বিপদে আমি না যেন করি ভয়

0
212

করোনাযুদ্ধে লাওস, কম্বোডিয়ার বিজয়গাথা

আমিরুল আলম খান : চোখের সামনে গোটা ইন্দোচীনের মানচিত্র না রাখলে বিষয়টি স্পষ্ট করা কঠিন। অতিমারী করোনার উৎপত্তিস্থল চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান। সেখান থেকে চীনের বাইরে করোনা প্রথম ছড়ায় থাইল্যান্ডে। তারপর জাপান ও অন্যান্য দেশে। আজ আমরা চীনের প্রতিবেশী লাওস ও কম্বোডিয়ায় করোনা সংক্রমণ ওবিজয়গাথাজানার চেষ্টা করব। আর বুঝার চেষ্টা করব, বাংলাদেশে করোনা মোকাবেলা করতে আমাদের ব্যর্থতাগুলো।

পশ্চিমা মিডিয়ার বদৌলতে আমরা থাইল্যান্ডে করোনা মোকাবেলার কাহিনি কমবেশি জানি। চীনের নিকট প্রতিবেশী হল ভিয়েতনাম, লাওস ও মায়ানমার। নানা কারণে চীনের সাথে এ দেশগুলোর গলায় গলায় সম্পর্ক। থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সাথে চীনের সরাসরি সীমান্ত নেই। তবে সবাই জানেন, চীন এখন সারা দুনিয়ার কারখানা। চীনের উপর নির্ভর না করে দুনিয়ার কারোরই উপায় নেই। পরিকল্পিতভাবে চীনারা সারা বিশ^কে তাদের উপর নির্ভরশীল করে তুলেছে গত কয়েক দশকে।

চীনের দক্ষিণে ভিয়েতনাম, লাওস আর মায়ানমার। একটু দূরে থাইল্যান্ড আর কম্বোডিয়া। কিন্তু ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ায় করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য! আর আক্রান্তের সংখ্যা? সেটাও নগণ্য। চীনের পড়শি হলেও মায়ানমার থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানে না বিশ্ব। তাই এই আলোচনায় মায়ানমারকে আনছি না। থাইলান্ডে অবশ্য মারা গেছে ৫০ জন। কিন্তু তারা খুব দক্ষতার সাথে দ্রæত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। সে আলোচনাও এখানে করছি না।আসল কথায় যাবার আগে আমাদের কিছু পরিসংখ্যান জেনে নিতে হবে। ভিয়েতনামের কথা গতকাল লিখেছি। নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।

লাওস

ঊনিশ শতকের শেষ থেকে প্রায় ৮০ বছর লাওস ছিল ফরাসি প্রটেক্টরেট উপনিবেশ। শোষণে, লুণ্ঠনে দেশটি লাগাতার দুর্ভিক্ষের দেশে পরিণত হয়। ১৯৫৩ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে।লাও রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৯ থেকে পরিচালিত দীর্ঘ কমিউনিষ্ট বিপ্লবের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালে লাওসে কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ। ১৯৭০ দশকে লাওস ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক বোমায় আক্রান্ত দেশ। মার্কিন বিমান বাহিনী লাওসের প্রতি ইঞ্চি জমি বোমা ফেলে পুড়িয়ে দেয়।

চীনের দক্ষিণে সরু দেশটি উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্বে বিস্তৃত। উত্তরে চীন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া এবং পূর্বে ভিয়েতনাম। মেকং নদীর অববাহিকায় লাওস একটি স্থলবেষ্টিত দেশ। দেশের উত্তরে রাজধানী ভিয়েনতিয়েন মেকং নদীর তীরে অবস্থিত। লাওসের আয়তন ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা ৭২ লাখ ৭৫ হাজার। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জন ঘনত্ব ৩২, মাথাপিছু বার্ষিক আয় ২,৬৭০ মার্কিন ডলার, শিক্ষার হার ৮৪.৬৬%। অধিকাংশ মানুষই কৃষিজীবী এবং গ্রাম এলাকায় বসবাস করে। শহুরে জনসংখ্যা মাত্র ৩৬%। প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৬৫.৩২ বছর। তারুণ্যে ভরপুর লাওসিয়ানদের গড় বয়স ২৪; সেটি একটি বিশাল সুযোগ এনে দিয়েছে তাদের সামনে। গত প্রায় এক দশক ধরে লাওসের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের উপর।

এই লাওসে এ পর্যন্ত করোনায় কেউ মারা যায় নি। আক্রান্ত হয়েছে মাত্র ১৯ জন, তারমধ্যে ৪ জন এখন সুস্থ, ১৫ জন চিকিৎসাধীন। কারো অবস্থায়ই ঝুঁকিপূর্ণ নয়। জনসংখ্যার হিসেবে লাওসে প্রতি ১০ লাখে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে মাত্র ৩ জন। ১৪৬১ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে, যা প্রতি ১০ লাখের মধ্যে ২০১ জন। (সূত্র: ওয়ার্ল্ডওমিটার ডট ইনফো)।

