করোনা: শাষক গোষ্ঠীর মানসিক বৈকল্য

0
177
আবু নাসের অনীক: বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ বিস্তার প্রতিরোধের অনেক সম্ভাবনা ছিলো। একের পর এক ভুল কর্মকৌশল নির্ধারণ করে সংক্রমণ প্রক্রিয়াটিকে একটি দীর্ঘ স্থায়ী প্রক্রিয়াতে নিয়ে যাওয়া হলো। মহামারি নিয়ন্ত্রণের কৌশলে যে বিজ্ঞানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবার প্রয়োজনীয়তা ছিলো তাকেই সর্বাধিক গুরুত্বহীন করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে দেশের সমস্ত মানুষকে সংক্রমণ আর মৃত্যুর ঝুঁকিতে ঠেলে দেয়া হলো। সরকার প্রধান এখন ঘোষণা করেছেন, করোনাকে সাথে নিয়ে বসবাস করতে হবে!! যা শাষক গোষ্ঠীর মানসিক বৈকল্যের প্রকাশ ঘটায়।
সারা বিশ্বব্যাপী ধীরে ধীরে লকডাউন শিথিল করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও হয়তো লকডাউন পুরোপুরি তুলে নেয়া হচ্ছে। যারা শিথিল করছে বা তুলে নিচ্ছে সে সমস্ত দেশ ইতিমধ্যে প্রথম পর্যায়ের সংক্রমণের চুড়ান্ত স্তর অতিক্রম করেছে।
বাংলাদেশের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে,মোট নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় এখন আক্রান্তের হার ১৪ শতাংশের বেশি। এই হিসাবে গড়ে ৬ জনে ১ জন কোভিড-১৯ পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে। সর্বশেষ ২৮ মে’র প্রতিবেদন অনুযায়ি পজিটিভ সনাক্তের হার ২১.৭৯ শতাংশ। দেশে করোনা আক্রান্তের শুরু থেকে ১৬ মে ৮০ তম দিন পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষার তুলনায় আক্রান্তের হার ২৪.২২ শতাংশ(ওর্য়াল্ডোমিটার)।
জাতীয় কারিগরী বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রস্তাব প্রতিদিন ২৫-৩০ হাজার টেস্ট। কিন্তু সরকারের টার্গেট ১৫ হাজার। অথচ কমিটি তথ্য দিয়ে বলছে, তারা যে টার্গেট দিয়েছেন সেই টার্গেট পূরণ করা সম্ভব। গত ১৪ মে থেকে ২৮ মে পর্যন্ত এই ১৪ দিনে ১ দিন মাত্র ১০ হাজার টেস্ট করা সম্ভব হয়েছে। সমগ্র জনগোষ্ঠীর তুলনায় টেস্টের শতকরা হার ০.১৬ শতাংশ মাত্র। উল্লেখিত উপাত্ত কি বলে, আমরা কি সবকিছু খুলে দেবার উপযুক্ত সময়ে এসে উপস্থিত হয়েছি? উত্তর এক কথায় ‘না’।
ইতিমধ্যে ৮ জন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্যানেল দেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রজেকশন উপস্থাপন করেন। তাদের প্রজেকশন অনুযায়ি, মে মাসের শেষ সপ্তাহে করোনা পরিস্থিতি পিকে থাকবে এবং জুন মাসের ৩য় সপ্তাহে এসে পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে যাবে। যদি সরকার গৃহীত কোন পদক্ষেপ অবস্থাকে পরিবর্তন না করে।
কিন্তু সরকারের ধারাবাহিকভাবে ভুল সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি তার গতিপথ পরিবর্তন করেছে। বিশেষজ্ঞদের গঠিত প্যানেল মনে করছেন,‘প্রথমতো, যারা ইতালি থেকে ফেরত আসলেন তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা সম্ভব হয়নি। এর মাধ্যমে করোনা সংক্রমিত শুরু হলো। দ্বিতীয়তো, করোনার সামাজিক সংক্রমণ ঘটা জায়গাগুলোকে আমরা বিচ্ছিন্ন করতে পারিনি। ফলে ঐ এলাকার লোকজন বিভিন্ন জায়গায় সামাজিক সংক্রমণ ছড়িয়ে দেয়। তৃতীয়তো, ঢাকায় সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও কঠোর লকডাউন দরকার ছিল যখন, সেই সময়ে আমরা দোকান, হাট-বাজার ও গার্মেন্ট কারখানা খুলে দিয়েছি। ফলে আমাদের পরিস্থিতি নাজুক হয়েছে।’ অর্থাৎ সরকারের বারংবার ভুল সিদ্ধান্তের কারণে করোনা পুন পুন গতিপথ পরিবর্তন করে ক্রমেই তার সর্বগ্রাসি রুপে আবির্ভূত হবার অপেক্ষায়।
