যুক্তি তক্কো : বিকল্প বাজেট ভাবনা

0
60

আবদুস সাত্তার
বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশে ৮ মার্চ থেকে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েই চলেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের ক্ষমতাসীন সরকারের অর্থমন্ত্রী আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন। অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে তা কাটিয়ে তোলার জন্য ৫ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি টাকার বাজেট হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। চলতি বাজেটের আকার ছিল ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২ লাক্ষ ১ হাজার কোটি টাকা এবং অনুন্নয়নশীল খাতে বাকি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আয়ের উৎসের মধ্যে রাজস্ব আদায় হবে ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে ৭০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা ও অভ্যন্তরীণ ঋণ বাবদ বাকি টাকা সংগ্রহ করা হবে। ৫% ঘাটতি রাখা হয়েছে। জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৫.৫%। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুসারে প্রস্তাবিত বাজেট হবে মানুষ বাঁচানোর বাজেট। করোনার কারণে স্বাস্থ্যখাতের যে ভঙ্গুর চেহারা প্রকাশিত হয়েছে এবং কৃষিখাতের গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রস্তাবিত বাজেটে এই দু’টি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া হবে। মেঘা প্রজেক্টকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এ খাতের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট ১৬৭৭টি প্রকল্প থাকবে। খাত ভিত্তিক বরাদ্দকৃত টাকার পরিমাণ হচ্ছে- স্থানীয় সরকার বিভাগ ৩৩ হাজার ১৩১ কোটি, সড়ক বিভাগ ২৫ হাজার ৮০৩ কোটি, বিদ্যুৎ বিভাগ ২৪ হাজার ৮০৩ কোটি, প্রাথমিক, কারিগরি মিলিয়ে শিক্ষায় ২১ হাজার ২৪২ কোটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ ১৭ হাজার ৩৮২ কোটি, স্বাস্থ্য খাত ১ হাজার ৩৩৩ কোটি, কৃষি ৮ হাজার ৪২৪ কোটি, স্বাস্থ্য সেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ ১২ হাজার ৪১৬ কোটি, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ৬ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। অনুৎপাদনশীল বা অনুন্নোয়ন খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মোট ৩ লক্ষ ৫৪ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। অনুন্নয়ন খাতের মধ্যে জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ, সুদ বা পরিশোধসহ আর কয়েকটি খাত রয়েছে।
রাষ্ট্রের প্রশাসন ও অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য নতুন অর্থবছর শুরুর আগেই বাজেট প্রণয়ন সরকারের একটি রুটিন কাজ। সাধারণত প্রতিবছরের বাজেটের তুলনায় ২০% পর্যন্ত বরাদ্দ বৃদ্ধি করে। ২০১৯ সাল থেকে এপর্যন্ত আওয়ামী লীগ প্রতিবছরই বাজেট প্রণয়ন করেছে এবং প্রত্যেকটি বাজেটকে সময়োচিত, বাস্তবভিত্তিক ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার উপযুক্ত বাজেট বলে গণ্য করেছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।
আমরা জানি, সরকারের বাজেট প্রণয়নসহ প্রতিটি পদক্ষপ একটি নির্দিষ্ট দর্শন ও রাজনীতির দ্বারা পরিচালিত হয়। আওয়ামী লীগ শ্রেণী চরিত্রের দিক থেকে একটি লুটেরা বুর্জোয়া শ্রেণীর রাজনৈতিক দল। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদসহ অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশ ও পার্শ্ববর্তী বৃহৎ পুঁজির রাষ্ট্র ভারতের সেবাদাস ও দেশীয় লুটেরা পুঁজিপতি শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী উচ্ছিষ্টভোগী হিসেবে রাজনীতি চর্চা করছে। শুধু আওয়ামী লীগ নয় ক্ষমতার বাইরে শাসকগোষ্ঠীর অপরাপর রাজনৈতিক দলসমূহ একই ধারা অনুসরণ করে। তাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দিক থেকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক, কৃষক, খেতমজুর ও নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পক্ষে তথা একটি আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার বাজেট আশা করা বৃথা।