সেটি সম্ভব হলো কীভাবে? চীনে করোনা ছড়িয়ে পড়ার পরপরই লাওস সতর্ক অবস্থান নেয়। বিপুল সংখ্যক লাও থাইল্যান্ডে কাজ করেন। সরকার সেসব কর্মীদের দেশে ফেরা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। থাইল্যান্ডে করোনা ছড়িয়ে পড়লে লাওস সরকার নিজের দেশে করোনা সংক্রমণের আশংকায় দ্রæত পদক্ষেপ গ্রহণ করে নানা সতর্কতা জারি করে। জনগণকে করোনা মোকাবেলায় উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত করে। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। সন্দেহভাজনদের পরীক্ষা শুরু করে। ১৩ মার্চ প্রাদেশিক সীমান্তগুলো বন্ধ করে দেয়। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুতদারী, মূল্য বৃদ্ধি এবং গুজব ছড়ানোর বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি জারি করে। অতি জরুরি কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া সবাইকে ঘরে বসে অফিসের কাজ করতে পরামর্শ দেয়। থাইল্যান্ড থেকে ফেরাদের সীমান্তে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়।

থাইল্যান্ড থেকে ফেরা ২৮ বছর বয়েসী এক যুবক প্রথম করোনা আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন ২৪ মার্চ। একই দিন ৩৬ বছর বয়সী এক নারীর দেহে করোনা শনাক্ত হয়। তার কোন বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস ছিল না। দুজনই রাজধানী ভিয়েনতিয়েনের। ২৫ মার্চ ১ জন এবং ২৬ মার্চ ৩ জন,  ২৮ মার্চ ২, ২৯ মার্চ ৩জন, ৫ এপ্রিল ১জন, ৬ এপ্রিল ১জন, ৭ এপ্রিল ২জন, ৮ এপ্রিল ১জন, ১০ এপ্রিল ১জন, ১১ এপ্রিল ২জন, ১২ এপ্রিল ১ জন  (মোট ১৯ জন) করোনারোগী শনাক্ত হয়েছে। জাতীয় টাস্ক ফোর্সের পরামর্শমত প্রধানমন্ত্রী থংলুন সিসুলিত ৩০ মার্চ থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত সকল আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ যানবাহন ও লোক চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ১০ জনের বেশি সমবেত হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তবে পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়। এভাবে লাও সরকার করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। তবে, দেশটি কমিউনিস্ট শাসিত বিধায় পশ্চিমা গণমাধ্যম লাওসের এ সাফল্য স্বীকার না করে বিভিন্ন অপপ্রচার চালাচ্ছে।

পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর অন্যতম কম্বোডিয়া। মাথাপিছু বার্ষিক আয় মাত্র ২৬০ মার্কিন ডলার। আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে কিছুটা বড়। কম্বোডিয়ার আয়তন ১ লাখ ৮১ হাজার বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা ১ কোটি ৫২ লাখ, প্রতি বর্গকিলোমিটারে জন ঘনত্ব ৮৬। মাত্র ২৪% মানুষ শহরে বাস করে। শিক্ষার হার ৮৮%, বাংলাদেশের তুলনায় বেশ বেশিই।

