Sunday, June 13, 2021
Home সম্পাদকীয় জঙ্গি নিশানায় তৃতীয় লিঙ্গ

জঙ্গি নিশানায় তৃতীয় লিঙ্গ

0
34

তাদের রাখতে হবে মূল স্রোতে

   

দেশের তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে ধর্ম শিক্ষার নামে কৌশলে জঙ্গিবাদী তৎপরতায় যুক্ত করতে চাইছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আনসার আল ইসলাম- গোয়েন্দা সূত্র উদ্ৃব্দত করে মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের এমন ভাষ্য আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। খবরটি এমন সময় এলো, যখন আমাদের জনসংখ্যার এই অংশকে মূল স্রোতে সম্পৃক্ত করতে নানা উদ্যোগের খবর সামনে আসছে। তাদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনে রাষ্ট্রীয় নানা উদ্যোগ ছাড়াও তারা এখন প্রকৃত পরিচয়েই ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছে এবং প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। পৈতৃক সম্পত্তিতে তারা কীভাবে সুযোগ পেতে পারে- এ নিয়েও চলছে সক্রিয় চিন্তাভাবনা। আমরা স্বস্তির সঙ্গে দেখেছি, ‘মুজিববর্ষ’ উপলক্ষে গৃহহীনদের মাথার ওপর ছাদ দেওয়ার যে কর্মসূচি সরকার গ্রহণ করেছে, সে সুযোগও পেয়েছে তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকরা। পাশাপাশি সমাজেও তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। আমরা গভীর উৎসাহের সঙ্গে দেখেছি, সদ্য উদযাপিত আন্তর্জাতিক নারী দিবসে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রথমবারের মতো খবর পড়েছেন তৃতীয় লিঙ্গের একজন নাগরিক। বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যক্রমেও তাদের সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। এত আলোর মধ্যে তাদের প্রতি জঙ্গিবাদের অন্ধকার জগতের হাতছানি সত্যিই উদ্বেগজনক। অথচ বিচ্ছিন্নভাবে হলেও তাদের জঙ্গিবাদবিরোধী সাম্প্রতিক তৎপরতাই দেখা গিয়েছিল। ২০১৫ সালের মার্চে তেজগাঁওয়ে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যার পরপরই দুই জঙ্গিকে ধাওয়া করে ধরে ফেলেছিল তৃতীয় লিঙ্গের কয়েকজন। দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও তখন এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে তাদের সাহসিকতা নিয়ে সাধুবাদ জানিয়েছিলাম। আমরা বলেছিলাম, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তাদের এমন আরও ইতিবাচক নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা সম্ভব হবে। সেদিক থেকে গত বছরের শেষদিকে প্রথমবারের মতো তৃতীয় লিঙ্গের জন্য একটি বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার খবর ছিল নিঃন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ধর্ম শিক্ষার নামেই জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীগুলো পরিবার-বিচ্ছিন্ন এই জনগোষ্ঠীকে তাদের দেশ ও সমাজবিরোধী দলে ভেড়াতে চাইছে। আমরা মনে করি, এই অপচেষ্টা কোনোভাবেই সফল হতে দেওয়া যাবে না। এতে এমনিতেই বঞ্চিত ও উৎপীড়িত এই জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, ব্যক্তিবিশেষের বিভ্রান্তি ও ভুলের কারণে তৃতীয় লিঙ্গের গোটা জনগোষ্ঠী যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সামাজিক হেনস্তার শিকার না হয়। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও সতর্কতার সঙ্গে খোঁজখবর নিতে হবে। সুনির্দিষ্টভাবে তাদেরই আইনের আওতায় আনতে হবে, যারা জঙ্গিবাদের পথে পা বাড়িয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচার ও শিক্ষা বিস্তারেও অবিলম্বে এগিয়ে আসতে হবে সংশ্নিষ্টদের। তারও আগে এই অপচেষ্টার নাটের গুরুদের শনাক্ত ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। আমরা জানি, জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকার যথেষ্ট সক্রিয়তা ও সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু এই বিষবৃক্ষের শিকড় কতটা বহুমাত্রিক হতে পারে; সর্বশেষ এ খবরের মধ্য দিয়ে তা আরেকবার প্রমাণ হলো। এও মনে রাখতে হবে, তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার বিকল্প নেই। শুরু থেকেই যদি তাদের শিক্ষা, সামাজিকীকরণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে যে কোনো ধরনের ফাঁদে পা দেওয়ার আশঙ্কা বহুলাংশে কমে যাবে। অস্বীকার করা যাবে না, তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী নিয়ে প্রাথমিক অনেক পদক্ষেপ এখনও বাকি। তাদের সংখ্যা নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মতে, তাদের সংখ্যা ১০ হাজার বলা হলেও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতে তা পাঁচ গুণ। এ ছাড়া সমাজে আরও অনেক পরিবার এ ধরনের সদস্যের তথ্য লুকিয়ে রাখে বলে তারা রয়ে গেছে হিসাবের বাইরে। তারপরও আমরা মনে করি, ১৭ কোটি জনগোষ্ঠীর দেশে এই সংখ্যা খুব বেশি নয়। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগের সমন্বয় করা গেলে তাদের মূল স্রোতে স্থান দেওয়া কঠিন হবে না। কাজটি শুরু করতে হবে এখনই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here