‘স্বপ্ন’ স্বপ্নই থেকে গেলো বাঘারপাড়ার ফিরোজার

0
43

 

বাঘারপাড়া প্রতিনিধি॥ “স্বপ্ন ছিলো স্বামী সন্তান নিয়ে একটু ভালো ঘরে ঘুমাবো। ছেলে-মেয়েদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলবো। সহায় সম্বলহীন এক পরিবার থেকে ২০০১ সালে এ বাড়িতে বউ হয়ে আসি। বাসর ঘর থেকেই রাতের আকাশের ‘তাঁরা’ দেখতে পেয়েছি। ঝড়-বৃষ্টিতে কাঁথা-বালিশ বুকের মধ্যে নিয়ে সারা রাত কাটিয়ে দিয়েছি। তখন থেকেই সংকল্প করি সন্তানদের যেনো এই কষ্টের মধ্যে না পড়তে হয়। তার জন্য একটা ভালো ঘর তৈরি করতেই হবে। তাদের লেখাপড়া শেখাতে হবে।

‘কর্মঠ স্বামী’ ছিলো আমার একমাত্র সম্পদ। দু’জনে শুরু করি দিন মজুরের কাজ। প্রতি বছর সঞ্চয় বাড়তে থাকে। ছেলে মহেদিকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত নিতে পেরেছি। মেয়ে মাহমুদা এখনো স্কুলে যায় নি। তার বয়স দুই বছর। ভালোই চলছিলো আমাদের সংসার। পরিকল্পনা মতো ২০১৯ সালে জমানো টাকা দিয়ে তিন রুম বিশিষ্ট ঘরের কাজ শুরু করি। ঘরের দেওয়াল পর্যন্ত কাজও শেষ করে ফেলেছি। হঠাৎ সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলো। স্বামীর কন্ঠনালীতে ধরা পড়ে টিউমার থেকে ক্যন্সার। প্রথমে স্থানিয় (বাঘারপাড়া, যশোর ও মাগুরা) চিকিৎসকের কাছে নিলাম। পরিবর্তন হচ্ছে না দেখে ঢাকায় নিয়ে যাই। জমানো সঞ্চয় ও ধার-দেনা করে তাঁর চিকিৎসা করালাম। তারপরও বাঁচাতে পারলাম না তাঁকে। রোগ নির্ণয়ের তিন মাসের মধ্যেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে”। এ সব কথা বলছিলেন বাঘারপাড়ার ফিরোজা বেগম। এ সময় তাঁর দুগাল বেয়ে বয়ে যায় চোখের নোনা জল। ভেজা চোখে তিনি আরও বলেন, “এখন ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাবার বাড়িতে রাত কাটাতে হচ্ছে। সন্তানদের লেখা-পড়াও অনিশ্চিত। জানিনা ভবিষ্যতে কি আছে কপালে”। ফিরোজা বেগম যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের ভাতুড়ীয়া গ্রামের মৃত ওবায়দুলের স্ত্রী ও একই গ্রামের দ্বীন আলীর মেয়ে।

পারিবারিক সূত্র থেকে জানা গেলো, শামছের বিশ্বাসের ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় হলো ওবায়দুল। পেশায় সে একজন বর্গা চাষী। ওবায়দুলের সম্পদ বলতে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া বসত বাড়ির তিন শতাংশ জমি ছাড়া কিছুই নেই। তাই পরিবারকে সুখে রাখতে শুরু করেন কঠোর পরিশ্রম। পরিশ্রমী এই ওবায়দুল সকালে কৃষি কাজ, দুপুরে বেকারীর পণ্য বিভিন্ন দোকানে সরবরাহ করে। আবার বিকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত বর্গা জমিতে কাজ করেন। এ ছাড়াও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে প্রতি বছর একটা গরু কিনতেন। উদ্দেশ্য কুরবানির ঈদে বেশী দামে বিক্রি করে টাকা জমাবেন। এ ভাবেই কেটে গেছে ১৯টি বছর।

ফিরোজার ছোট ভাই আমির আলী বলেন, “এই দম্পতির স্বপ্ন ছিলো, নিজেদের একটা সুন্দর বাড়ি থাকবে এবং কিছু আবাদি জমিজমাও থাকবে। এ বিষয়ে অন্য ভাইদের সাথে দুলাভাই প্রায়ই চ্যালেঞ্জ করতো। জমানো টাকা দিয়ে বাড়িও শুরু করেছিলেন তারা। কিন্তু মেঝো ভাই মারা যাওয়ায় ঘরটাই এখন শেষ করতে পারছেন না। সংসার চালাতে এসএসসি পরিক্ষার্থী ভাগ্নে মেহেদিকেও করতে হচ্ছে ‘রাজমিস্ত্রীর জোগালে’ কাজ। সারা দিন বাড়িতে থাকতে পারলেও রাত হলে ঘুমাতে যায় অন্যের বাড়িতে। এ ভাবে কত দিন চলবে। মাত্র ছয় বাঁধ টিন হলে তারা অন্তত মাথা গোজার ঠাইটুকু পেতো”।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here