সাহায্যের পাশাপাশি বিপ্লবের জন্য জনগণকে সংগঠিত করতে হবে, বলছে মার্কিন কমিউনিস্টরা

0
161
সত্যপাঠ ডেস্ক: [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘রেভলিউশনারি ইউনাইটেড ফ্রন্ট’ একটি কমিউনিস্ট বিপ্লবী গণ সংগঠন। করোনা-পরিস্থিতিতে তারা একটি বিবৃতি দিয়েছে সে দেশের জনগণের জন্য। বিবৃতির মূল কথাগুলি দুনিয়ার যে কোনো দেশের জন্যই প্রযোজ্য। তাই এটি অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো]
২৭ মার্চ, ২০২০
কোভিড১৯ অতিমারি দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় বহু মানুষ, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা ও সামাজিক পরিষেবার বাইরে জনগণকে সাহায্য করার উদ্যোগ নিচ্ছেন। নয়া উদারনৈতিক ব্যয়সংকোচন কর্মসূচি রূপায়িত হওয়ার পর থেকে গত কয়েক দশকে এই ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাটা বেরিয়ে এসেছে। বর্তমান সংকট আসার আগেই রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা ও সামাজিক পরিষেবা ছিল অপর্যাপ্ত। চলতি সংকটের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই, যেটা কিনা আগামি ১৮ মাস চলবে বলে মনে করা হচ্ছে, ২০ শতাংশ মার্কিন পরিবার কাজ হারিয়েছে। আগামি সপ্তাহ ও মাসগুলিতে এই সংখ্যাটা ক্রমেই বাড়বে। যে বিশাল সংখ্যাক মানুষের সাহায্য প্রয়োজন হবে, তা এই সামান্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ও অল্প কিছু আর্থিক সাহায্যের উদ্যোগ দিয়ে মেটানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

এই পরিস্থিতিতে দেশ জুড়ে পারস্পরিক সাহায্য এবং গরিবদের সহায়তা করার উদ্যোগ তৈরি হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই যে এটা খুবই ভালো বিষয়। যখন সরকার টানা মিথ্যে কথা বলছে আর জনকল্যানের থেকে ব্যাঙ্কগুলোকে বেশি আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে, সেই কঠিন সময়ে জনগণ যে পরস্পরের পাশে দাঁড়াচ্ছে, সেটা স্পষ্ট। যাইহোক, এইসব সহায়তার উদ্যোগগুলির বেশিরভাগই চালু দাতব্য ও বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থার মতোই। তারা সমস্যায় পড়া মানুষকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বস্তুগত কিছু সাহায্য করে বটে, কিন্তু যে ব্যবস্থার জন্য এই ধরনের বিপর্যয়ের মুখে তাদের অসহায় হয়ে পড়তে হয়, সেই ব্যবস্থাকে তারা প্রশ্ন করতে বলে না।

এই ধরনের রাজনীতিকে অতিক্রম করাটা একান্ত জরুরি। এই সংকটের সময় জনগণকে সাহায্য করাটা যেমন দরকার, তেমনই তাদের বোঝানো জরুরি যে সরকার এবং বড়ো কর্পোরেটদের অবহেলা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন কার্যকলাপের ফলেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। এই ধরনের আরও একটা বিপর্যয়কে ঠেকানোর জন্য দরকার এই ব্যবস্থাকে পালটানো এবং পুঁজিবাদকে হারানো। তার জন্য যদি আমরা সত্যিই জনগণকে সংগঠিত করতে চাই তাহলে আমাদের মাথায় সমস্যার কারণটা পরিষ্কার থাকতে হবে। আরও ভালো ভাবে জিনিসটা বোঝার জন্য, আমাদের এটা মেনে নিতে হবে যে, জনগণকে সংগঠিত করতে না পারলে শুধুমাত্র পারস্পরিক সহায়তা ও গরিব মানুষকে সাহায্য করার কর্মসূচি চালু দাতব্য কার্যকলাপের থেকে বেশি কিছু হবে না। সেগুলো চলতি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন তোলে না। বিভিন্ন বড়ো বড়ো দাতব্য প্রতিষ্ঠান, অলাভজনক অসরকারি সংগঠনগুলি এবং অন্যান্য মানবতাবাদী সংগঠনগুলি কীভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে সেবা করে, সেটাও আমাদের লক্ষ রাখা দরকার।

