জীবনের চেয়ে জীবিকা যখন বড়

0
181

মৌসুমি বিশ্বাস
এখন এই নগরীতে যান্ত্রিক শব্দের পরিবতে’ ঘুম ভাঙ্গে পাখির ডাক শুনে। কথাটা কিছুদিন আগে বললেও বেশিরভাগ মানুষই বিশ্বাস করত না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভীষণই অন্যরকম। বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবতী’ সবচেয়ে বড় মানবিক বিপয’য়। কারণ এরকম দিনযাপনের অভিজ্ঞতা আমাদের কারোরই নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিরতরে এই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়ে নামের পরিবতে’ শুধু সংখ্যা হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে আমরা কেউই জানিনা পরবতী’ সকালে এই নাম হারিয়ে সংখ্যা হয়ে যাওয়া মানুষের তালিকায় আমরা নিজেরা যুক্ত হবো কি না। আমাদের প্রতিদিনের চেনাজানা, হেলা-অবহেলার পৃথিবীটা এক নিমেষে কিভাবে যেন পাল্টে গেল। না কি আমরাই একে পাল্টে দিলাম দীঘ’দিনের অবহেলায়, অগ্রাহ্যতায়, শোষণে আর নিষ্পেষণে!! কি করিনি আমরা একে ঘিরে; জীবাশ্ম জ্বালানী, পারমাণবিক পরীক্ষা, জীবানু অস্ত্রের গবেষণা, বন্য প্রাণী হত্যা, বনভূমি উজাড়, নদ-নদীর প্রবাহ বন্ধ করে নিজেদের সুবিধামত তার গতিপথ পরিবত’ন ইত্যাদি যা যা করা যায়, যা করা যায় না সবই করেছি আমরা। আমাদের কৃতকমে’র দায় পৃথিবী তার পুঞ্জিভূত ক্ষোভে আজ আমাদেরকেই যেন ফিরিয়ে দিচ্ছে কোভিড-১৯ নামে।
পৃথিবীতে এ যাবৎ যত দূযো’গ এসেছে মানুষ তার বুদ্ধিমত্তা, উদ্ভাবনী শক্তি আর মানবিকতা দিয়েই সব বিপদ একসঙ্গে মোকাবেলা করেছে; অন্ততঃ ইতিহাস তাই বলে। তবে বিশ্ব এ পয’ন্ত ধী-নিধ’ন, জাতিগত আর পেশিগত বিরোধ দেখলেও একযোগে সারা পৃথিবী অদৃশ্য এক জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়ছে এমন ইতিহাস বোধহয় আমাদের জানা নেই। এইসব দুদি’নে মানুষ তার বন্ধু, সমাজ ও রাষ্ট্রকে নতুন করে চেনে। স্বাভাবিক সময়ে মানুষ একে অন্যের সাথে যে আচরণ করে এইসব দুঃসহ দিন এলে সেই আচরগত পাথ’ক্য দিয়েই মানবিকতা আর অমানবিকতার সীমানা নিধা’রিত হয়। তারপর একদিন দুঃসময় কেটে গেলে যে ইতিহাস লেখা হয় সেই ইতিহাসই মানুষের বিবেচনাবোধের সাক্ষী হিসাবে থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্মে।
বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের একটি জনঘনত্বপূণ’ দেশে (যেখানে প্রতি বগ’কিলোমিটারে জনবসতি ১,১১৫ জন) যদি করোনা হানা দেয় তবে বুঝতে হবে আমাদের সামান্য অসচেতনতায়ও এখানে কি পরিস্থিতি হতে পারে। স্বাধীনতা পরবতী’ অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর যে দেশটির অথর্নীতি সবে মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে, যে দেশের রেমিট্যান্স আর পোশাক শিল্পখাতের রপ্তানী আয় ক্রমশঃ অন্যদের কাছে উদাহরণ হয়ে উঠতে শুরু করেছে সেইদেশে হঠাৎ যদি একদিন করোনার মত ব্যাধি হানা দেয় তখন মানুষ শুধু দিশেহারাই হয় না, ভাতের থালাও ক্রমশঃ দূরবতী’ হতে থাকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগাল থেকে।
