হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক কার্ল মার্ক্স স্মরণে

0
125
মহামতি কার্ল মার্কস
কমরেড বিমল বিশ্বাস: দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শনই হলো মার্কসবাদী দর্শন, এ দর্শনের উপলব্ধিতে পৌঁছাতে ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
মহান মার্ক্সকে ওই সময়ে জার্মানি ভাববাদী দর্শনের প্রবক্তা- ফ্রেডরিক হেগেল, লুডউইগ ফয়েরবাক, ইমানুয়েল কান্ট,মিখাইল বাকুনিন, বারুখ স্পিনোজা,জসেফ প্রুধো, (ইমানুয়েল কান্ট মার্ক্স এর পূর্বেই মারা গেছেন) এসমস্ত ভাববাদী দর্শনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিল। এক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিকতার তত্ব হেগেল লিখলেন, কিন্তু বস্তু ও চেতনার সম্পর্ক নির্ধারণে ব্যর্থ হন তিনি। বস্তুবাদকে বুঝতে গিয়ে চেতনাকে বাদ দিয়ে দেন যার ফলে ফয়েরবাক হলেন যান্ত্রিক বস্তুবাদী কিন্তু এক্ষেত্রে হেগেলের বড় অবদান রয়েছে যার ফলে মার্কস বলতে পারলেন হেগেল গ্লাসটিকে উপুড় করে রেখেছিল আমি সেটাকে সোজা করে দিলাম।
এভাবে মার্কসীয় দর্শনের ভিত্তি হলো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ।ঐসময়ে জার্মানে অত্যন্ত সমালোচনার মধ্যে পড়েন মহান মার্ক্স। প্রুধোর সমস্ত লেখাই মার্ক্স এঙ্গেলসের চেতনার পরিপন্থী।প্রুধো’র “দারিদ্র্যের দর্শন”র জবাবে মহান মার্ক্স লিখলেন “দর্শনের দারিদ্র”। মার্ক্সবাদী দর্শনে জ্ঞান অর্জনের জন্য “জার্মান আইডোলজি” বইটি পড়লে বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের অনেক উপকার হবে।
বৃটেনে গণতান্ত্রিক বিপ্লব, ফ্রান্সে সামন্ততন্রকে উচ্ছেদ করে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বৃটেনে স্টিম ইঞ্জিনের আবিষ্কার ও ইউরোপের দেশগুলোতে পুঁজিবাদের যে স্ফুরণ হয় তার থেকে পুঁজির ধর্ম এবং তার গতি প্রকৃতিসহ পুঁজিবাদের বিকাশ প্রত্যক্ষ করে মার্ক্স লিখলেন “পুঁজিগ্রন্থ” । প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় ১৮৬৭সালে।”পুজিগ্রন্থ”র দ্বিতীয় ও তৃতীয় খন্ড মার্ক্সের জীবদ্দশায় পান্ডুলিপি পর্যায় থেকে যায়, তিনি এ দুটোর আরও উন্নয়ন ঘটান। এরপর মার্ক্স মৃত্যুবরণ করলে তাঁর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা মহান ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এগুলো সম্পাদনা করেন ও প্রকাশ করেন। এখান থেকেই পুঁজির ধর্ম আবিষ্কার করতে গিয়ে শ্রমের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ব উদ্ভাবন করেন।
বুর্জোয়ারা শ্রেণীসংগ্রামের তত্ব আগেই আবিষ্কার করেছিল কিন্তু মহান মার্ক্স বলেছেন বুর্জোয়ারা শ্রেণী-সংগ্রামের যে তত্ত্ব আবিষ্কার করেছে সে ক্ষেত্রে বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার একনায়কত্ব ও তার বিপরীতে বিদ্যমান বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আপনারা জানেন মহান মার্ক্স জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮১৮সালের ৫ই মে ইহুদি পরিবারে। তার বাবা হাইনরিশ মার্ক্স প্রখ্যাত আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। মহান মার্ক্স এর বাবা ছিলেন ওই সময়ে প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ। বহু কথায় না গিয়ে একটি কথাই বললে বুঝতে কষ্ট হবে না। মহান মার্ক্স যখন বার্লিনের “বন বিশ্ববিদ্যালয়”এ পড়েন তখন তিনি বাবাকে একটি চিঠি লেখেন যার জবাবে মার্ক্সের বাবা লিখেছিলেন “তুমি শুধু ব্যক্তিগত তোমার এবং তোমার পরিবারের কথা ভাববে না, সমগ্র মানবজাতির কথা ভাববে”। জার্মানিতে আর একজন মহান মার্ক্সের সহযোদ্ধা ছিলেন ফ্রেডরিক এঙ্গেলস তিনি ছিলেন তাঁত শিল্পের মালিকের ছেলে তিনি তার অবস্থান থেকে যা ভেবেছেন মহান মার্ক্স ও একই রকম ভাবতেন। মহান মার্ক্স যখন প্যারিসে ছিলেন ওই সময়কালে মার্ক্সের সাথে ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ হয় এবং প্যারিসেই প্রথম সাক্ষাৎ হয়। মার্ক্স যেমন মধ্যবিত্ত পরিবারের তিন তলা বাড়ির মালিক ছিলেন ঠিক তেমনি এঙ্গেলস শিল্পপতির সন্তান ছিলেন(সৌভাগ্যবশত দুই মহান ব্যক্তির বাড়িতে যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার)।
