক নেতা, আমলা ও বিশেষ ব্যক্তি তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এর সিংহভাগ মামলায় বিশেষ জজ আদালতের রায়ে আসামিদের সাজা হয়। পরে আসামিরা ওই সাজা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আপিল করেন। তাদের সাজা বহালের পক্ষে যুক্তিতর্ক উত্থাপন করেছে দুদক। ওইসব মামলার মধ্যে ঢাকা-৭ আসনের ক্ষমতাসীন দলের এমপি হাজী সেলিমের মামলাটি অন্যতম।

দুদকের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান সমকালকে বলেন, সাজাপ্রাপ্তরা হাইকোর্টে আপিল করেছেন। আমরা হাইকোর্টে সাজা বহালের জন্য যুক্তিতর্ক উত্থাপন করেছি। হাইকোর্টে যাদের সাজা বহাল রাখা হয়েছে, তাদের সাজা আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সময়ের কিছু মামলার রায়ে হাইকোর্ট আসামিদের খালাস দিয়েছিলেন। ওইসব রায়ের বিরুদ্ধে দুদক আপিল করেছে। আপিল বিভাগ মামলাগুলো পুনঃশুনানির জন্য হাইকোর্টে পাঠিয়েছেন। শুনানিতে অনেকের সাজা বহাল রয়েছে। পরে তারা এই সাজা চ্যালেঞ্জ করে লিভ টু আপিল করেছেন। এর মধ্যে ২০টি মামলা সর্বোচ্চ আদালত পুনঃশুনানির জন্য হাইকোর্টে পাঠিয়েছেন।

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক সমকালকে বলেন, আপিল বিভাগ দুর্নীতির মামলাসহ অন্যান্য মামলার পুনঃশুনানির জন্য হাইকোর্টে পাঠান। হাইকোর্টের কার্যতালিকায় মামলার চাপ থাকার কারণে কিছু বেঞ্চ এই ধরনের মামলা দ্রুত শুনানি করেন। আর কিছু মামলা শুনানিতে দেরি হয়। এই মামলাগুলো খুব তাড়াতাড়ি নিষ্পত্তি হবে- বাস্তবতার নিরিখে তা প্রত্যাশা করা কঠিন।

যাদের সাজা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন তারা হলেন- বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, তার ছেলে মীর হেলাল উদ্দিন, সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, তার স্ত্রী অ্যাডভোকেট সিগমা হুদা। আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া হাইকোর্ট থেকে খালাস পেয়েছেন। দুদক এই রায়ের কপি পেলে খালাসের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান পলাতক থাকায় তার সাজা বহাল রয়েছে।

এ ছাড়া যাদের সাজা বিচারাধীন, তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির সাবেক এমপি হাফিজ ইব্রাহীম, সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি, বিএনপি নেতা ও সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বিএনপি নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমান উল্লাহ আমান, সাবেক এমপি রশিদুজ্জামান মিল্লাত ও বন বিভাগের সাবেক প্রধান কর্মকর্তা ‘বনখোকো’ নামে খ্যাত ওসমান গণি।

ওয়ান ইলেভেনের উল্লেখযোগ্য মামলার মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও সাবেক এমপি পঙ্কজ দেবনাথের মামলার সাজা অনেক আগে চূড়ান্তভাবে খারিজ হয়ে গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here