করোনা: শত্রুর সাথে বসবাসের তিন মাস…

0
97
আবু নাসের অনীক: বাংলাদেশের করোনার সাথে বসবাসের আজ তিন মাস পূর্ণ হচ্ছে। এই তিন মাসে সরকার যে সমস্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে করোনার বর্তমান যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেটা অনায়াসে মোকাবেলা করা সম্ভব ছিলো, যদি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেত।
দেশে করোনা রোগী ৮ মার্চে ছিলো ৩ জন , ৮ এপ্রিল ২১৮ জন, ৮ মে ১৩ হাজার ১৩৪ জন (ইতিমধ্যে গার্মেন্ট শ্রমিকদের গ্রামে পাঠানো ও ডেকে আনা হয়েছে আবার ফেরত পাঠানো হয়েছে) ৮ জুন ৬৮ হাজার ৫০৮ জন (ইতিমধ্যে কলকারখানা-দোকানপাট সব কিছু খুলে দেওয়া হয়েছে)। সনাক্তের ৮০ শতাংশ এবং মৃত্যুর ৭৭ শতাংশ হয়েছে তৃতীয় মাসে। ক্রমবর্ধমান সংখ্যা বলে দেয় সরকার যদি এই সময় যে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সেগুলি না করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সংখ্যা ৬৮ হাজারে পৌছানোর কোন সুযোগ ছিলো না।
৬ জুন ‘বিয়ন্ড দ্য প্যানডেমিক’ এর পঞ্চম পর্ব ‘করোনা সংকটকালে স্বাস্থ্য সেবা’ শিরোনামে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জুম কনফারেন্সে যোগ দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন,‘গার্মেন্ট আসল, ঈদ আসল…বাজার করলো। একলাফে ৫০ হাজার হয়ে গেল। সব সময় বলছি, সংক্রমণের চেইনটা যদি কাট করতে না পারি তাহলে সেটা কিন্তু বন্ধ হবেনা। এভাবে চলতে থাকলে আরও ৬০,৭০ হাজার নতুন অ্যাড হয়ে যাবে। তখন কোন হাসপাতালে আমরা জায়গা দিতে পারেবোনা’।
মাননীয়, আপনার বক্তব্যের সারাংশ করলে এটাই বোঝায় যে, আপনারা জেনেশুনে, বুঝে মানুষকে সংক্রমণের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। আপনারা বুঝতেছেন মুভমেন্ট হলে সংক্রমণ বাড়ছে ঠিক সেই মুহুর্তেই ছুটি প্রত্যাহার করে সবকিছু খুলে দিলেন। অর্থাৎ মানুষকে মুভমেন্ট করার জন্য এনকারেজ করলেন অর্থনীতি সচল করার নামে। তাহলে যে সংক্রমণ হচ্ছে এর দায় সরকারের এড়িয়ে যাবার কোন সুযোগ নেই। যখন কেন্দ্রীয় ভাবে কঠোর লকডাউনে যাওয়া প্রয়োজন তখন আবার জোনিং নিয়ে পরিকল্পনা করছেন। এবং এটা আপনারাও জানেন এই জোনিং বর্তমান বাস্তবতায় কোন কাজে আসবেনা। আগেও যেমন সবকিছু জেনেবুঝে করেছেন, এখনও তারই পুনরাবৃতি করছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে জোনিং করার কিছু পূর্ব শর্ত আছে সেটা প্রতিপালন না করেই জোনিং এর মধ্যে ঢুকছেন।