বাজেটে আয়ের ৬৫% ভাগ আদায় করা হয় শ্রমিক, কৃষক, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের নিকট থেকে ট্যাক্স, খাজনা, শুল্ক ও ভ্যাটের মাধ্যমে আর ৩৫% আসে ধনীদের উপর আয়করের মাধ্যমে। কিন্তু বাজেটে উৎপাদনশীলখাত তথা শ্রমিক, কৃষকের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট খাতে বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টিই সবচেয়ে বেশী অবহেলিত। অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ বিশ্বজিৎ বলেছেন, একটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হচ্ছে শ্রমিক ও কৃষক। তাদেরকে সুগভীর বিবেচনায় নিয়ে আর্থনীতিকে পরিচালিত করতে হবে।
করোনাভাইরাসকে উপলক্ষ করে পুঁজিপতিরা সীমাহীন মুনাফা ও অর্থ অত্মসাতের চেষ্টা করছে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ নোয়াম চমস্কি ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করেছেন এই বলে যে, মানুষের মৃত্যুর চেয়ে মুনাফাই তার কাছে বেশী গুরুত্ব পাচ্ছে।
করোনার আক্রমণে স্থবির অর্থনীতিকে সচল করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হল। গার্মেন্ট সহ রপ্তানীমুখী শিল্পের শ্রমিকদের বেতন, ভাতা পরিশোধের জন্য মাত্র দুই শতাংশ সুদে ৫,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলো। এ যেন ‘মাছের তেল দিয়ে মাছ ভাজা’। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। গার্মেন্টস মালিকরা ইতোমধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপী হয়েছে। তাদের কাছ থেকে সেই অর্থ আদায়ে নেয়া হয়নি কোন কঠোর কার্যকর ব্যবস্থা। কৃষকদের জন্য ৪ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। সেই টাকা গরীব, ভূমিহীন ও বর্গাচাষীদের পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। যেহেতু তাদের কোন ভূমি নেই। অথচ বোরো আবাদের ৮০% উৎপাদন তারাই করেছে। কৃষকদের জন্য দেয়া টাকা প্রধানত জমির মালিক যারা মূলত কৃষির সাথে যুক্ত নন, তারাই নিয়ে যাবে। কৃষি ঋণ প্রদানের জন্য আইনসহ অন্যান্য নিয়মকানুন পরিবর্তন একান্ত প্রয়োজন। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে দেশে দরিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী ৩ কোটি ৫০ লাখ মানুষের সাথে দিন আনে দিন খাওয়া মানুষসহ অপ্রতিষ্ঠানিক খাতের আরও ৫ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ যুক্ত হয়েছে। এদের জন্য অন্তত ৬ মাসের খাবার ও নগদ অর্থ প্রদান একান্ত জরুরী। সরকার সব মিলিয়ে এক কোটি মানুষকে কার্ডের আওতায় এনে মাসে ৩০ কেজি চাল দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে, এর সাথে আরও একটি অংশকে ২৫০০ টাকা মাসিক ভাতা প্রদান করার কথা বলা হয়েছে। রেশন কার্ড ও টাকা প্রদানে ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার ও আমলাদের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির খবর ইতিমধ্যেই ব্যাপকভাবে ছাড়িয়ে পড়েছে। না খাওয়া মানুষের অাহাজারি শোনা যাচ্ছে। বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগসহ অন্যান্য কমিউনিস্ট, বাম ও প্রগতিশীল পার্টিগুলো দীর্ঘদিন ধরে আর্মি রেটে ৮টি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস রেশন কার্ডের মাধ্যমে গরীব, ভূমিহীন, বর্গা কৃষক, গার্মেন্টস শ্রমিকসহ সকল শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিক, স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য স্থায়ী রেশনিং ব্যবস্থা চালুর জন্য দাবি জানিয়ে আসছে।
কৃষিখাত হচ্ছে অর্থনীতির প্রাণ। দেশের ৫০% মানুষ কৃষিসহ গ্রামীণ অর্থনীতির সাথে যুক্ত। এখাত থেকে জিডিপিতে ৫০% আয় আসে। মুক্ত বাণিজ্য ও নয়া উদারীকরণের ধারায় এখাতটি আজ বহুজাতিক কর্পোরেশন ও কর্পোরেট পুঁজির দখলে চলে যেতে বসেছে। এখাত থেকে সরকার ভর্তুকি ক্রমশ তুলে নেয়ার কৃষকের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। এছাড়া উৎপাদনের প্রধান শর্ত ভূমি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ৫০ বছরেও শাসকদল শ্রেণী স্বার্থের কারণে মেনে নেয়নি। ফলে উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক চলে যায় জমির মালিকসহ মধ্যসত্ত্বভোগীদের ঘরে। যার পরিণতিতে বর্তমান দেশে ৭০% মানুষ ভূমিহীনে পরিণত হয়েছে। বিষয়টিকে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের সরকার গত ৫০ বছর ধরে সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছে। এছাড়া বহুজাতিক সংস্থার বীজ, সার, কীট নাশক ব্যবহারে জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে ও পরিবেশের উপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ভারতে কৃষিতে এর প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবছর রেকর্ডসংখ্যক কৃষক অাত্মহত্যা, বাড়ীঘর ছেড়ে নিরুদ্দেশ হওয়ার তথ্য রেব হয়ে আসছে। অথচ করোনাসহ মহাদুর্যোগে দেশের মানুষদের খাওয়া পড়ার দায়িত্ব কৃষি খাতকে নিতে হচ্ছে। গত বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৫.