পারস্পরিক সাহায্য হল এমন একটি বিষয় যেখানে দুই বা ততোধিক মানুষ পরস্পরকে সাহায্য করার জন্য যৌথ ভাবে কাজ করে, যাতে সকলেরই সুবিধা হয়। এসব ক্ষেত্রে খাদ্য, পানীয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের যোগানের মতো ছোটো মাপের উদ্যোগকেই রাজনৈতিক কার্যকলাপ হিসেবে দেখা হয়। যেহেতু এই পরিস্থিতিতে ক্রমেই বেশি বেশি মানুষ গরিব হয়ে পড়ছেন এবং ক্ষুধার্ত থাকছেন বা প্রতিদিন বেঁচে থাকার মতো অর্থ জোগাড় করতে পারছেন না, স্বাস্থ্য পরিষেবা, বাচ্চাদের যত্ন নেওয়া বা পরিবহণের খরচ যোগাতে পারছেন না, তাই এই ধরনের রাজনৈতিক কার্যকলাপও অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সমস্যা হল, উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যক্তিগত বা স্বেচ্ছাসেবী ধরনের উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে জনগণকে সাহায্য করার পরিসর অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু কেন জনগণকে এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হল এবং যে ব্যবস্থা এই পরিস্থিতি তৈরি করল, তার বিরুদ্ধে জনগণ কীভাবে প্রতিরোধ করবে- এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আটকে থাকলে তা পরিষ্কার ভাবে বোঝা যাবে না। এই ধরনের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাদকেই সাহায্য করে কারণ বিপ্লবী পরিবর্তনের কোনো পথ এতে দেখানো হয় না।

মানবতাবাদী ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিপ্লবকে আটকানোর কাজ করে। বস্তুত, জনসেবামূলক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলি পুঁজিবাদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। দাতব্য প্রতিষ্ঠান, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, অসরকারি সংগঠন এবং অন্যান্য জনসেবামূলক সংগঠনগুলি সরাসরি ধনীদের অর্থ ও মদতপুষ্ট এবং জনগণের খুব কমই কাজে লাগে। এগুলি ব্যবহারিক ও মতাদর্শগত দিক থেকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে সেবা করে। তারা জমগণকে কিছু বস্তুগত সাহায্য করলেও, গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যত দানধ্যান হয়, তা জনগণের প্রয়োজনের মাত্র ১০ শতাংশ মেটায়। এদের মূল কাজই হল, সমাজে যাতে বিপ্লবী পরিবর্তন না আসে, তা রণনীতি তৈরি করা। এর জন্য তারা সব সামাজিক সম্পদের স্রষ্টা যে জনগণ, সেই সত্যটি আড়ালে রেখে বাজার-অর্থনীতির মধ্যে যাবতীয় সমস্যার সমাধান দেখায়।

বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশনের মতো দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলি ‘ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ কোটি কোটি টাকা খরচ করে দারিদ্র্যের মতো সমস্যার পুঁজিবাদী ‘সামাধান’কে তোল্লাই দেয়। এমনকি যদি কোনো ধনী ব্যক্তি (যিদি দানধ্যান করেন) গরিব মানুষের কাজে লাগার মতো কোনো সংস্কারের জন্য সক্রিয় হন, আর সেই সব সংস্কার যদি পুঁজিবাদী শ্রেণির স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে তারা সেইসব ধনী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ময়দানে নেমে পড়ে। তার উপর, এইসব বৃহৎ প্রতিষ্ঠান শুধুই তাদের হৃদয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে টাকা বিলোয় না। সংকটে থাকা গরিব দেশে পুঁজি বিনিয়োগ করে প্রচুর মুনাফা করার সুযোগ থাকে বলেই তারা সেগুলো করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১০ সালে হাইতির ভূমিকম্পের পর ক্লিন্টন ফাউন্ডেশন এবং ইউএসএআইডি বিদেশি আর্থিক সাহায্য ও বিপর্যয় মোকাবিলায় ত্রাণের মোড়কে সে দেশে আমেরিকার ‘নয়া উদারনৈতিক’ আর্থিক কর্মসূচি বলবৎ করেছিল। হাইতিতে যে ২ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল, তার মাত্র ৩ শতাংশ হাইতির বিভিন্ন সংস্থা পেয়েছিল, ৫৫ শতাংশ পেয়েছিল বিভিন্ন মার্কিন সংস্থা। জনসেবামূলক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ধনী ও ক্ষমতাবানরা কীভাবে তাদের দানধ্যানকে সামাজিক সমস্যার সমাধান হিসেবে হাজির করে, এটা তার একটি উদাহরণ। যদিও বাস্তবে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কাজে লাগিয়ে তারা জনসেবার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও পুঁজি সংগ্রহের পথ তৈরি করে।

জনসেবামূলক এবং বৃহৎ দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলিকে এমন ভাবে দেখা হয়, যেন ধনীরা তাদের সম্পদকে পুনর্বণ্টন করার জন্য এইসব মহান প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করেছে। কিন্তু এটা ডাহা মিথ্যে। তাদের সম্পদের একটা অংশ দিয়ে গরিব মানুষকে সাহায্য করার মধ্যে দিয়ে তারা দেখাতে চায়, কয়েকজন ধনী মানুষ মিলে দুনিয়ার সমস্যার সমাধান করতে পারবে, সঙ্গে বলতে চায়, যদি তুমি ধনী হও, তাহলে তুমিও পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারবে! এটা ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী ও উদারনৈতিক মতাদর্শ ছাড়া কিছু নয়। পারস্পরিক সাহায্যও একই ধরনের মতাদর্শ নিয়ে চলে, যেখানে বলা হয়, কয়েকজন হৃদয়বান মানুষের সাহায্যেই গরিব মানুষকে সবচেয়ে ভালো ভাবে সাহায্য করা যায়। দুই ক্ষেত্রেই দেখানো হয় যাবতীয় সামাজিক, অর্থনৈতিক, বাস্তুতন্ত্রের সমস্যাগুলি ব্যক্তি মানুষের সদিচ্ছা দিয়েই সমাধান করা সম্ভব। ব্যবস্থার পরিবর্তনের গুরুত্ব এতে নাকচ করা হয়।

এই সব প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে ও বিপ্লবের জন্য জনগণকে সংগঠিত করতে হলে, গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের বস্তুগত প্রয়োজনগুলি জানা ও সেগুলি পূরণ করার মধ্যে নিজেদের আটকে রাখলে চলবে না। সপ্তাহে দু’ঘণ্টা করে জনগণকে খাওয়ানো আর কোনো একটা বৃহৎ জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান কিছু টাকা ও জিনিসপত্র ছুঁড়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান করে দেবে, এই আশায় থাকাই যথেষ্ট নয়। আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে। সংকটের সময় মানুষকে সাহায্য করা জরুরি, কিন্তু সেটা কোনোমতেই পুঁজিবাদের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না। বরং এটা ছুরির আঘাতের ক্ষতস্থানে ব্যন্ড এইডের কাজ করে। যদি এতে রক্তপাত কিছু কমে, তাহলে ভালোই। কিন্তু আমাদের ওই ক্ষতর উৎসকে উচ্ছেদ করতে হবে, যার নাম পুঁজিবাদ। জনগণকে বিপ্লবের জন্য সংগঠিত করেই তা করা সম্ভব। সেটা শুধু জনগণের বস্তুগত প্রয়োজন মেটাবে না বা যে অবস্থায় তারা বেঁচে আছে- তার উন্নতি করবে না, পাশাপাশি তাদের একটি শক্তি হিসেবে সংগঠিত করবে যা উপরের শ্রেণির মানুষকে উচ্ছেদ করে জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী এক নতুন সমাজ গড়ে তুলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here