সর্বশেষ ঘরমুখো মানুষের ভিড়। লাখ লাখ মানুষ ঈদে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে গেছে। এই মানুষ আবার গ্রাম ছেড়ে ঢাকা আসছে। যারা ঢাকা গেলেন তারা গ্রামের ঐ মানুষদের সংক্রমিত করলেন, আবার গ্রাম-শহরতলীর ঐ মানুষদের দ্বারা সংক্রমিত হয়ে ঢাকা শহরে প্রবেশ করছেন। কি ভয়াবহ পরিস্থিতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে!! ফলশ্রুতিতে পুরো দেশ করোনা হটস্পটে পরিনত হবে।
প্রধানমন্ত্রী করোনার সাথে বসবাসের কথা বলছেন, এটা তার নিজের বক্তব্য নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের বক্তব্য ছিলো এটি। কিন্তু তার বক্তব্যের প্রেক্ষিত আর সরকার প্রধানের প্রেক্ষিত ভিন্ন। মহাপরিচালক ইঙ্গিত করেছিলেন, করোনার এখনও পর্যন্ত প্রতিষেধক আবিস্কৃত হয়নি, কবে হবে সেটাও অনির্দিষ্ট, যেহেতু করোনা সংক্রমণ চলমান সেকারণে এর প্রকোপ কমিয়ে সহনীয় পরিস্থিতি তৈরি করে করোনা কে সাথে নিয়েই টিকে থাকার জন্য অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হবে।
অথচ আমাদের দেশে যখন এই মুহুর্তে সংক্রমনের গতিপথ আটকাতে হবে, নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সেই মুহুর্তে সরকার সব কিছু খুলে দিয়ে করোনার সাথে বসবাসের ঘোষণা বাস্তবায়ন করছে। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এটা শাষকগোষ্ঠীর প্রচলিত ইতিহাস। তবে মাননীয় গণ আপনারা জুয়ায় যে বাজি ধরেছেন তা বড্ড নিষ্ঠুর। এই বাজিতে হারের মাসুল কিন্তু আপনাদেরও দিতে হবে। এবং সরকারের বর্তমান সিদ্ধান্তের কোন পরিবর্তন না ঘটলে জুয়ায় হার নিশ্চিত।
মৃত্যুর সংখ্যাগত হার কম থাকায় সরকার এই প্রকল্পে উৎসাহিত হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত ও যুক্তি বলে, যখনই করোনা রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে, তখন অবসম্ভাবি মৃত্যুর হার বাড়তে বাধ্য। এটিকে এড়িয়ে যাবার কোন সুযোগ নেই। এবং এই সময়টিতে করোনার প্রকৃত ভয়াবহতা ব্যবহারিকভাবে বোঝা যাবে।
৩০ মে’র পর সাধারণ ছুটি আর বাড়ছেনা। যে সময়টিতে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে আগামী ১৪ দিন সারাদেশে কঠোরভাবে লকডাউন কার্যকর করার জন্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করছেন, যাতে ইতিমধ্যে যে ক্ষতিটা হয়েছে সেটার রাশ টেনে ধরা যায়। পূর্বের ন্যায় সরকার একইভাবে অযৌক্তিক পদ্ধতিতে সকল তথ্য-উপাত্তকে অস্বীকার করে, বিশেষজ্ঞদের মতামতকে পাশ কাটিয়ে ৩০ মে’র পর সব কিছু খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সরকার তার নিজের গঠিত ৩ টি টেকনিক্যাল কমিটির (জনস্বাস্থ্য ও অপরাপর বিশেষজ্ঞগণের সমন্বয়ে) প্রতিটা কমিটির মতামতকে ইগনোর করে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে কমিটি গুলোর কোন পরামর্শই সরকার গ্রহণ করে না, সেই কমিটি গুলির সরকারের প্রয়োজনীয়তা কি!!
