আম্পানের পরের দিনগুলো কিভাবে চলছে প্রতাপনগর ও শ্রীউলাবাসীর?

0
70

এম এম নুর আলম, আশাশুনি থেকে : মহা প্রলয়ঙ্কারী ঘুর্নিঝড় আম্পানের আগ্রাসনে কপোতাক্ষ-খোলপেটুয়ার জোয়ার ভাটার প্রবল স্রোত ধারায় আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ও শ্রীউলা ইউনিয়নের সবই যেন নিঃস্ব করে দিয়েছে। দক্ষিণ বঙ্গের উপকুলীয় অঞ্চল আশাশুনি উপজেলার এ দুটি ইউনিয়নে প্লাবিত হয়েছে জনপদ। সেই থেকে হাজার হাজার এলাকাবাসীর স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণে রিং বাঁধের মাধ্যমে এলাকা বাঁচানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয় বানভাসী মানুষ।
রিং বাঁধ দিতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে স্থানীয়দের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, রিং বাঁধ দেওয়ার পর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় শ্রমিক দিয়ে রিং বাঁধের উপরে মাটি দিলে হয়তো রিং বাঁধ টিকে যেতো। আরও বলেন, বিগত বহু বছর পূর্বে থেকে প্রায় প্রতি বছরই এসব এলাকার কোন না কোন স্থান থেকে পাউবোর বেড়ীবাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হয় এই অঞ্চলের জনপদ। সার্বিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় এসব অঞ্চলের মানুষেরা। বাস্তব অবস্থা চিত্রে দেখা যায়, কপোতাক্ষ-খোলপেটুয়ার জোয়ার ভাটার প্রবল স্রোত ধারায় একের পর এক নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে মানুষের শেষ আশ্রয় স্থল মাথা গোঁজার ঠাঁই-বাসগৃহ।
ভেঙ্গে পড়েছে অধিকাংশ কাঁচা ঘরবাড়ি। লোকালয়ে জোয়ার ভাটার স্রোত ধারার টানে ভাঙ্গন স্থানে অনেকের ইটের তৈরি আধা পাকা ঘর ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশে নদী গর্ভে যেতে দেখা গেছে। অনেকে জীবন ধারণের জন্য আয়ের শেষ সম্বল মাছ ধরা নৌকায় ভাষমান অবস্থায় পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। কেউবা আবার একটু উঁচু জায়গায় টোং বেঁধে, মাঁচা করে থাকতে দেখা গেছে। কারো বা খাওয়া জুটছে, কেউবা না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। কেউ আছে বিভিন্ন স্কুল, মাদরাসায়, সাইক্লোন শেল্টারে নিরাপদ আশ্রয়ে, কেউবা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে। কেউবা ঘরবাড়ি সব কিছু হারিয়ে অপলোক তাকিয়ে আছে কূলকিনারাহীন দৃশ্যে। এ যেন দেখার কেউ নেই। এর ভিতরে ক্ষতিগ্রস্থ মধ্যবিত্তরা রয়েছে বিপাকে।
বানভাসী মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানা, সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা সংবদ্ধ সংগঠন, বিভিন্ন দলীয় সংগঠন, মাইক্রো ক্রেডিট পরিচালিত সমবায় সমিতিসহ সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা মানুষের ব্যবস্থাপনায় ক্ষতিগ্রস্থ প্লাবিত বানভাসী মানুষের ত্রাণ সহায়তা করে যাচ্ছে। যারা ত্রাণ পাচ্ছে, হাজারো দুঃখ বেদনার কথা ভুলে খুশিতে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ত্রাণ কার্যক্রম অনুসন্ধানে জানা গেছে, ত্রাণ বিতরণকারী প্লাবিত এলাকায় ত্রাণ এনে অল্প সময়ের ব্যবধানে তালিকা প্রস্তুত করতঃ এবং তাদের সামনে আগত স্থানীয়রা বেশি প্রাধান্যই পাচ্ছে। এদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন তাদের দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে তালিকা ও বিতরণ কার্য করায় দলীয় ব্যক্তিগনই প্রধান্যই পাচ্ছে বেশি। এছাড়া মাইক্রোকেডিট সমবায় সমিতির ত্রাণ বিতরণে তাদের সকল সদস্যকে এ ত্রাণ সহায়তা দিতে না পারায় সদস্যদের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে অসহায়দের প্রধান্যই পাচ্ছে বেশি। যার প্রেক্ষিতে প্লাবিত ক্ষতিগ্রস্থ অসহায় সাধারণ শ্রেণী পেশার মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বঞ্চিত হচ্ছে ত্রাণ সহায়তা থেকে। না পারছে কারো দুয়ারে যেতে, না পারছে কাউকে মুখফুটে বলতে। নিরবেই অসহায় যন্ত্রণায় ভুগছেন অনেকেই।
প্লাবিত এলাকার মূল গ্রামের ভিতরে যাতায়াতের উপায় না থাকায় ক্ষতিগ্রস্থ অনেকেই অধিকার বঞ্চিত রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবন জীবিকা ও আবাসনে। যারা চিংড়ির ঘের করে জীবিকা নির্বাহ করছে, তাদের অবস্থা শোচনীয়। বার বার পানি প্রবেশ করে লাখ লাখ টাকা লোকসান দিচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে বহু মানুষের আবাসন তছতছ হয়ে যাচ্ছে। ফলে তারা অন্যত্র যেতে বাধ্য হচ্ছে। স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। বেড়ে চলেছে সুপেয় পানির সংকট। অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে এলাকার চলাচল বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। তারা আরও বলেন, ষাটের দশকে এই এলাকায় বাঁধ নির্মাণের পর আমরা বেশ ভালোই ছিলাম। কিন্তু যুগের পর যুগ এই বাঁধে কোন মাটি পড়েনি। টিকবে কীভাবে? এলাকার মানুষের দাবি একটা শক্ত টেকসই বেড়িবাঁধ। প্রতাপনগরের যেদিকে তাকাই শুধু পানি আর পানি। ডুবে আছে বহু বাড়িঘর। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যেতে হয় নৌকায়, না হয় সাঁতরে। আম্পানের পরের দিনগুলো চলছে এভাবেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here