কোন এলাকা রেড, কোনটা ইয়েলো এবং গ্রীন হবে তার জন্য একটা মানদন্ড নির্ধারণ করা হচ্ছে। সেই মানদন্ড অনুসারে প্রতি ১ লাখে যদি ৩০ জন মানুষ আক্রান্ত থাকে তবে সেখানে রেড জোন বলা হবে। ৩ জনের বেশি কিন্তু ৩০ জনের কম থাকলে তবে সেই এলাকা কে ইয়োলো জোন বলা হবে। আর তার নিচের সংখ্যার এলাকাকে গ্রীন বলা হবে। বাংলাদেশে গত ৫ জুন সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখে ২ হাজার ২৬৩ জনের নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। পরীক্ষার এই নিম্ন হারকে ভিত্তি করে যদি এখন জোনিং এড্রেস করা হয় তবে আবারো একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে সেটি।
ঢাকা শহরে বর্তমানে জনসংখ্যার পরিমান ২ কোটি ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫২ জন। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বাস করে ২৩০০০ মানুষ (ওর্য়াল্ডোমিটার)। এরকম ঘনবসতিপূর্ণ একটি শহরে বর্তমান পরীক্ষার হার খুবই নগন্য। পরীক্ষার হার না বাড়িয়ে ঢাকা শহরে জোনিং করলে আবারো একটি ভুল সিদ্ধান্ত হবে। যে এলাকায় লকডাউন হবে সে এলাকায় যে সমস্ত অফিস থাকবে সে সমস্ত অফিস বন্ধ থাকবে না চালু থাকবে, যদি চালু থাকে তবে চাকরিজীবীরা কিভাবে অফিসে আসবে এগুলো নিয়ে গাইডলাইনে সুস্পষ্ট কোন নির্দেশনা উল্লেখ নেই। অন্যদিকে বর্তমানে যে ৫২ টি পরীক্ষা কেন্দ্র আছে তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি ঢাকা শহরে। অর্থাৎ এই স্বল্প সংখ্যক ল্যাব দিয়ে না ঢাকা না অন্য সকল জেলা কোনটিই যথাযথ মাত্রায় টেস্ট হওয়া সম্ভব নয়।
বলা হচ্ছে, বড় এলাকা না ধরে ছোট এলাকা লকডাউন করা হবে। এই পদ্ধতিতে প্রকৃতপক্ষে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। কারণ সংক্রমণ পরিমাপের যে হারের কথা বলা হচ্ছে তাতে সেই হারে অনেক এলাকায় বাদ যাবে টেস্টের অপ্রতুলতার জন্য। অথচ নতুন করে সংক্রমণের হারের দিক দিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা নবম (নিউইয়র্ক টাইমস)। কিন্তু দৃশ্যত সংখ্যা যা হওয়ার কথা সরকারীভাবে ঘোষণা হচ্ছে অনেক কম। ইতিমধ্যে সংক্রমণের সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আরো এক ধাপ এগিয়ে বিশ নাম্বারে এসেছে(ওয়ার্ল্ডোমিটার)।
সরকার আবারো একটা ধুম্রজাল পদ্ধতিতে তার কর্মপন্থা ঠিক করছে। আমাদেরকে বাস্তবতা বুঝতে হবে। আপনাদের টেস্টের পরিমান কম, এটাকে বেস করে যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তবে এটা হবে আর একটা শুভঙ্করের ফাঁকি! মাননীয় গণের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, কে কাকে এই ফাঁকি দেওয়ার খেলায় জিততে চাইছেন!! ধরে নিই, ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় টেস্ট হয়েছে ১ হাজার মানুষের এবং এর মধ্যে সংক্রমণ চিহ্নিত হয়েছে যে সংখ্যক মানুষ তাতে এই এলাকা লকডাউনের প্রয়োজন নেই। সেটা কি আসলে বাস্তব চিত্র! যদি টেষ্ট এর পরিমান কমিউনিটি লেভেলে না বাড়ানো যায় তবে আমরা কিসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব?