মহান মার্ক্স জন্মগ্রহণ করেছিলেন জার্মানির ৩৮টা প্রদেশের মধ্যে সবচেয়ে প্রগতিশীল প্রদেশ প্রুশিয়ায়। যদিও প্রুশিয়া জার্মানির সাথে পরবর্তীতে যুক্ত হয়। এই ধরনের পরিবার ও পরিবেশে জন্মগ্রহণ করে মার্ক্স তার জীবনে বুর্জোয়া শোষক শ্রেণীর কারো সাথে কোন আপোষ করেননি। “বন”এ যখন একটি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ওই সময় পত্রিকার সরকারি সেন্সরশিপ আরোপ করলে ঘৃণাভরে ওই পত্রিকার সাথে সম্পর্ক ছেদ করেন এবং দেখা দিল সীমাহীন আর্থিক সংকট। লন্ডনে থাকাকালীন কনকনে শীত এবং বাতাসের মধ্যে বাসা ভাড়া দিতে না পারার কারণে স্ত্রী জেনিকে- তিন সন্তানকে সাথে নিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াতে হয়। আর্থিক অনটনের কারণে বিনা চিকিৎসায় নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন কারণে তিনটি সন্তানেরই মৃত্যু ঘটে। এই অবস্থায় দাফন কাফন করার অর্থ ও ছিল না। এঙ্গেলস অর্থ না পাঠানো পর্যন্ত সন্তানদের দাফন-কাফন যেমন করতে পারেনি, তেমনি অভুক্ত থেকেছেন। একদিন জেনি মার্ক্স কে বললেন তুমি আমার ঠোঁট ও জিহ্বায় চুমু খেয়ে যতটুকু শক্তি সঞ্চয় করতে পারো তার উপর নির্ভর করে তোমার সমস্ত পড়াশোনা কে এগিয়ে নেবার জন্য মিউজিয়ামে যাও। মার্ক্সের জীবনে অক্লান্ত পরিশ্রম মালিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে কত ত্যাগ আর কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে তা বলে শেষ করা যাবেনা। প্রথম আন্তর্জাতিক এর সময় দেশে দেশে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। মহান মার্ক্সের মহান সৃষ্টি মার্কসবাদ তত্ত্বকথা বুঝলে অথবা ভ্রান্তভাবে বুঝলে,আমাদের দেশের শ্রমিক শ্রেণীর প্রাথমিক সংগঠন ট্রেড ইউনিয়ন ও সর্বোচ্চ সংগঠন কমিউনিস্ট পার্টিকে বুঝতে গেলে- আমাদের দেশের শ্রমিক ও শ্রমিক শ্রেণীর প্রাথমিক সংগঠন ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক শ্রেনীর সর্বোচ্চ সংগঠন কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থা বাস্তবে দেখার চেষ্টা করা এবং মার্ক্স থেকে শিক্ষা নিতে আগ্রহী হতে হবে। আমাদের দেশের পাট, বস্ত্র, চিনি, পেপার মিল শ্রমিক, সরকারি পরিবহন শ্রমিক, বেসরকারি পরিবহন শ্রমিক, সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল শ্রমিক, রেলওয়ে ও মালবাহী ট্রেনের শ্রমিক, ক্ষুদ্র শিল্পের শ্রমিক, সার কারখানার শ্রমিক, গ্যাস- কয়লা- পানি-বিদ্যুৎ শ্রমিক, সরকারি ও বেসরকারি প্লেনের শ্রমিক, সরকারি ও বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স শ্রমিক, গার্মেন্টস শ্রমিক, সরকারি ও বেসরকারি প্রাইভেট শ্রমিক, ড্রাইভার- কুলি- কৃষি শ্রমিক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা শ্রমিক,করাত কলের শ্রমিক, নসিমন-করিমন-আলমসাধু-রিক্সা শ্রমিক, ঠেলাগাড়ি-ইজিবাইক-ইজিভ্যান শ্রমিক,হোটেল-নরসুন্দর শ্রমিক, ইটভাটা-চাতাল-ইমারত নির্মাণ শ্রমিক,ব্যাংক ও বীমা শ্রমিক,গার্হস্থ্য ও দোকান শ্রমিক। তাদেরকে শ্রমিক শ্রেণীর প্রাথমিক সংগঠন ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন চেতনায় নিতে পারলেই তাদের সর্বোচ্চ সংগঠন কমিউনিস্ট চেতনায় নেওয়া সম্ভব।
মহান মার্ক্সের শিক্ষা হলো মালিক-শ্রমিক কখনো এক হতে পারে না। সেই নিরিখে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে দেশি-বিদেশি মালিকদের সাথে শ্রেণি সমঝোতার ভিত্তিতে যে ট্রেড ইউনিয়ন চলছে তার থেকে বেরোতে গেলে সঠিক ধারার শ্রেনী সংগ্রামের বিকল্প নেই।
তাই শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি দাবীদারদের প্রাথমিক গুরুত্ব দিয়ে উপরোল্লিখিত শ্রমিকদের মধ্যে কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
আসুন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ও সংগঠনে যথাযথ ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর সর্ব্বোচ্চ সংগঠন কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলি।

Warning: A non-numeric value encountered in /home/njybpvbk/public_html/wp-content/themes/Newspaper/includes/wp_booster/td_block.php on line 1009

Warning: Use of undefined constant TDC_PATH_LEGACY - assumed 'TDC_PATH_LEGACY' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/njybpvbk/public_html/wp-content/plugins/td-composer/td-composer.php on line 109

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here