৪%। যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে নগন্য। এখন প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী কৃষিতে যে বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছেন তা গত বাজেটের চেয়ে সামান্য বেশী।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশের বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে বরাদ্দে ক্রমান্বয়ে হ্রাস করা ও সীমাহীন দুর্নীতিকে দায়ি করেছেন। গত শতাব্দি থেকেই স্বাস্থ্যখাত মুখ থুবড়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য সেবা প্রত্যেক নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার। এ খাত ব্যবসায়ীদের মুনাফার খাত হতে পারে না। চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে জিডিপি’র ১% এর কম। অথচ সরকার বর্তমানে দেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে অাখ্যায়িত করেছে। অথচ করোনা রোগীসহ ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগ আক্রান্ত মানুষরা বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যখাতকে সময়োপযোগী করতে হলে বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে জিডিপি’র ৪% বরাদ্দের দাবি উঠেছে। পুরো স্বাস্থ্যখাতকে ব্যবসায়ীদের মুনাফামুখী অবস্থা থেকে মুক্ত করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ইউনিয়ন পর্যন্ত একই ধারায় গড়ে তুলতে হবে। ছোট দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা যেভাবে দেশের সকল নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছে আমাদের দেশেও ঐ ধরণের ব্যবস্থ্য গড়ে তুলতে হবে। চিকিৎসার মান, শিক্ষার মান ও গবেষণার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্নীতিতে যুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাণিজ্যিকীকরণের ফলে শিক্ষাখাত ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। শিক্ষার মানের দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে সব থেকে নিচের সারিতে অবস্থান নিয়েছে। বিগত দশ বছর আগেও অন্যান্য দেশে থেকে শিক্ষা লাভের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়তে আসতো বহু শিক্ষার্থী। এখন আমাদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে শিক্ষালাভের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে পড়তে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে দেশের সকল বিদ্যাপীঠ। সেখানে ক্ষমতাসীন ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা যা করছে তা অবিশ্বাস্য। মানব সম্পদ তৈরির এখাতে সাম্রাজ্যবাদী ও দেশীয় লুটেরা শ্রেণীর গভীর ষড়যন্ত্রের কারণে ক্রমান্বয়ে বাজেট হ্রাস পাচ্ছে। সরকার ক্যান্টনমেন্ট বাড়াচ্ছে আর শিক্ষাকে ক্রমান্বয়ে বেসরকারি মালিকদের হাতে ছেড়ে দিচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটেও শিক্ষাকে মানসম্মত করা, গবেষণাগারসহ বিজ্ঞান চর্চাকে প্রধান্য দেয়ার কোন প্রস্তাবনা নেই। বরং আগামীতে পশ্চাতপদ মানুষদের ভোটের আশায় অবৈজ্ঞানিক কওমী মাদ্রসাসহ ধর্মীয় শিক্ষায় টাকা বরাদ্দের ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ শিক্ষক, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবী অসাম্প্রদায়িক ও বিজ্ঞানভিত্তিক অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবায়ন করতে হবে। শিক্ষাখাতে বাজেটের ২৫% বরাদ্দ দিয়ে সকলের জন্য অভিন্ন শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। করোনা দুর্যোগের কারণে আগামী ১ বছর ছাত্র বেতন, পরীক্ষার ফি মওকুফ করতে হবে। বেসরকারি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, কর্মচারীদের বেতন সরকারকে দিতে হবে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ দ্রুত বন্ধ করতে হবে। ব্যাঙ এর ছাতার মত গজিয়ে উঠা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়কে মানসম্মত করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দ্রুত নীতিমালা প্রণয়নের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার সাথে সাথে সংস্কৃতি চর্চার প্রতি জোর দিতে হবে।