গণমাধ্যেমে বারবার প্রচার হচ্ছে, করোনার ভয়াবহতা ঠেকাতে হলে বারবার সবান দিয়ে হাত ধুতে হবে আর সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। এই তথ্য প্রচারে সবাই তৎপর, চলছে কমিউনিটি পর্যায়ে মাইকিংও। অর্থাৎ প্রচার ব্যবস্থায় কোন ঘাটতি নেই। সরকারের পাশাপাশি ইতিমধ্যে অনেকেই ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সহযোগিতার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল।
কিন্তু ঠিক নেই কি? সেটা হচ্ছে আমাদের স্ব-বিরোধী আচরণ। করোনা বিস্তারের আশঙ্কায় যখন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হল তখন বাসে, ট্রাকে, ট্রেনে, লঞ্চে চেপে যে যেভাবে পারল সবাই যার যার বাড়ি ফিরে গেল। ফিরে না গিয়েও যে উপায় ছিল না। এত মানুষ কাজ না থাকলে খাবে কি! অতপরঃ মানুষ বিঘ্ন বা নি’বিঘ্নে পথের ক্লান্তি ভুলে বাড়ি ফিরলো। এই ঘটনার আগে পরে আমাদের নেতারা টেলিভিশনে এলেন এবং বললেন, করোনা মোকাবেলার জন্য আমাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আমরা ছুটির দিনে টিভি দেখে রাতের খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ঘুমতে গেলাম। |
কিন্তু ঘুমের ভেতর আমরা যে দুঃস্বপ্ন দেখলাম, আমরা ভালো নেই। আমাদের চারপাশে খেতে না পাওয়া মানুষের মিছিল। ত্রাণের ট্রাক থেকে খাবার বিতরণ করার আগেই অভুক্ত মানুষেরা খাবারের প্যাকেট তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে। সিএনজি চালক আর রিক্সাচালক ভাইয়েরা বলছে, ‘সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে আর বাসায় বসে থাকতে পারছি না, ঘরে বসে না খেয়ে মরার চেয়ে কাজ করে মরাও ভালো’। কর্মহীন মানুষের ছায় আর অভূক্ত মানুষের মিছিল দীঘ’ থেকে দীঘ’তর হচ্ছে, যেখানে সামাজিক দূরত্বের ব্যবধান মুছে যাচ্ছে ক্ষুধার রাজ্যে। অন্যকেউ খাবারের প্যাকেটটি নিয়ে নেবার আগেই যে হাত পেতে খাবারটি সংগ্রহ করতে হবে যে কোন মূল্যে। কারণ ঘরে অনেকগুলো পেটে আগুন জ্বলছে যে!! কী দুঃসহ দিনযাপন! হয় ক্ষুধা না হয় মৃত্যু। একদিন ঘুমতে যেয়ে আমরা যাকে দুঃস্বপ্ন মনে করেছিলাম, কিন্তু সে তো দুঃস্বপ্ন নয় বরং ভয়ঙ্কর বাস্তবতা যা আমাদের চতুপাশ্বে’ রয়েছে ঘিরে।
এতকিছুর পরও সময় আর রূঢ় বাস্তবতার সাথে যুদ্ধ করে শত অনিশ্চয়তা সত্বেও যারা ঘরে ফিরে গিয়েছিল তাদের আবার এই ধূলোর শহরে ডেকে আনা হল। কোন কোন ডাক উপেক্ষা করার মত সাহস বা ধৃষ্টতা আমাদের কারোরই নেই। কারণ সবার আগে ক্ষুধা সত্য। কারখানা খুলতে হবে। একদিকে ঘরে থাকবার আহবান অন্যদিকে কারখানা খোলার ঘোষণা কি বিপুল স্ববিরোধীতা, কি ভীষণ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত! কারখানা খোলার ঘোষণার পর যে দৃশ্য কোনদিন দেখতে হবে বলে ভাবিনি সেই