ভবদহে আবারও নদী খনন জলাবদ্ধতার আশংকা

0
127
ফাইল ফটো
নিজস্ব প্রতিবেদক: যশোরের ভবদহ অঞ্চলে যাতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয় সেজন্য গত বছর টেকা, শ্রী ও হরি নদীতে ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘে পালইট চ্যানেল খনন করা হয়েছিল। দুই কোটি ৫৫ লাখ ১২ হাজার ৭২৭ টাকা ব্যয়ে করা এ খননকাজ পানি নিষ্কাশনে কোনো কাজে আসেনি। খননের পরপর পলিতে পুনরায় ভরাট হয়ে যায় নদী। এ বছর ভরাট হয়ে যাওয়া নদীর মধ্যে শুধুমাত্র শ্রী নদীর এক হাজার ৩০০ মিটার পুনরায় খনন করা হচ্ছে।
ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে টিআরএম-টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট(জোয়ারাধার) ফলপ্রসু বলে প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে এলাকার কোনো বিলে কার্যকর টিআরএম নেই। এই অবস্থায় এলাকার পানি নিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী পলি জমে উঁচু হয়ে পড়েছে। এলাকার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষেরা আশংকা করছেন, চলতি বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত বেশি হলে বৃষ্টির পানি জমে অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং যশোর সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে ভয়াবহ ও জলাবদ্ধতা দেখা দেবে।
অভয়নগর উপজেলার কালিশাকুল গ্রামের কৃষক নিমাই রায় বলেন,‘প্রতিবছর নদী কাটা হচ্ছে। কিন্ত নদী কেটে কোনো লাভ হচ্ছে না। কয়েকদিনের মধ্যে তা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এখনই পানির যা অবস্থা তাতে এবার বাড়িতে থাকা যাবে না। টিআরএম ছাড়া বাঁচার কোনো পথ নেই।’
যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে এ ভবদহ অঞ্চল। সেখানে ছোটবড় ৫৪টি বিল আছে। এ অঞ্চলের পানি ওঠানামার পথ মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী। কিন্তু সব নদীই এখন কমবেশি ভরাট হয়ে বিলের চেয়ে উঁচু হয়ে গেছে। পলি পড়ে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে নদী দিয়ে পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে না। এই অবস্থায় গত কয়েক বছর বর্ষা মৌসুমে ভবদহ অঞ্চলের অসংখ্য বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, মাছের ঘের, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে যায়। অবর্ণনীয় দুভোর্গের শিকার হয় এলাকার প্রায় চার লাখ মানুষ।
যশোর আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, মে মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ১৮০ মিলিমিটার এবং জুন মাসে ৩২২ মিলিমিটার। সূত্র জানায়, জেলায় গত বছর(২০১৯) মে মাসে ১১২ মিলিমিটার এবং জুন মাসে ১৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এ বছর মে মাসে ২৫৮ মিলিমিটার এবং চলতি মাসের ২২ জুন সকাল ছয়টা পর্যন্ত ২৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড, যশোর কার্যালয় সূত্র জানায়, ভবদহ এলাকায় যাতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয় সেজন্য গত বছর দুই কোটি ৫৫ লাখ ১২ হাজার ৭২৭ টাকা ৩৩ পয়সা ব্যয়ে টেকা, শ্রী ও হরি নদীতে ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘে পালইট চ্যানেল খনন করা হয়েছিল। কিন্তু নদীর খনন করা অংশ পলিতে পুনরায় ভরাট হয়ে যায়। এ বছর ২৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা ব্যয়ে দুটি প্যাকেজে শ্রী নদীর এক হাজার ৩০০ মিটার খনন করা হচ্ছে।
গত শনিবার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী শুকিয়ে সরু খালের মতো হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় বৃষ্টির পানি জমে আছে। নদীতে জোয়ার আসছে না। ভবদহ ২১ ভেন্ট জলকপাটের(স্লুইসগেট) সামনে শ্রী নদীতে পলি জমে উঁচু হয়ে গেছে। ৯ ভেন্ট জলকপাটের উজান ও ভাটিতে এবং ২১ ভেন্ট জলকপাটের কিছুটা উজান থেকে ৬ ভেন্ট জলকপাট পর্যন্ত শ্রী নদীতে পাইলট চ্যানেল কাটা হচ্ছে। দুটি এক্সাভেটর দিয়ে নদী খনন করা হচ্ছে। নদীর মাটি কেটে পাড়ে স্তুপ করে রাখা হচ্ছে। পাড়ের মাটি অনেকটা অংশ ভেঙ্গে নদীর মধ্যে পড়ছে। পাশের বিল কপালিয়া, বিল পায়রা এবং দামুখালীর বিল পানিতে ভরে আছে।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাটেঙ্গা গ্রামের কৃষক ইমদাদুল মোল্যা বলেন,‘নদী কেটে খাল বানানো হচ্ছে। নদী কেটে মাটি পাড়েই ফেলা হচ্ছে। ওই মাটি নদীতে পড়ছে। নদীতে জোয়ারও আসছে না। টিআরএম ছাড়া নদী বাঁচানো যাবে না।’
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতারা জানান, ভবদহ অঞ্চলে জোয়ারাধার বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ যশোরে অনুষ্ঠিত এক জাতীয় কর্মশালায়। এজন্য ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ৪৪৮ কোটি ৭১ লাখ ২৩ হাজার টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা(ডিপিপি) তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের যাচাই কমিটির বৈঠকে জোয়ারাধার প্রকল্পটি বাতিল করা হয়।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন,‘ভবদহের বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। চলতি বর্ষায় গোটা ভববদহ অঞ্চল ডুবে যাবে। নদী খননের নামে পাইলট চ্যানেলের কাজ করা হচ্ছে যা কোন স্থায়ী বা টেকসই সমাধান নয়। এতে রাস্ট্রের কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে। মহলবিশেষ এই টাকা লোপাট করছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রস্তাবিত প্রকল্প এই জনপদের জলকল্যাণ বয়ে আনবে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পানিসম্পদ মন্ত্রণায়ের কর্মকর্তারা তিনটি উপজেলাকে জলাবদ্ধতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। এতে জনভোগান্তি বাড়ছে। সমস্যা সমাধানে টিআরএমের কোনোই বিকল্প নেই। বারবার টিআরএম বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। আমরা এই সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন চাই।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড, যশোরের কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম বলেন,‘গত বছর দশ কিলোমিটার নদীর পাইলট চ্যানেল খনন করা হয়েছিল। খননের পর পলিতে নদী সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। প্রায় ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে এরমধ্যে ১ হাজার ৩০০ মিটার খনন করা হচ্ছে। এটা একটা আপদকালিন ব্যবস্থা। ভবদহ অঞ্চলের অবস্থা ভালো না। রাস্তাঘাট ও মানুষের বাড়িতে যাতে পানি না ওঠে সেজন্য নদীতে পাইলট চ্যানেল কাটা হচ্ছে।

Warning: A non-numeric value encountered in /home/njybpvbk/public_html/wp-content/themes/Newspaper/includes/wp_booster/td_block.php on line 1009

Warning: Use of undefined constant TDC_PATH_LEGACY - assumed 'TDC_PATH_LEGACY' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/njybpvbk/public_html/wp-content/plugins/td-composer/td-composer.php on line 109

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here