সড়কে আর কত প্রাণ ঝরবে?

0
5

 

 

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বরাবরই আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছি। যে হারে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে, তা যেন জাতীয় দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। সোমবারের সমকালে প্রকাশ, ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে শেরপুরে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই গাড়ির চালকসহ ছয়জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আমরা দেখেছি, যাত্রীবাহী একটি বাসের চালক কীভাবে বেপরোয়া গতিতে একটি বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা পাথরবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে সংঘর্ষ বাধায়। আমরা জানি, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। দুঃখজনকভাবে এ দুর্ঘটনায় উভয়টিই আমরা দেখছি। আমাদের মনে আছে, ২০১৫ সালের অক্টোবরে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের এক বৈঠকে গতি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

 

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ওই কাউন্সিল তথা সড়ক নিরাপত্তার সর্বোচ্চ ফোরাম মহাসড়কে বাসের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে দিলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। মালিক-শ্রমিকদের লোভের কারণে গতি বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা মানুষের মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করছে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা; দীর্ঘ হচ্ছে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল। নিরাপদ সড়ক চাই-নিসচার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারাদেশে গত বছর সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনায় প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ নিহত হয়। আমরা মনে করি, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ভুয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো বন্ধ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ পর্যাপ্ত নয়। অনেক সময়ই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা হয় না। আমরা জানি, সড়ক দুর্ঘটনায় মামলার সংখ্যা অত্যন্ত কম। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যারা দুর্ঘটনার শিকার হন, তারা আদালতের দ্বারস্থ হন না। আবার আদালতে গেলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয় খুব কম মামলারই।

 

বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকেই এ প্রক্রিয়ায় যান না। আমরা জানি, সড়কে ১৯৮৩ সালে প্রণীত পুরোনো আইনেও অনেক কিছু ছিল না। তারই আলোকে আইনটি সময়োপযোগী করার উদ্যোগ নেয় সরকার। তা ছাড়া আমাদের মনে আছে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে সড়ক পরিবহন আইন পাস হলেও তা দীর্ঘ দিনে পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। ২০১৯ সালের নভেম্বরে নতুন আইনটির প্রয়োগ শুরু হলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। এর ফলে সরকার আইনটি সংশোধনের আশ্বাস দিয়ে আইন প্রয়োগের সময়সীমা ২০২০ সালের শেষ দিন পর্যন্ত বর্ধিত করলেও আইনটি সংশোধন হয়নি; বাস্তবায়ন তো দূরের বিষয়। আমরা দেখেছি, ইতোমধ্যে মহাসড়ক নির্মাণ, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ সময়োপযোগী করা এবং যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় মহাসড়ক আইন-২০২০ এর খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। আমরা মনে করি, সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে উভয় আইনই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আইনই শেষ কথা নয়। আইনে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে আমরা বাস্তবায়ন হতে দেখি না।

 

 

সড়কে প্রতিনিয়ত যে প্রাণ ঝরছে, এর রাশ টানতেই হবে। কেউ যাতে ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স না নেয়; গাড়ি যেন হেলপারদের দ্বারা চালানো না হয়; একই সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হলে একটি সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন যেমন তদারকির দিক থেকে সচেষ্ট থাকবে, তেমনি চালক নিয়োগ দিতে মালিকদেরও সতর্কতা প্রয়োজন। যাত্রীদের সচেতনতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সবচেয়ে বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবেন একজন গাড়িচালক। শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালকই যেন লাইসেন্স পান, সেটি নিশ্চিত করতে হলে বিআরটিএর যথাযথ ভূমিকা জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টানতেই হবে। বছরের পর বছর সড়ক মৃত্যুফাঁদ হয়ে থাকতে পারে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here