অভিন্ন নদীগুলোতে ভারত এক তরফাভাবে বাঁধ, ড্যাম তৈরি করে শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে দিয়ে বাংলাদেশকে মরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যান্য দিক থেকে সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে সরকার মেগাপ্রকল্পের বাস্তবায়ন করার কারণে পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আমরা ঝড়-বন্যা-জলোচ্ছ্বাসে প্রতিনিয়ত হাবুডুবু খাচ্ছি। সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে যোগসাজসে শেখ হাসিনার সরকার উপকূলীয় অঞ্চলে অনেকগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। এছাড়া বিশ্বের পরিবেশবাদীদের মতামতকে উপেক্ষা করে ভারতের স্বার্থে বাগেরহাটের রামপালে
সুন্দরবন সহ প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ বিনাশী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। যা কোনভাবেই পরিবেশ বান্ধব নয়। এগুলো বাতিল করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী সুলভ, স্বনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার জন্য সরকারকে বাধ্য করতে হবে। এসকল প্রজেক্টে বরাদ্দ প্রত্যাহার করতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে উপকারভোগীদের সংখ্যা দ্বিগুন করা, এবং তাদের মাসিক ভাতা কমপক্ষে ৫ হাজার করা আজ সময়ের দাবি। করোনার কারণে অসহায় মানুষের সংখ্যা দ্রুত গতিতে বেড়ে যাবে, সেদিক হিসেবে নিতে হবে। উপকারভোগীদের তালিকা নির্ভুলভাবে করা, ভাতা প্রদানে অনিয়ম দুর করার ব্যবস্থা নেয়া জরুরী। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ভয়াবহতা যেভাবে বেড়ে চলছে তা রোধ করতে দেশে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া কোন পথ নেই। স্বাস্থ্য খাত, পরিবহন সহ সকল রাষ্ট্রীয় খাতকে আজ সীমাহীন দুর্নীতি বন্দি করে ফেলেছে। তাই দুর্নীতি রোধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও ঢেলে সাজাতে হবে।কমিশনের অবাধ চলার ক্ষমতা বাড়াতে হবে। তার জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেয়া দরকার।
করোনা মহামরীর ধাক্কায় কমপক্ষে ১০ লাখ প্রবাসী শ্রমিক, কর্মচারি ও চাকুরীজীবী দেশে এসেছেন। তাদের খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসংস্থানের জন্য উল্লেখযোগ্য প্রণোদনা প্যাকেজ ও বাজেটে বরাদ্দ থাকতে হবে।
এসকল প্রকল্পের জন্য মোটা অংকের বাজেট বরাদ্দ হয়েছে যা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তাই আগামী বাজেটে নিম্নোক্ত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা জরুরি:
১। করোনাভাইরাসের মহামারীর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ৮ কোট মানুষকে আগামী এক বছরের খাদ্যসহ মাসিক ১০ হাজার টাকা প্রদানের ব্যবস্থা বাজেটে রাখতে হবে।
২। কৃষিখাতে বরাদ্দ বাজেটের ১২% দিতে হবে।
ক) ভূমি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করে খোদ কৃষকদের হাতে জমি প্রদান, অনুপস্থিত ভূমি মালিকদের জমি বাজেয়াপ্ত করা। বর্গা চাষীদের উচ্ছেদ করে ভূমিহীনদের নিকট খাস, পতিত জমি বণ্টন, ভূমি বন্দোবস্ত আইন পাশ করতে বরাদ্দ রাখতে হবে।
খ) এই বরাদ্দের মধ্যে কৃষকদের বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ বিশেষভাবে সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ যন্ত্র, কৃষি যন্ত্রপাতি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা ও সেচে গভীর নলকূপের ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।
গ) বকেয়া কৃষি ঋণ মওকুফ, সুদমুক্ত কৃষি ঋণ প্রকৃত কৃষকদের বিশেষ করে ভূমিহীন, গরীব ও বর্গাচাষী ও স্বল্প জমির মালিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দিতে হবে।
