Sunday, April 11, 2021
Home মতামত অনিয়মের বিরুদ্ধে ছিলেন উচ্চকণ্ঠ

অনিয়মের বিরুদ্ধে ছিলেন উচ্চকণ্ঠ

0
8

আনু মুহাম্মদ

প্রিন্ট সংস্করণ

ইব্রাহিম খালেদ

ইব্রাহিম খালেদ

বাংলাদেশের অর্থকরী খাত বিশেষত ব্যাংকিং খাত থেকে যখন ভয়ংকর নৈরাজ্য-দুর্নীতি ও মাফিয়া নিয়ন্ত্রণ চলছে, তখন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ছিলেন আমাদের ভরসার জায়গা। তিনি ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত ছিলেন, অভিজ্ঞ ছিলেন। তার নৈতিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। সে অবস্থান থেকে তিনি যেসব কথা বলতেন তা আমাদের সাহস দিত।
আশির দশক থেকেই খেলাপি ঋণ এবং বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর লুণ্ঠনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যাংকগুলোকে ব্যবহার করার প্রবণতা চলে আসছিল। বড় ঋণখেলাপিরাই ব্যাংকিং খাতের ওপর বেশি প্রভাব বিস্তার করে আসছিল। মাঝে মধ্যে কিছু ব্যক্তি তাদের পথে বাধা সৃষ্টি করেছেন। খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ছিলেন তাদের অন্যতম। ব্যাংকিং খাতে যতদিন কর্মরত ছিলেন লুণ্ঠন-দুর্নীতি ঠেকাতে তিনি তার মতো করে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছেন এবং অবসর গ্রহণের পরও তিনি তার নৈতিক অবস্থানের কারণে সব সময় সরব ছিলেন। কিছু গোষ্ঠীর অবাধ লুণ্ঠনের কারণে ব্যাংকিং খাত যে একটি বড় ধরনের ধসের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে সে বিষয়ে সরকার ও সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন সব সময়।
ব্যাংকিং খাত ছাড়াও শেয়ারবাজারের প্রতি তার বিশেষ মনোযোগ ছিল। ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে একটি বড় ধরনের ধস নামে। এতে সরকার তদন্ত কমিটি করতে বাধ্য হয়েছিল। সেই তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি তদন্ত কমিটির প্রধান থাকায় সঠিক তথ্য প্রকাশ হওয়ার ব্যাপারে সবাই আস্থাশীল ছিলেন। সঠিক তথ্যই তিনি বের করে এনেছিলেন। যে মাফিয়া গোষ্ঠীর কারণে শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে, লাখ লাখ মানুষ পথে বসেছে তাদের তিনি শনাক্ত করেছিলেন। কিন্তু তারা সরকারের ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করায় সেই তদন্ত প্রতিবেদন আর প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে তিনি যে পরামর্শগুলো দিয়েছিলেন সেগুলোও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে শেয়ারবাজার এখনও নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
গত কয়েক বছরে ব্যাংকিং খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট বা পাচার হওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। আমাদের আর্থিক খাত দাঁড়িয়ে আছে প্রবাসী শ্রমিক এবং গার্মেন্ট শ্রমিকদের রক্ত ও হাড়ের ওপরে। তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার বড় মজুদের ওপর ভিত্তি করে একশ্রেণির মানুষ আর্থিক লুটপাট করছে, দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করছে। খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এসব বিষয়ে সরব ছিলেন। তিনি আর্থিক লুটপাট বন্ধে যেসব বিষয় উত্থাপন করেছিলেন, সেগুলোর কোনো সমাধান হয়নি। কারণ সরকারের ওপর এই মাফিয়া গোষ্ঠীর প্রভাব ছিল। কিন্তু তার বক্তব্য ও সোচ্চার অবস্থানের কারণে সমাজে প্রতিবাদ জারি হয়েছিল। মানুষ বুঝতে পেরেছিল কী কারণে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে কিংবা মানুষের সম্পদ কীভাবে কিছু গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে।
অনেক ধরনের ভয়ভীতি ও চাপকে উপেক্ষা করে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ নিজের নৈতিক অবস্থান দৃঢ় রেখেছিলেন। গুরুতর অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছিলেন, কথা বলছিলেন, লিখছিলেন। তার এ শূন্যতা দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি দেশের জন্য আজীবন যে দায়িত্ব পালন করে গেছেন সে জন্য জাতি অবশ্যই তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। আশা করি, তরুণ প্রজন্ম খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের আদর্শ ও নৈতিকতা ধারণ করবে এবং সব সময় সরব থাকবে অন্যায়, লুণ্ঠন ও মাফিয়া গোষ্ঠীর সর্বব্যাপী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।

লেখক :অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here