করোনাযুদ্ধ : সমাজতান্ত্রিক দেশ ও আদিবাসীদের অভিজ্ঞতা

0
174

মামুনুর রশীদ
করোনাযুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোই যথার্থ সুবিধা করতে পারছে বলে নানা সংবাদে প্রকাশ পাচ্ছে। প্রথমত. কিউবা, সেখানকার করোনা বিপর্যয়ের কোনো সংবাদ নেই, বরং তারা ডাক্তার পাঠিয়ে ইতালি ও এঙ্গোলায় সাহায্য করে চলেছেন। চীনের যে জনসংখ্যা তাতে মৃত্যুর হার অনেক বেশি হতে পারত কিন্তু দেখা যাচ্ছে খোদ উহানেই করোনার বিস্তার তারা ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। বাড়ির পাশেই কেরালাতেও সাফল্য রীতিমতো চোখে পড়ার মতো এবং কেরালার ব্যবস্থাপনা ভারতের অন্যান্য রাজ্য এমনকি অন্যান্য দেশেও অনুসরণ করা হচ্ছে। ভিয়েতনামের সাফল্য রীতিমতো বড় সংবাদ হয়ে পড়েছে। রাশিয়ায় পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্র এখনো বড় বেশি আসন গাড়তে পারেনি। তবু প্রথমদিকে বেশ সফল হয়েছিল। এখন আবার আক্রান্ত হচ্ছে কিন্তু যেহেতু সমাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতা আছে, তাই দ্রুতই সামাল দিয়ে ফেলবে।
সমাজতন্ত্র পৃথিবীতে মানুষের জন্য একটা নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছিল। মানুষে মানুষে সৌভ্রাতৃত্ব, সমাজ নিয়ে শুধু ভাবার বা গবেষণার নয়, কাজ করার একটা বিশাল আয়োজন তৈরি করেছিল। রাশিয়ার সত্তর বছরের অভিজ্ঞতা মানবজাতির জন্য ছিল ভীষণ আশাব্যঞ্জক। জ্ঞান-বিজ্ঞানে, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের প্রতি সহমর্মিতায় সে ছিল একটা স্বপ্নের সময়। কিন্তু কিছু বিপথগামীর অতি উচ্চাশার কারণে সেখানে বিপর্যয় দেখা দিল। কিন্তু গত ফুটবল বিশ্বকাপে পুঁজিবাদী দেশগুলোর নানা ষড়যন্ত্রও তাদের সাফল্য ধ্বংস করতে পারেনি। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের নাগরিকরাও এমন চমৎকার ব্যবস্থাপনা দেখেনি। চীনে যদিও পুঁজিবাদ ঢুকে গেছে, সমাজতান্ত্রিক সে ব্যবস্থায় চিড় ধরেছে কিন্তু অর্থনীতি সেখানে মুখ্য হয়ে গেছে, তবু তাদের সংকটে সমাজতান্ত্রিক উদাহরণগুলো তারা প্রয়োগ করে থাকেন। এত বড় দেশ চীন তদুপরি প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন ভূমিকম্প, প্লাবন একটা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়, তবু এসব ঘটনায় সমগ্র জাতি মুহূর্তেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে মানুষ সে বিপদকে অতিক্রম করে ফেলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ের মধ্য থেকে নিকারাগুয়া টিকে আছে এবং করোনার কোনো দুঃসংবাদ সেখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে ইউরোপের উন্নত দেশের এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদের কল্যাণে ধনাঢ্য অর্থনীতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের এত বিকাশের ফলেও সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন তারা। এতেই প্রমাণ হয় সমাজতন্ত্র যেখানে মানুষের প্রতি আস্থাশীল, অন্যদিকে পুঁজিবাদ সব সময়ই টাকার প্রতি অনুগত। টাকা থাকলেই সব হয় এ ধরনের দম্ভ সব সময়ই তাদের মধ্যে কাজ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিপদ হলেই অভিবাসীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রথমে টাকার অঙ্ক ঘোষণা করে, তারপর অভিবাসন বন্ধ করে দেয়। অথচ ওই দেশটা তো অভিবাসীদেরই দেশ, তাদেরই তো সবচেয়ে বড় অধিকার সেখানে। এবার প্রমাণ হলো মানুষ মারার অস্ত্রের গবেষণার জন্য যে পরিমাণ অর্থ তারা ব্যয় করে থাকে, মানুষকে বাঁচানোর জন্য তার একটা ভগ্নাংশকেও তারা ব্যয় করার কথা ভাবেনি। একই পদাঙ্ক অনুসরণ করে থাক ইউরোপের দেশগুলো। যারা সমাজতন্ত্রের সুফলগুলো নিজের দেশে প্রয়োগ করেছে, সেই সমাজকল্যাণমুখী দেশগুলো যেমন নরওয়ে, ডেনমার্ক সেখানেও করোনা-সংকট অনেক কম। এসবের কারণই হচ্ছে মানুষকে সর্বাগ্রে বিবেচনা করা। মানবকল্যাণের কথা শুধু সংকটে নয়, সব সময়ের জন্য মনে করে রাষ্ট্রীয় নীতিগুলো তৈরি করা।
