Tuesday, August 3, 2021
Home মতামত সমাজ ঐক্য যে কারণে জরুরি

সমাজ ঐক্য যে কারণে জরুরি

0
49

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। গত একটা বছর কেটেছে করোনা দুর্যোগে। পরিস্থিতি অনেকটা সামলে ওঠা গেলেও এর মেঘ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এ পরিস্থিতিতেই উদযাপিত হতে যাচ্ছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। করোনাকালে এ আয়োজনের পরিসর কিছুটা গণ্ডিবদ্ধ হলেও অর্থাৎ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে অনেক কিছুই সীমিত হলেও সার্বিকভাবে বিষয়টি সামান্য নয়; অসামান্যই বটে। ৫০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের। এই প্রেক্ষাপটে আমরা কতটা কী অর্জন করলাম, লক্ষ্যই বা কতটা পূরণ হলো- এসব বিষয় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই সামনে এসে যায়। আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতি নানা ক্ষেত্রেই ঘটেছে। একই সঙ্গে এও তো সত্য; আমাদের অনেক অর্জনের বিসর্জনও ঘটেছে। মানুষের অধিকার আজও বিপন্ন। উপরন্তু অধিকারের বিসর্জন ঘটেছে অনেক ক্ষেত্রেই। এই বিসর্জন ঘটেছে হীনস্বার্থবাদী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার অপপ্রয়াসের কারণে। রাজনৈতিক ও সরকারি পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের অনেক ক্ষেত্রে অদূরদর্শিতা ও স্ববিরোধিতার কারণেও। বিসর্জন ঘটেছে অনিয়ম-দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারিতার কারণেও। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে আমাদের মুক্তির ডাক দেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্য ছিল মূলত মুক্তি অর্জন।
প্রশ্ন হচ্ছে- স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছরে আমরা যদি জিজ্ঞাসা করি, নিজেদের যে লক্ষ্যে ১৯৭১ সালে মুক্তির কথা বলা হয়েছিল, সেই মুক্তি কি আমাদের এসেছে? উত্তর সহজ-সরল নয়, বরং জটিলই। আমরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে চলে গেছি। অথচ মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল সমাজতন্ত্রের। সাম্প্রদায়িকতা-ধর্মান্ধতা-মৌলবাদের কবর দেওয়া শুধু অঙ্গীকারই ছিল না; এ প্রত্যয় বাস্তবায়নে দৃঢ়তাই ছিল বড় শক্তি। তাও হলো না; এখনও এ সবকিছুর বিষবাষ্প আক্রমণ করে। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের খবর কী? রাজনৈতিক স্বচ্ছতাই বা কতটা নিশ্চিত করা গেল? কোনোটার উত্তরই প্রীতিকর নয়। ভোটাধিকারের প্রশ্ন কিংবা নির্বাচন নিয়ে কথা উঠলে হতাশাই যেন জাপটে ধরে। নির্বাচন কমিশন, যে সংস্থাটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত; এর চিত্র আজ খুবই বিবর্ণ। এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কারও কারও বিরুদ্ধে বিস্তর জনঅভিযোগ তো আছেই; তাদের ভেতরকার দ্বন্দ্ব-বিতর্কও নির্বাচন ব্যবস্থার মলিন চিত্রটা সম্প্রতি ফের স্পষ্ট করেছে। সামাজিক বৈষম্যচিত্র দিন দিন প্রকট হচ্ছে। মুষ্টিমেয় লোকের করায়ত্ত হয়ে পড়ছে যেন সবকিছু। অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণের স্ম্ফীত চিত্র ইত্যাদি অনিয়ম-অস্বচ্ছতার বিষয়ে নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নিষ্প্রয়োজন।
মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা খুবই সত্য। তাই বলে ঐক্য যে মিথ্যা, তাও তো নয়। আমাদের সমাজে আমরা ঐক্য দেখেছি। বলেছি, ঐক্যগুলো অসামান্য। সেগুলো বেড়ে উঠেছিল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। মুক্তির লক্ষ্যে আন্দোলন হয়েছে। বায়ান্ন, উনসত্তর, একাত্তরে আমাদের ঐক্য ছিল অবিস্মরণীয়। প্রতিপক্ষ ছিল নিষ্ঠুর; নির্যাতন ছিল নির্মম। কিন্তু ঐক্য ভাঙেনি, বরং এর দৃঢ়তাই অধিকতর স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু তারপর? আমরা দেখেছি, ঐক্য ভেঙে গেছে নিপীড়নের কারণে নয়, অন্য কারণে। সেই কারণটা কী? আসলে ঐক্যের কারণ ও বিচ্ছিন্নতার কারণ ভিন্ন ভিন্ন নয়; একই। সেটা হলো স্বার্থ। ঐক্য গড়ে উঠেছে স্বার্থে; ভেঙেছেও স্বার্থের আঘাতে। দুই স্বার্থের মধ্যে অবশ্য পার্থক্য রয়েছে। ঐক্যর পেছনে ছিল সমষ্টিগত স্বার্থ, আর ভাঙনের পেছনে কাজ করেছে বিচ্ছিন্ন স্বার্থ। সমষ্টির স্বার্থের মধ্যে ব্যক্তির স্বার্থও থাকে। কিন্তু সেখানে ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে বিরোধটা বড় হয়ে ওঠে না। তারা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। যে ঐক্যগুলোকে আমরা ঐতিহাসিক বলে স্মরণ করি, সেগুলো গড়ে উঠেছিল আন্দোলনের ভেতর দিয়ে এবং আন্দোলনের কারণে। সামনে একটা লক্ষ্য ছিল; সমষ্টিগত লক্ষ্য। যখন শেষ হয়েছে আন্দোলন, অমনি ঐক্য ভেঙে গেছে। আরও বলা যায়, যা ছিল ফুলের মালা, তা পরিণত হলো বিক্ষিপ্ত ফুলে। মালাটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বড় ঐক্যটি তৈরি হয়েছিল একাত্তরে; মুক্তিযুদ্ধ পর্বকেন্দ্রিক। মনে হয়েছিল, এটি কখনও ভাঙবে না। সেটিও ভেঙে গেল স্বাধীন দেশে এবং টুকরোগুলো বিষম যন্ত্রণার সৃষ্টি করল। ব্যাপারটা যেন দৃশ্যত সেই রকমের, যে রকম ঘটে লঞ্চযাত্রীদের মধ্যে। যতক্ষণ চলছে ততক্ষণ সবারই চিন্তা অভিল্প- কতক্ষণে পৌঁছা যাবে। কিন্তু যেই না লক্ষ্য আলাদা, গন্তব্য ভিন্ন ভিন্ন। আর নৌযানটি? বড়ই জীবন্ত ছিল সে যতক্ষণ চলছিল। ঘাটে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেল দৃশ্যপট। কিন্তু নৌযানের যাত্রী এবং আন্দোলনকারী মানুষ, এরা তো এক নয়। আন্দোলনকারীদের ঐক্যটা শুধু সহযাত্রীদের নয়, সহযোদ্ধাদের বটে। তাহলে? সহযোদ্ধারা কেন আলাদা হয়ে যান? এক সঙ্গে যারা লড়ছিলেন একটি সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে; তারা কেন শত্রু হয়ে গেলেন পরস্পরের? অস্ত্র কেন তাক করলেন একে অপরের বুকের ওপর? ঘটনাগুলো ঘটে কোনো অলৌকিক কারণে নয়;স্বার্থের প্ররোচনায়। যুদ্ধের সময় সবার স্বার্থ একটি লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশে তেমনি আর থাকল না। প্রত্যেকের লক্ষ্য হয়ে গেল স্বতন্ত্র এবং একের লক্ষ্যের সঙ্গে অন্যের লক্ষ্যের ভয়ংকর বিরোধ। আজ তা যেন আরও পুষ্ট। বাংলাদেশে এখন ঐক্য খুবই সামান্য; বিরোধটাই প্রধান বাস্তবতা।
কিন্তু কেন এমনটা ঘটল? কেন এভাবে সমষ্টি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল সংঘর্ষে উদ্যত কিংবা হিংস্রতার কারণে? দায়ী কে? প্রধান দায়িত্ব নিঃসন্দেহে নেতৃত্বের। নেতৃত্ব জনগণকে একত্র করেছিল বটে; কিন্তু এক করতে পারেনি। যুদ্ধউত্তর বাংলাদেশে এ পর্যন্ত নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ-সংঘাত তো কম হয়নি। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঐক্য; একই সঙ্গে রাজনীতিও। রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানেই সাধারণ মানুষের অকল্যাণের পথটা প্রশস্ত হওয়া। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তা-ই হলো। রাজনীতিতে বিস্তৃত হলো অপরাজনীতির ছায়া। এই ছায়া সৃষ্টি করতে থাকল একের পর এক ভয়ংকরতার। জনগণকে নানাভাবে এর মাশুল গুনতে হলো। এখন আমরা কী দেখি? দেখি, প্রার্থী ভোট চান ভোটারের কাছে, অথচ ভোটার কেন্দ্রে যাওয়ার আগেই তার ভোটটা লোপাট হয়ে যায়। কোনো কোনো বলবান প্রার্থীর দাপটের কাছে ব্যবস্থাটাই যেন হয়ে যায় নতজানু। নিকট অতীতে স্থানীয় সরকার কাঠামোর পৌরসভা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ক্ষেত্রে তা-ই যেন দেখা গেল। আসছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। সে ক্ষেত্রেও দৃশ্যপট যে একই থাকবে, তা অনুমান করা যায়। কারণ ব্যবস্থা যেখানে এত প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে অবস্থা ভালোর আশা করা দুরাশা; বিদ্যমান ব্যবস্থা না বদলিয়ে।
মুক্তিযুদ্ধ তো বটেই, এই ভূখণ্ডে অনেক বড় বড় আন্দোলন অল্প কিছু মানুষের ব্যক্তিগত মুনাফার অনুপ্রেরণাতে ঘটেনি। ঘটেছে অংশগ্রহণকারীদের সামনে মুক্তিলাভের স্বপ্ন কার্যকর থাকার কারণেই। ফললাভের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তা অন্যরকম। অংশগ্রহণকারীরা আত্মত্যাগ করেছেন, কিন্তু অর্জনের অংশ পাননি অনেকেই। ফসল চলে গেছে নেতাদের গোলায়। লক্ষ্যের যে কথা বলছি, কী ছিল সেই লক্ষ্য? মুক্তির? হ্যাঁ, সে তো বটেই। কিন্তু মুক্তি তো কোনো নির্বস্তুক ধারণা নয়। মুক্তির বস্তুগত ভিত্তি আছে, যা আকাশে থাকে না; থাকে স্থূল বাস্তবে। মুক্তির জন্যই তো আমরা নতুন রাষ্ট্র, নতুন সমাজ চেয়েছিলাম। কেননা, পুরোনো রাষ্ট্র ও সমাজ ছিল মুক্তির প্রতিপক্ষ। রাষ্ট্র ভাঙল। আমরা নতুন রাষ্ট্র পেলাম। কিন্তু দেখা গেল, সে-রাষ্ট্র নামে যতটা নতুন, কাজে ততটা নয়। কারণ ব্যবস্থার তো বদল হলো না। জনগণের কাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো না। সমাজ বদলায়নি, রাষ্ট্রও বদলায়নি। মাঝখানে যা হয়েছে তা হলো, সমাজ ও রাষ্ট্র বদলানোর অঙ্গীকারবদ্ধ প্রত্যয়- যে আন্দোলন, সেটা স্তব্ধ হয়ে গেল। একদা যে নদী বহমান ছিল তাতে যেন এখন স্রোত নেই। এ রকম যে শুধু আমাদের দেশেই ঘটেছে, তা নয়। আরও কোনো কোনো দেশে এমনটাই দেখা গেছে।
আবারও ফিরে আসি সেই ঐক্যের প্রসঙ্গে। মূল সমস্যাটি অবশ্যই ঐক্যের। ঐক্য না হলে শক্তি আসবে না। আর ঐক্য না থাকার সাদামাটা অর্থটা হচ্ছে অনৈক্য থাকা। অর্থাৎ সংঘর্ষমুখর হওয়া। সংঘর্ষের এই মুখরতায় আমরা এখন বিপন্ন। কিন্তু ঐক্য আসবে কীভাবে? মুখের কথায় যে আসবে না, সেটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। আসবে আন্দোলনের ভেতর দিয়ে। আর আন্দোলন কিছুতেই এগোবে না যদি তা শত্রুকে সঠিকভাবে চিহ্নিত না করে। শত্রু হচ্ছে পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলন চাই, যে আন্দোলন রাষ্ট্রের চরিত্রে পরিণত আনবে এবং সমাজে বৈপ্লবিক রূপান্তরের পক্ষটা পরিস্কার করে দেবে। ওই আন্দোলনই তো আসল আন্দোলন; অন্য আন্দোলন হবে হয় ক্ষণস্থায়ী, নয়তো সীমিত প্রকৃতির; যাতে না আসবে ঐক্য, না আমরা এগোতে পারব মুক্তির অভিমুখে। ঐক্য গড়ে উঠলে অনিয়ম-দুর্নীতি সবই পরাস্ত হবে। বাড়বে সৃজনশীলতা, কাটবে হতাশা। ওই পথে না এগোলে আমাদের অসন্তোষ ও ক্ষোভ অন্য কিছুই করবে না। পারবে না করতে; দলিত ও দমিত করা ভিন্ন। আমরা স্রোতের মতো প্রবহমান থাকব, বালুকণার মতো বিচ্ছিন্ন না হয়ে যদি অগ্রসরমান ঐক্য গড়ে তুলতে পারি সমষ্টিগত মুক্তির লক্ষ্যে; যা আমাদের কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দিতে পারে।

  শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্নেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here