একুশের চেতনা, জাতীয়তাবাদ ও মুক্তির সংগ্রাম

0
32

 

ডা. মনোজ দাশ

ভাষা আন্দোলনকে শুধু ভাষার আন্দোলন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। একুশের ভাষার লড়াই বহুমাত্রিক চেতনার ভিত্তি তৈরি করেছিল। এই আন্দোলনের মধ্যেই অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ঘটেছিল। রাজনীতি-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এর গুণগত প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এটা সত্য, একুশের ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে মতাদর্শগত পার্থক্য ছিল। আন্দোলনে সাময়িক ঐক্যও ছিল। আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি ও তাকে প্রসারিত করার জন্য প্রগতিশীল নেতৃত্বের নিরন্তর প্রচেষ্টা ছিল ভাষা আন্দোলনকে সর্বদলীয় চরিত্রে গড়ে তোলা।

 

ভাষা আন্দোলনের দু-একটি প্রামাণ্য গ্রন্থের কথা বাদ দিলে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তথ্য বিকৃতি ঘটেছে নানাক্ষেত্রে। ঘটনাসমূহের মূল্যায়ন হয়েছে নানাভাবে। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের যথেচ্ছ স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে এর ব্যাপ্তি ঘটেছে। ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করার লক্ষ্যে বুর্জোয়া রাজনীতির অনুসারী কেউ কেউ এই একুশ শতকেও এসে নতুন নতুন তথ্যে বিভ্রান্তির জাল বিস্তার করছেন। এর ফলে একুশের ইতিহাস ও তার আনুষাঙ্গিক চিত্র ও চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিভিন্ন মাত্রায়। যেভাবেই দেখা হোক একথা স্বীকার করতেই হবে, ২০শে ফেব্রুয়ারি রাত্রি থেকে আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পর্কিত ছাত্র ও যুব কর্মীরাই সাংগঠনিকভাবে সবদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। শিক্ষিত মানুষের দ্বারা সূচিত একটি আন্দোলন কৃষক-শ্রমিকসহ গ্রাম-শহরের ব্যাপক মানুষের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার জাগরণ ঘটিয়েছিল। দেশ ও বিশে^র নানা প্রান্তে নানান শ্রেণি-পেশার মানুষ এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। ভাষা আন্দোলন বাঙালি মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত শ্রেণির আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠার লড়াই হওয়া সত্ত্বেও তাতে ব্যাপক জনগণের উপস্থিতি ছিল। আন্দোলনে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শগত প্রভাবের কারণে এটা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের কোনো একক রাজনৈতিক নেতা ও নায়ক ছিলেন না। জনগণই ছিলেন তার প্রকৃত নায়ক।

 

বায়ান্নর ধারাবাহিকতায় ৬৯-এর গণআন্দোলন ও ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশেও একুশের সর্বজনীন দাবি ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন’ বাস্তবায়িত হয়নি। একুশের চেতনায় রাষ্ট্র ও সমাজের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনও ঘটেনি। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও সমাজও গড়ে ওঠেনি। মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদেরও অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চার দিকগুলো গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি প্রথম সংবিধানে এদের স্বীকৃতিও ছিল না। বাংলাদেশের সংখ্যাধিক্য জনগোষ্ঠী বাঙালির মাতৃভাষার অধিকার যেখানে বাস্তবায়িত হয়নি সেখানে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশের প্রশ্ন এদেশের শাসক শ্রেণির কাছে গুরুত্ব পাবে না এটাই স্বাভাবিক।

 

কিন্তু একুশের চেতনা হারিয়ে যায় নি। ভাষা আন্দোলনের চেতনা জাতীয় প্রয়োজনে অধিকার আদায়ের সংগ্রামী প্রেরণা হয়ে উঠেছে বার বার। একুশ মানুষকে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে উদ্বুদ্ধ করেছে। একুশ এদেশের মানুষকে অসাম্প্রদায়িক ও ভাষাভিত্তিক প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী চেতনায় সংগ্রাম গড়ে তুলতে বারবার উদ্বুদ্ধ করেছে, পথ দেখিয়েছে। সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় একুশের অবদান অসামান্য।