ঘ) হাট-বাজার থেকে মধ্যসত্ত্বভোগীদের বিতাড়িত করা। কৃষকদের উৎপাদিত ধান, গম, আলু, ভুট্টাসহ সকল সবজি ও ফলমূল সরকারি সংস্থার মাধ্যমে ক্রয় করে বিক্রির ব্যবস্থা করতে হব।
ঙ) কৃষকদের কৃষিবীমা ও শস্যবীমা চালু করে কৃষকদের বাঁচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
চ) হাট-বাজার ও ঘাট থেকে মহাজনী ব্যবস্থা তুলে দিতে হবে।
ছ) রপ্তানী যোগ্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে বিশেষ সহযোগিতা করতে হবে।
জ) ক্ষেতমজুরদের সারাবছরের কাজের নিশ্চয়তা ও বাজারদর অনুসারে ন্যায্য দাম পরিশোধ ও কাজ না থাকলে তাদের বেকার ভাতাসহ রেশনিংয়ের আওতায় আনতে হবে।
ঝ) মহাজনী ঋণ ও এনজিও ঋণের সুদের হার ৫% করতে হবে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মহাজনী ঋণ ও এনজিও ঋণ মওকুফ করতে সরকারকে প্রজ্ঞাপণ জারি করতে হবে।
ঞ) নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক-খেতমজুরসহ অন্যান্য পেশার মানুষদের পুনর্বাসন ও সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। নদী ভাঙ্গন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ট) ভূমি দপ্তরের অভাবনীয় ঘুষ, দুর্নীতি ও হয়রানী বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ সম্পত্তি আইনের জটিলতা দূর করে প্রকৃত মালিকদের জমি হস্তান্তর করতে হবে।
৩। ক) শ্রমিক সহ নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য আর্মিরেটে শিশু খাদ্য সহ পূর্ণ রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
খ) শ্রমজীবী হাসপাতাল নির্মাণ করে সুচিকিৎসা ও বিনামূল্যে ঔষধ সরবরাহ করতে হবে।
গ) শ্রমিক ও শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা চালু করতে হবে।
ঘ) কর্মস্থলে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করতে হবে।
ঙ) করোনার মতো দুর্যোগকালীন সময়ে খাদ্য ও স্বাস্থ্য সেবার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে।
৪) স্বাস্থ্যখাতে প্রস্তাবিত বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। যে টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা চিকিৎসাক, নার্স ও অন্যান্য সেবাকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন প্রদানের পর তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকে না। সময়োপযোগি ও মানসম্মত স্বাস্থ্যখাত ও চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়তে হলে বাজেটে জিডিপির ৫% বরাদ্দ দিতে হবে।
আমলাদের তৈরি বাজেটে অনুন্নয়ন খাতে জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলাসহ অন্যান্য খাতে যে বরাদ্দ তা ৫০% হ্রাস করত হবে। কেননা আমলারা তাদের ভোগ-বিলাস দামী গাড়ী কেনা, সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনা ও বাড়ি ফ্লাট কিনাসহ নানাভাবে সরকারি অর্থের অপচয় করে। জনসমর্থনহীন স্বৈরতান্ত্রিক সরকার তাদের সমর্থনে ক্ষতায় টিকে থাকার জন্য বাজেটের সিংহভাগ অনুন্নয়ন খাতে বরাদ্দ করার ক্ষেত্রে নমনীয় থাকে। ঐ অতিরিক্ত বরাদ্দের টাকা কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও শিল্প খাতে বরাদ্দ করতে হবে।
বিকল্প বাজেট ভাবনা ক্ষমতাসীন সরকার কার্যকর করে না। আম জনতার অর্থাৎ শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বাজেট ভাবনা কার্যকর করতে শাসক গোষ্ঠীর বিপরীতে পাল্টা শক্তি সমাবেশ গড়ে তোলার কাজটি কমিউনিস্ট ও বাম, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিকে করতে হবে। শ্রমিক, কৃষক ও শোষিত মানুষের সাথে আত্মীক সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে অপ্রতিরোধ্য সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবো। কমরেড লেনিনের মূল্যবান নির্দেশনা- প্রতিশ্রুতির উপর নির্ভর করো না। ভরসা কর কেবল নিজ শ্রেণীর ঐক্য ও সচেতনতার শক্তির উপর।
লেখক: সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ।


Warning: A non-numeric value encountered in /home/njybpvbk/public_html/wp-content/themes/Newspaper/includes/wp_booster/td_block.php on line 1009

Warning: Use of undefined constant TDC_PATH_LEGACY - assumed 'TDC_PATH_LEGACY' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/njybpvbk/public_html/wp-content/plugins/td-composer/td-composer.php on line 109

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here