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ এর উপদেষ্টা অধ্যাপক মোশতাক চৌধূরী বলেন,‘জনস্বাস্থ্য বিশারদদের মতে, এটা একটা আসল সংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র,‘টিপ অব দি আইসবার্গ’। অন্তত দুটি কারণে আমরা আক্রান্তের সঠিক তথ্য আমরা পাচ্ছি না। এক, পরীক্ষাগারের স্বল্পতা। দুই, যারা পরীক্ষা করতে আসছেন তাদের বিভিন্ন উপসর্গ উপস্থিত। উপসর্গহীন সম্ভাব্য রোগী বা এসিম্পটোমেটিক কেস পরীক্ষা করাতে আসছেনা। করোনার প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে তাই আমাদের জনসংখ্যাভিত্তিক নিবিড় জরিপ চালাতে হবে’। অর্থাৎ আমাদের সংক্রমণ চিহ্নিতের যে সংখ্যা সেটা জোনিং লকডাউনের জন্য ইতিবাচক নয়।
বর্তমান অবস্থা যদি বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষন করা হয়, তবে এই মুহুর্তে যেটা প্রয়োজন সারা দেশে ১৫ দিন টানা কঠোর লকডাউনে রাখা। অন্তবর্তীকালীন এই সময়ে পরীক্ষাকেন্দ্র সারা দেশ ব্যাপী বাড়িয়ে টেস্টের পরিমান (দৈনিক ৩০ হাজার) সবোর্চ্চ করা। এবং তার ভিত্তিতে এলাকা জোনিং করা। টানা লকডাউন শেষ হলে যে সমস্ত এলাকা রেড জোনের আওতায় আসবে, সেটি বাদ রেখে ধীরে ধীরে অন্য এলাকায় লকডাউন শিথিল করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনে এভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
আগামী ১০ তারিখে বসছে বাজেট অধিবেশন। নতুন যে বাজেট ঘোষণা হতে যাচ্ছে সেখানে বর্তমান পরিস্থিতিতেও স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ কোন নির্দেশনা বা বরাদ্দ কোন কিছুই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। অথচ বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় এই খাতকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেবার প্রয়োজনীয়তার দাবি রাখে। স্বাস্থ্য খাতের যে বরাদ্দের কথা বলা হচ্ছে সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ প্রধান গুরুত্বের জায়গা দখল করে আছে। এখনও পর্যন্ত কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছেনা। আইসিসিইউ কিভাবে বাড়াতে হবে তার কোন দিকনির্দেশনা নেই। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের ঘাটতি।
সানেম এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলছেন,‘বাংলাদেশের ১ হাজার জনের মাথাপিছু হাসপাতালের শয্যা ০.৮ শতাংশ। এটা একটা ভয়াবহ অবস্থা। তাহলে কোভিড রোগীদের অবস্থা কতোটা অবর্ণনীয় সেটা আমরা সহজেই আঁচ করেতে পারি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ি, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির মাত্র ০.৪ শতাংশ ব্যয় করে। তারপরেও চলতি বাজেটে তার কোন প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না’।
করোনার সাথে ৩ মাস বসবাসের অর্জন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঘোষনা অনুযায়ী হাসপাতালের শয্যা ও আইসিসিইউ সংখ্যার গরমিল। গত ৬ জুন নিয়মিত সংবাদ বুলেটিনে অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা বলেন, সারাদেশে করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা রয়েছে ১৩ হাজার ৯৮৪ টি। এর মধ্যে ঢাকায় ৭ হাজার ২৫০ টি। বস্তুত এখনো প্রস্তুত না হওয়া হাসপাতালের নাম ও শয্যা, আইসিসিইউ বেড এর সংখ্যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বুলেটিনে যোগ করা হয়েছে। বাস্তবে শয্যা আছে ৫ হাজারের চেয়েও কম। এবং আইসিসিইউ আছে ১৪০ টিরও কম (প্রথম আলো)।
মাননীয়গণ, এই পরিস্থিতি কে সামনে রেখে জোনিং লকডাউন কার্যকরের মধ্যে দিয়ে কি অর্জন আমরা করতে পারবো সেটা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। কেন্দ্রীয়ভাবে লকডাউন করুন এবং অন্তবর্তীকালিন এই সময়ে যে ঘাটতি গুলো রয়েছে সেগুলো কাটিয়ে উঠুন। জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রেখে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড যে ফলপ্রসূ হতে পারে না সেটাও ইতিমধ্যে প্রমানিত হয়েছে।

Warning: A non-numeric value encountered in /home/njybpvbk/public_html/wp-content/themes/Newspaper/includes/wp_booster/td_block.php on line 1009

Warning: Use of undefined constant TDC_PATH_LEGACY - assumed 'TDC_PATH_LEGACY' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/njybpvbk/public_html/wp-content/plugins/td-composer/td-composer.php on line 109

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here