 

ভাষা আন্দোলনের বিশেষ গুরুত্বপর্ণ দাবি ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও প্রচলন’-এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে এদেশের মেহনতি মানুষের আর্থ-সামাজিক চাহিদা পূরণের সম্পর্ক। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর শ্রেণিস্বার্থের পাশাপাশি ব্যাপক জনগণের স্বার্থের প্রতিফলন ঘটেছে ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের দাবির’ মধ্য দিয়ে। জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার অধিকাংশ মানুষের অগ্রযাত্রার অবলম্বন। মাতৃভাষা শিক্ষার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটানো অপেক্ষাকৃত সহজ। এজন্যই মুক্তিযুদ্ধের এই অর্ধ শতাব্দিতেও বিত্তবান ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের শ্রেণিস্বার্থের কারণে একুশের অন্যতম দাবি ‘সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন’ বাস্তবায়িত হয়নি। সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, এমন ঘোষণা সত্ত্বেও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে, বিশেষত উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞানশিক্ষা, উচ্চ আদালতে বাংলার বদলে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রভাষার সুদৃঢ় অবস্থান। এর ফলে ব্যাপক জনগণের স্বার্থ ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যমে বিভাজিত। রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষার ভিন্নধারা।

 

একুশের আন্দোলন, একুশের চেতনা পাকিস্তানের দ্বিজাতি তত্ত্বের আদর্শ এবং তাতে নিহিত অগণতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক চেতনা অস্বীকার করে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে চেতনার ধারা তৈরি করেছিল বাংলাদেশের লুটেরা বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি তাকে নিঃশেষ করে দিতে পারেনি।

 

এক সময় জাতীয়তাবাদ বিকাশের দুটি বিপরীতমুখী চারিত্রিক প্রবণতা ছিল। প্রথমটি হলো জাতীয় জীবনের জাগরণ, জাতীয় স্বাতন্ত্র্য, জাতীয় স্বার্থরক্ষা ও স্বাধীনতা-মুক্তির প্রয়াস। দ্বিতীয়টি হলো অন্য জাতিসমূহের সাথে সম্পর্কের প্রসার, জাতীয় সীমানার চৌহদ্দির ভাঙন এবং সামাজিক জীবনের আন্তর্জাতিকীকরণ। মূলত উভয় প্রবণতাই ছিল প্রগতিশীল। এর ফলে সাধারণভাবে মানবসভ্যতার সমৃদ্ধি সাধিত হয়। কিন্তু বুর্জোয়ারা জাতীয়তাবাদের কোনো প্রবণতাকে আজ আর ধারণ করে না। আমাদের দেশের বুর্জোয়ারা একুশের চেতনার মধ্য দিয়ে উত্থিত জাতীয়তাবাদ ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রগতিশীল বিকাশের ধারাকে তাদের শ্রেণিস্বার্থের জালে আটকে রেখেছে।

 

প্রথমত বাংলাদেশের লুটেরা বুর্জোয়ারা শ্রমিক-কৃষক মেহনতি মানুষের শ্রেণিস্বার্থকে জাতীয়বাদ পুরু কম্বলের নীচে ঢেকে রেখেছে। দ্বিতীয়ত জাতীয়তাবাদকে তারা আবার উগ্রভাবে ব্যবহার করে তাদের শ্রেণির একনায়কত্বমূলক কর্তৃত্ববাদী শাসনকে টিকিয়ে রাখতে চায়। এর মাধ্যমে তাদের অগণতান্ত্রিক ও লুটপাটের ফ্যাসিবাদী ধরনের শাসনের পক্ষে সামাজিক সম্মতি আদায়ের চেষ্টা করে। তৃতীয়ত তারা কখনই সমগ্র জাতির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। তারা বুর্জোয়াদের স্বার্থকেই দেখে। চতুর্থত বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন পর্বে তারা সাম্রাজ্যবাদের সমর্থনে ক্ষমতায় থাকে সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে।