সরকারী দলের সাঃসম্পাদক বলছেন,‘প্রধানমন্ত্রী বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন’। জানতে মন চায়, সে সমস্ত পরামর্শক কারা যাদের সাথে আলোচনা করে উনি এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন! আপনাদের গঠনকৃত ও নিয়োগকৃত কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটির উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডাঃ এবি এম আব্দুল্লাহ ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাওয়া সম্পর্কে বলেন,‘ঘোষনাটা সম্পূর্ণভাবে সাংঘর্ষিক হয়েছে’, তিনি আরো উল্লেখ করেন,‘সরকারের কথা ও কাজের মধ্যে মিল থাকছেনা’।
মাননীয় সেতুমন্ত্রী আপনি লকডাউন উঠিয়ে নেয়া প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ভারতের উদাহরণ উল্লেখ করে বলেছেন, তারা পারলে আমরা কেনো পারবোনা। যে দেশগুলোর নাম উল্লেখ করেছেন করোনা মোকাবেলায় বিশ্বে সর্বস্বীকৃত সবচেয়ে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য সে দেশের প্রেসিডেন্টের গোয়ার্তুমী আর আত্মঘাতী সিদ্ধান্তকে দায়ি করা হয়, তাকে বিশ্বে একজন ঠান্ডা মাথার খুনী বলা হচ্ছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যেভাবে তার দেশের জনগণকে হত্যা করেছে, আপনার এই উদাহরণ প্রমাণ করে আপনারাও একইভাবে আমাদেরকে হত্যা করতে চান! গত ২৩ মে সানডে টাইমস এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ব্রিটেনে লকডাউন কার্যকর করতে মাত্র ৯ দিন দেরি করায় সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা ২ লাখের পরিবর্তে ১৫ লাখে পৌছেছিলো, মৃত্যুর সংখ্যা ৩৬ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণও সেটাই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক বেনজীর আহমেদ বলছেন,‘মে মাসের পর লকডাউন উঠে গেলে বা সব খুলে গেলে তখন সব একাকার হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে পিক টাইম নির্ভর করবে এ সব ব্যবস্থার ওপর। চুড়াটাই বা কত বড় হবে অর্থাৎ কত মানুষ আক্রান্ত হবে সেটাও একটা বিষয়। তবে সব খুলে দেয়া হলে এবং সব একাকার হয়ে গেলে সংক্রমণের পিক বা চুড়ান্ত আসাটা প্রলম্বিত হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদী চক্র তৈরি হবে যাতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে গরীব মানুষেরা’। দিন শেষে এরাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
গত ১৬ এপ্রিল সরকার সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন-২০১৮ এর ১১(১) ধারা (সংক্রমিত এলাকা ঘোষণা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, ইত্যাদি) ক্ষমতাবলে সমগ্র বাংলাদেশকে সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসাবে ঘোষণা করে। সরকার অদ্যবধি এই ঘোষণা প্রত্যাহার করে নাই। আগামী ৩১ এপ্রিল থেকে সব কিছু খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এই ঘোষণার সাথে সাংঘর্ষিক।
শুধু তাই নয় (১১)(১) ধারা কার্যকরের লক্ষে উক্ত আইনের (অধিদপ্তরের দায়িত্ব ও কার্যাবলি) ৫(১)(ঘ) অনুসারে,‘সংক্রমিত এলাকা সংক্রমণমুক্ত এলাকা হইতে পৃথককরণ, সংক্রমণ মুক্ত এলাকায় উক্ত রোগের পার্দুভাব প্রতিরোধ এবং আক্রান্ত এলাকায় পুন:আর্বিভাব প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান’।
৫(১)(ণ) অনুসারে ‘সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে কোন বাজার, গণজমায়েত, ষ্টেশন, বিমান বন্দর , নৌ ও স্থলবন্দর গুলি সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করেতে পারবে’।
৫(১)(ত) অনুসারে ‘সংক্রমণ রোগের বিস্তার রোধে উড়োজাহাজ, জাহাজ, জলযান, বাস, ট্রেন ও অন্যান্য যানবাহন দেশে আগমন, নির্গমণ বা দেশের অভ্যন্তরে এক স্থান হইতে অন্য স্থানে চলাচল নিষিদ্ধকরণ’।
সরকার এতোদিন পর্যন্ত সাংবিধানিক ভাবে এই আইনগুলোর আওতায় তার অফিসিয়াল বিভিন্ন ঘোষণা জারি করেছে। বস্তুত ৩১ এপ্রিল থেকে সবকিছু খুলে দেওয়া অর্থ এই আইনগুলো আর প্রয়োগযোগ্য থাকেনা। এখনও পর্যন্ত সারা দেশ সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ন হিসাবে আইনগতভাবে ঘোষণা দেওয়া আছে, আর সেই আইনের বিভিন্ন ধারা কে অকার্যকর করে বিপরিতমুখি ঘোষণা উপস্থাপন করছে। তার চাইতে পূর্বের ঘোষণা প্রত্যাহার করলেই তো হয়! তাহলে আমরা সবাই বুঝতে পারি দেশে সংক্রমণের আর কোন ঝুঁকি নেই!! প্রতিদিন সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পাওয়া, ২০ জনের অধিক মানুষের মৃত্যু এ সবকিছুই সাধারণ নিত্যদিনের ঘটনা!
জানি, আমি বা আমার মতো আরো যারা অনেকেই লিখছেন, মহামান্য গণের তাতে কিছু যায়-আসেনা! কিন্তু তারপরেও লিখছি। এই লেখার মধ্যে দিয়ে আমি আমার নিজের সন্তানসহ আগামী দিনের আরো অনেক সন্তানের কাছে উন্মোচিত করে যেতে চাই আমাদের শাষক গোষ্ঠীর নির্মমতা, অমানবিকতার নিষ্ঠুর রূপ! উল্লেখ করে যেতে চাই ‘জীবন’ যেখানে তাদের কাছে শুধুই সংখ্যা। আমি দৃড়ভাবে বিশ্বাস করি করোনাকাল পরবর্তী পৃথিবীতে আমাদের আগামী প্রজন্ম নিশ্চয়ই এর জবাব দিবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here