দৃশ্যই সবাই দেখলাম। মাইলের পর মাইল মানুষ হেঁটে চলেছে গন্তব্যে পৌঁছুবে বলে। নারী-পুরুষ-নারীর কোলে শিশু- নিবি’শেষে যাদের জীবিকার জন্য গন্তব্যে পৌঁছুনো প্রয়োজন তারা সবাই। আমাদের কি আসলেই কোন গন্তব্য আছে, ছিল কখনো? এখানে যে জীবনের চেয়ে জীবিকা বড়। বিচিত্রতার এখানেই শেষ নয়। জীবন-মৃত্যু মাথায় নিয়ে, সামাজিক-অসামাজিক দূরত্ব উপেক্ষা করে মানুষগুলো যখন ঢাকায় এল তখন আবার বলা হল, পরিস্থিতি বিচেনায় কারখানা খোলা হবে না। তাহলে তারা তখন কি করবে? ফেরৎ যাবে? ফিরতে হলে সেই তো আগের মত, পায়ে হেঁটে। থেকে যাবে, খাবে কি তিন বেলা? আর থাকার জায়গাটাও তো ভালো কিছু নয়। তাহলে? কি হবে এখন? আমরা এর উত্তর জানিনা। নীতি-নিধা’রকদের জানা আছে নিশ্চয়ই। কমিউনিটি ট্রান্সমিশন তো ইতিমধ্যে হয়েই গেছে। এরপর সামাল দেওয়া যাবে তো সবকিছু? আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। একের পর এক এলাকা লকডাউন হচ্ছে। এই ভুলের মাশুল আমাদেরকে কতদূর নিয়ে যাবে কে জানে।
ক্ষমতার উঁচুতলায় থাকলে ক্ষুধার কষ্ট বোঝা যায় না কখনো। আপনি হয়ত ভোটের রাজনীতির জন্য দু’একদিন পাবলিক বাসে চড়েন, চায়ের দোকানে চা বানান। সেটা খবরের হেডলাইন হয়। আমারা ব্লাডি পাবলিক সেসব টিভিতে দেখে ধন্য হই। কিন্তু বুকে হাতে রেখে বলুন তো ক্ষুধার কষ্ট কোনদিন উপলদ্ধি করেছেন কি? আজ অন্ততঃ একবার মনে করুন তো আপনার যৌবনের উচ্ছল দিনগুলির কথা। যখন আপনি যথাথ’ই স্বপ্ন দেখতেন আর অন্যদেরও স্বপ্ন দেখাতে পারতেন যে, একদিন ক্ষমতায় গেলে আপনি অন্নহীনের অন্ন যোগাবেন, ফসলের মাঠে কৃষকের হাতিয়ার হবেন। সেসব ভুলে গেছেন আজ ক্ষমতায়িত হয়ে?? রুদ্র’র ইশতেহার কবিতাটি নিশ্চয়ই পড়া আছে। তবুও আবার একবার মিলিয়ে নিন কয়েকটি লাইন নিজের জীবনের সাথে-
” তারা ক্ষুধা দিয়ে আমাদের বন্দী করেছে, তারা বস্ত্রহীনতা দিয়ে আমাদের বন্দী করেছে, তারা গৃহহীনতা দিয়ে আমাদের বন্দী করেছে, তারা জুলুম দিয়ে আমাদের বন্দী করেছে। তারা সবচেয়ে কম শ্রম দেয় আর সবচেয়ে বেশি সম্পদ ভোগ করে; তারা সবচেয়ে ভালো খাদ্য খায় আর সবচেয়ে দামী পোশাক পরে”
আসলে মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখতে পেরেছি ক’জন আমরা? কখনো দেখেছি শ্রমিক হিসাবে অথবা অধস্তনঃ হিসাবে। মানুষকে মানুষ হিসাবে ভালোবাসতে হবে যে। দূর-দূরান্ত থেকে তাঁদের হেঁটে আসা অথবা ফিরে যাওয়ার কষ্ট অনুভব করতে হবে। সেইসাথে এই বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে বারবার এই একই কথাই মনে করতে হবে- ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। এই দুঃসময়ে শৃঙ্খলা আর মানবিকতা দুটোরই যে সমন্বয় লাগবে। তবেই না আমারা কোভিড-১৯ এর সাথে লড়তে পারবো। যে জাতির ৫২, ৬৯, ৭১-এর মত ইতিহাস আছে সে জাতি সব যুদ্ধে জয়ী হতে পারবে।
ছাত্র মৈত্রী যশোর জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here