 

এটা সবারই জানা থাকার কথা, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য নতুন কিছু প্রপঞ্চ যুক্ত করেছে। বর্তমান বিশ্বায়ন পর্বে জাতীয় স্বার্বভৌমত্বের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ চলছে। সাম্রাজ্যবাদী লগ্নিপুঁজির চাহিদা হলো তাদের আধিপত্যের কাছে সমস্ত জাতিরাষ্ট্র তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব পরিত্যাগ করুক। এজন্য সাম্রাজ্যবাদ আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলির শাসক শ্রেণিকে তার প্রভাব বলয়ের মধ্যে টেনে নিয়েছে। আর আমাদের শাসকশ্রেণি অনুসরণ করছে সাম্রাজ্যবাদনির্ভর প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংসকারী অগণতান্ত্রিক লুটপাটের উন্নয়ন ধারা, যা দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ও জাতীয় মুক্তি অর্জনে বাধার সৃষ্টি করেছে। যার ফলে সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের সহযোগী বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির সাথে দেশের জনগণের দ্বন্দ্ব তীব্রতর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি জাতি-রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতাকে দুর্বল করার জন্য বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পরিচিতি সত্তার মাধ্যমে মানুষে-মানুষে বিচ্ছিন্নতাকে মদত দেয়। আজকের দুনিয়ায় বুর্জোয়ারা এই পরিচিতি সত্তাকে ব্যবহার করে মানুষকে বিভিন্ন গোষ্ঠী-ধর্ম-অঞ্চল ইত্যাদিতে সাম্প্রদায়িকতভাবে ভাগ করে তাদের মধ্যে সংঘাত এবং প্রতিযোগিতার সম্পর্ক তৈরি করে দেয়। পরিচিতি সত্তার রাজনীতি শ্রেণি ঐক্য নষ্ট করার কাজে ব্যবহৃত হয় এবং জনগণের ঐক্যবদ্ধ শ্রেণি আন্দোলন গড়ে তোলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

 

এজন্য শ্রমিক-কৃষক মেহনতি শ্রেণির মুক্তি ও প্রকৃত জাতীয় মুক্তির জন্য নিজের দেশে ও দুনিয়াব্যাপী পুঁজির ক্ষমতা ভেঙে ফেলা ছাড়া মেহনতিদের অন্য উপায় নেই। আর তার জন্য একটি নির্দিষ্ট দেশের বুর্জোয়াদের বিপক্ষে ঐ নির্দিষ্ট দেশের সব মেহনতি শ্রেণির ঐক্যের পাশাপাশি দুনিয়ার সকল দেশের মেহনতি মানুষের আন্তর্জাতিক সংহতি দরকার। বর্তমান বিশ্বায়ন পর্বে সাম্রাজ্যবাদী কৌশল থেকে এটা স্পষ্ট, সমাজপ্রগতি ও শ্রেণিসংগ্রাম থেকে প্রকৃত জাতীয় মুক্তি ও বিকাশের প্রশ্নকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব নয়। বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন পর্বে বুর্জোয়ারা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে না বা তাকে নেতৃত্ব দিয়ে সামনে অগ্রসর করতে পারে না। মেহনতি মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করে এ কাজ উচ্চতর ও নতুন পথে করতে হবে বাম ও কমিউনিস্টদের। বাম ও কমিউনিস্টদের দায়িত্ব হচ্ছে- একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতীয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও প্রকৃত মুক্তির জন্য জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার ধারণ এবং তার সাথে নিপীড়িত মেহনতি মানুষের শ্রেণিস্বার্থের মৈত্রী স্থাপন করে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটানো।

 

লেখক: সভাপতি, খুলনা জেলা কমিটি, সিপিবি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here