এ রকম একটি অতি গরিব দেশ কম্বোডিয়ায় করোনায় মারা যায় নি একজনও। আক্রান্ত মাত্র ১২২ জন; তাদের মধ্যে ১১০ জনই সুুস্থ হয়ে উঠেছেন। বাকি ১২ জনের মধ্যে মাত্র একজনের অবস্থা খারাপ। ৫৭৬৮ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে, যা প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ৩৪৫ হিসেবে। কম্বোডিয়ায় ৭ মার্চ প্রথম একজন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। ১৬ মার্চ পর্যন্ত ১১ জন আক্রান্ত হয়। এরপর হঠাৎ বেড়ে ১৭ মার্চ আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২ জনে। ২০ মার্চে ৫০ এবং ২২ মার্চে সংখ্যা বেড়ে ৮২ জনে পৌঁছায়। ২৬ মার্চ সর্বোচ্চ ৮৮ জনে উঠে সংক্রমণ ক্রমাগত কমা শুরু হয়। সে ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২২ এপ্রিল মাত্র ১২ জন চিকিৎসাধীন আছে। বাকিরা সুস্থ হয়ে গেছেন। করোনা থেকে দ্রæত সুস্থ হয়ে ওঠায় কম্বোডিয়ার সাফল্য বিস্ময়কর। কম্বোডিয়ায় করোনা সংক্রমণরোধে চীন এবং ভিয়েতনাম ব্যাপক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু গল্পের পিছনেও গল্প থাকে। চীনে করোনায় প্রথম মৃত্যু ঘটে ৯ জানুয়ারি, দ্বিতীয় মৃত্যু ১৫ জানুয়ারি। ততদিনে উহান তো বটেই, সারা চীনকেই বিশ^ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে সরকার। ঠিক সেই দুঃসুময়ে বন্ধু রাষ্ট্র কম্বোডিয়ার প্রদানমন্ত্রী হুন সেন ৫ ফেব্রæয়ারি চীন সফর করে বেইজিং-এ প্রেসিডেন্ট শি জিং পিঙের সাথে দেখা করেন, সংহতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গরিব হলেও কম্বোডিয়া চীনা জনগণের পাশে আছে, থাকবে। এমন কি, তিনি চীন থেকে কম্বোডীয় নাগরিকদের দেশে ফিরে না এসে চীনের বিপন্ন মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে আহŸান জানান। চীনে প্রবাসী কম্বোডীয়রা সে আহŸানে সাড়া দেয়। কম্বোডিয়া একমাত্র জাতি যারা করোনা সংক্রমিত চীন থেকে একজনও দেশে ফেরে নি। বরং তারা চীনা বন্ধুদের পাশে থেকে সাধ্যমত সেবা দিয়ে গেছে। সারা দুনিয়া কম্বোডীয় নেতা এবং সে দেশে প্রবাসী কম্বোডিয় নাগরিকদের এই মানবিক ভূমিকায় বিস্ময়াভিভূত।

ত্বরিৎ উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চীন ও ভিয়েতনামের সম্মিলিত সহায়তা ও প্রচেষ্টা কম্বোডিয়ার সাফল্যের পিছনে বড় ভুমিকা পালন করেছে। তবে স্বীকার করতেই হবে, কম্বোডিয়ার সরকার ও জনগণ কোন ঝুঁিক নিতে চায় নি এবং তারা বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সাধ্যমত সব কিছুই করেছে।

যেখানে ইউরোপ, আমেরিকা করোনার হানায় মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে সেখানে ইন্দোচীনের এ সাফল্য পশ্চিমা মিডিয়া চেপে যাচ্ছে। আর আমাদের দেশের হুক্কা হুয়া মিডিয়াও তাই-ই প্রচার করে মানুষের মধ্যে আতংক ছড়াচ্ছে। পৃথিবীর বহু দেশ প্রমাণ করেছে, সময়মত সঠিক ব্যবস্থা নিলে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপযুক্ত নিরাপত্তা দিয়ে করোনা আক্রান্তদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়। আর ঘরবন্দি মানুষদের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থাপনা দিয়ে করোনার মত অতিমারীর বিরুদ্ধে সাফল্যের সাথে লড়াই করা যায়। জনবিচ্ছিন্ন কোন কাজই সফল হয় না। বিচ্ছিন্নতা নয়, বেশি প্রয়োজন সংহতি। আর্তের সেবা শুধু আমলা ও দলনির্ভরতায় সম্ভব হয় না। করোনা লড়াইয়ে চিকিৎসক, নার্স, সহায়তাকারী, ড্রাইভার, সাফাইকর্মী, পুলিশ, ওষুধ প্রস্তুত ও সরবরাহসহ জরুরি সেবা প্রদানকারীদের মত ফ্রন্ট লাইনের লড়াকু সৈনিকরাই। তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার ছিল সবার আগে। এরপর জনগণের ঘরে ঘরে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি পৌঁছে দেবার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। দরকার খেতের প্রতি দানা ফসল ঘরে তুলতে কৃষকের পাশে সর্ব শক্তি নিয়োজিত করা। না হলে মহামারী একদিন থামবে বটে; কিন্তু দুর্ভিক্ষ রোধ করা যাবে না। মানুষ তখন মরবে দুর্ভিক্ষে।

আমরা শুধু গলাবাজি করে দামী সময় নষ্ট করেছি, গোটা দেশকে সবচেয়ে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছি। যত দিন পর্যন্ত বিশে^র প্রতিটি দেশ এই সংকট থেকে মুক্ত না হবে, ততদিন এই অতিমারী কার্যকরভাবে দমন করা সম্ভব হবে না। জীবনযাত্রা আবার স্বাভাবিক হবে না। এখন সাহস হারালে ডুবে যাবে তরী। এখন তাই দরকার সাহস সঞ্চয় আর সাহসিকতার সাথে করোনার সাথে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করা।

[করোনা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য ওয়ার্ল্ডওমিটার ডট কম থেকে নেয়া। অন্যান্য তথ্য বিশ^ ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্র থেকে নেয়া]

আমিরুল আলম খান, যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান

amirulkhan5252@gmail.com

 

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here