খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ডের ৭০তম বার্ষিকী, স্টোরি অব আ রিয়েল ম্যান

0
118

মতিউর রহমান
উপমহাদেশে প্রথম জেল হত্যাকাণ্ড ঘটে ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল। রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে। রাজবন্দীদের ওপর চালানো গুলিতে সাতজন রাজবন্দী শহীদ হন। অন্য রাজবন্দীদের প্রায় সবাই কমবেশি আহত হন। নির্মম এ ঘটনাটি প্রথম জনসমক্ষে আসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় দিবসটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করে সাধারণ মানুষ। ১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী আতাউর রহমান খান খাপড়া ওয়ার্ড নিয়ে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিলে বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জন্য ছাত্রদের সংগ্রামের আংশিক সফলতার পটভূমিতে খাপড়া ওয়ার্ডের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। খাপড়া ওয়ার্ডে সেই নির্মম ঘটনার শিকার এক লড়াকু রাজবন্দী ছিলেন নূরুন্নবী চৌধুরী (?-২০০৪)। আহত হয়ে তাঁকে বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়েছিল। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন মতিউর রহমান।
সেদিন বুধবার, ১৬ মার্চ ১৯৮৮ সাল। কলকাতাজুড়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। অফিসফেরত মানুষের দারুণ ভিড় তখন পার্ক স্ট্রিট আর সাকু‌র্লার রোডের ক্রসিংয়ে। ট্রাম, বাস, ট্যাক্সি আর মানুষের গাদাগাদির মধ্যে আমি দাঁড়িয়ে। রাস্তা পার হব। আমার ভেতরে তখন ঈষৎ এক কম্পন।
আমি একা নই। আমার সঙ্গে একজন, যাঁর সঙ্গে সেদিন দুপুরেই সরাসরি পরিচয়—যদিও তাঁকে আমি জানি দীর্ঘদিন—তিনি দুই ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে। তিনিও কলকাতার সন্ধ্যার ওই ভিড় অগ্রাহ্য করে রাস্তা পার হবেন। আমরা যাচ্ছি রাস্তার ওপারের এক স্টুডিওতে তাঁর ছবি তুলতে। আমি তাঁর একটি ছবি রাখতে চাই।
তিনি নূরুন্নবী, বাঁ পা ঊরু থেকে কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে সেই কবে, আটত্রিশ বছর আগে। আর এই আটত্রিশ বছর ধরে তিনি দুই ক্রাচে ভর দিয়ে চলেন। তাঁর বয়স এখন ষাট। কিন্তু দেখলে তা মনে হয় না। সুন্দর সৌম্য চেহারা। যুবা বয়সের সুঠাম দৈহিক গড়ন আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না।
১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে রাজবন্দীদের ওপর গুলি চালানোর ফলে সাতজন শহীদের সঙ্গে নূরুন্নবী গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন। পায়ে গুলি লেগেছিল। ক্ষতস্থানে গ্যাংগ্রিন হলে পা কেটে ফেলে দিতে হয়। তারপর থেকে ক্রাচ দুটিই তাঁর সঙ্গী, আশ্রয় আর বন্ধু। কাজ করেন একটি মাসিক কাগজে। থাকেন কলকাতার এক মেসে। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে থাকেন বর্ধমানের নিজামপুর গ্রামে। সেখানেই তাঁর পৈতৃক বাসভূমি।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে নূরুন্নবী নিজের ইচ্ছায় সরকারি চাকরিতে যোগ নিয়ে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় চলে এসেছিলেন। খুলনায় সিভিল সাপ্লাই অফিসের চাকরিতে যোগ দেন। গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলনে অংশ নিয়ে এই নতুন দেশটি গড়ার লক্ষ্যে তিনি এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেদিন। সে সময় আরও অনেকেই এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে পূর্ব বাংলায় এসেছিলেন। অনেকে চরম অত্যাচার, নির্যাতন আর সীমাহীন দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও এ দেশে থেকে গেছেন মাটির টানে, আদর্শের জোরে।
নূরুন্নবী ১৯৪৭ সালেই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন। খুলনায় প্রথমে তিনি রেলশ্রমিক ইউনিয়নের গোপন সংগঠক হিসেবে রাজনীতিতে অংশ নেন। ১৯৪৮ সালের ৯ মার্চের রেল ধর্মঘটের পর তিনি আকস্মিকভাবে গ্রেপ্তার হন। প্রায় এক বছর খুলনা জেলে থাকার পর ১৯৪৯ সালের মে মাসে নূরুন্নবীকে রাজশাহী জেলে পাঠানো হয়। সেখানে খাপড়া ওয়ার্ডে তিনি জায়গা পান। তখন দেশের বিভিন্ন স্থানের নানা বয়সের ৩৯ জন রাজবন্দী রাজশাহী জেলে ছিলেন।


Warning: A non-numeric value encountered in /home/njybpvbk/public_html/wp-content/themes/Newspaper/includes/wp_booster/td_block.php on line 1009

Warning: Use of undefined constant TDC_PATH_LEGACY - assumed 'TDC_PATH_LEGACY' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/njybpvbk/public_html/wp-content/plugins/td-composer/td-composer.php on line 109

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here