কিউবার মতো একটা ছোট্ট দেশ আদর্শগতভাবে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একেবারে বিরোধী, সেই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা পৃথিবীতে এক নম্বর। আর যেখানে সবকিছুই অর্থ দিয়ে কিনতে হয়, সেই যুক্তরাষ্ট্রের নম্বর কত হবে, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। কিউবায় প্রতিটি মানুষের চিকিৎসা রাষ্ট্র নিশ্চিত করে থাকে, যার জন্য তিন মাস বা ছয় মাস অন্তর প্রতিটি মানুষের (মানে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত) স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। ভারতের মধ্যে থেকেও কেরালা অনেক নতুন ব্যবস্থা চালু করেছে, যেহেতু সেখানে একটি কমিউনিস্ট পার্টি রয়েছে এবং প্রায়ই তারা সরকার গঠন করে। এখনো সবচেয়ে দক্ষ নার্স কেরালা থেকেই আসে। পৃথিবীর অনেক দেশেই কেরালার নার্সের এবং চিকিৎসকদের সুনাম ও চাহিদা আছে। রাজ্যের শিক্ষার হারও সবচেয়ে বেশি। এই শিক্ষা আবার শুধু চাকরি পাওয়ার শিক্ষা নয়। সত্যিকারের মানবকল্যাণের শিক্ষা।
আমরা জানি সুন্দর স্বাস্থ্যের জন্য কিছু নিয়ম-কানুন মানা প্রয়োজন। তার মধ্যে আছে পরিচ্ছন্নতা, কায়িক শ্রম, সুষম খাদ্য, ব্যায়াম ও প্রকৃতির সঙ্গে জীবনযাপন। আমাদের মতো দেশে এসব কিছুই মানা হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে আদিবাসীরা অনেক সুস্থ জীবনযাপন করে থাকেন। তার কারণ উপরোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি তারা যত্নবান। এসব তারা বংশপরম্পরা থেকেই শিখে আসছেন। তারা মনে করেন এই ধরিত্রী তাদের মা। মায়ের যত্ন যেমন করতে হয়, তেমনি তারা প্রকৃতিকে এমন করে ভালোবাসেন, যত্ন করেন। তাদেরও দারিদ্র্য আছে, অভাব আছে কিন্তু বাড়ির আঙিনার ফুলগাছটি বা ঔষধিগাছটি খুব যতনে লাগানো আছে। তাদের রোগবালাইয়ে কথায় কথায় ডাক্তারের দ্বারস্থ হন না, নানা ঔষধিগাছ এবং ঐতিহ্যগতভাবে পাওয়া চিকিৎসা করেন ও সুস্থ হয়ে ওঠেন। এবারও পার্বত্য চট্টগ্রামে, সমতলের গাড়ো অঞ্চল বা সাঁওতালদের মধ্যে করোনার প্রাদুর্ভাব নেই বললেই চলে। খাদ্যাভ্যাস বা কায়িকশ্রমের প্রাকৃতিক জীবনযাপনের ফলে তাদের দেহে থাকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।
স্বাস্থ্য শিক্ষা যে শিক্ষার বড় একটা অংশ, তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অবহেলিত। এখানেও ছেলেমেয়েরা স্বাস্থ্য বিজ্ঞান পড়ে কিন্তু তা জীবনাচরণের জন্য নয়, পরীক্ষা পাসের জন্য। তাই জীবনযাপনের সঙ্গে তাকে কাজে লাগানোর প্রয়োজন মনে করে না। আজকে লকডাউনের কালে দেখা যাচ্ছে কেউ একে মানার প্রয়োজনবোধ করে না। শুধু যে অশিক্ষিত লোকরাই তা মানে না তা নয়, শিক্ষিত লোকরাও বিষয়টিকে অবহেলা করছেন। তার কারণ শুধু নিয়মের মতো অবজ্ঞাই নয়, তার শিক্ষাতেই একটা গলদ রয়ে গেছে। এই গলদকে সারানোর একটাই উপায়, উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম করা। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থায় স্বাস্থ্যশিক্ষার প্রায়োগিক অনুশীলন যুক্ত থাকে, তাই তাদের মধ্যে যতই পুঁজিবাদের অনুপ্রবেশ করুক না কেন, আজন্মের শিক্ষাই তাদের সচেতন করে রাখে যে কারণেই এ ধরনের মহামারীকে তারা অনায়াসে মোকাবিলা করে থাকেন। সব শেষে সমাজতন্ত্রের শিক্ষা সম্পর্কে একটি সত্য ঘটনা বলে লেখাটা শেষ করব। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় রুশ ও মার্কিন বাহিনীর ট্যাংক পাশাপাশি বার্লিন অভিমুখে যাচ্ছিল। কোনো এক গ্রামের রাস্তায় কয়েকটি মুরগির বাচ্চা পথে পড়ল। রুশ বাহিনীর ট্যাংকগুলো থেমে গেল। মুরগির বাচ্চাগুলোকে সরিয়ে তারপর ট্যাংকবহর নিয়ে এগিয়ে গেল। এই ঘটনাটি আমেরিকান সৈনিকরা খুবই ব্যঙ্গ করে ফলাও করল নিজের দেশে, বলল এই হচ্ছে রুশ বাহিনী, তাদের বীরত্ব এই তারা মুরগির বাচ্চাকেও ভয় করে। বিখ্যাত এক পত্রিকায় একটি কার্টুনও প্রকাশ হলো। বিষয়টি স্ট্যালিন দেখলেন এবং দেখে একটি মন্তব্য করলেন রুশ বাহিনীর কাছে যুদ্ধ মানে জীবন বাঁচানো, যেখানে একটি মুরগির জীবনও মূল্যবান আর আমেরিকানদের কাছে যুদ্ধ মানে জীবন নেওয়া, জীবন ধ্বংস করা। রুশ সৈনিকরা এই শিক্ষাকেই কাজে লাগিয়েছেন। আজকের দিনেও জীবনের মূল্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো ভোলেনি।
লেখক নাট্যকার,
অভিনেতা ও কলামনিস্ট
mamunur530@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here