`বিপদে আমি না যেন করি ভয়’ করোনা জয়ে ভিয়েতনামের সাফল্য

0
151

আমিরুল আলম খান

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৯ কোটি ৭৩ লক্ষ জনসংখ্যার দেশ ভিয়েতনাম। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১.২৫ ভাগ সেখানে বসবাস করে। প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে ৩১৪ জন। চীনের প্রতিবেশী দেশ। চীনের সাথে তাদের যোগাযোগ খুব নিবিড়। চীনে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সতর্ক হয় ভিয়েতনাম। দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বেশ দুর্বল। সে কারণে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও নাজুক। দক্ষিণ কোরিয়ার মত ব্যাপক সংখ্যায় সংক্রমণ শনাক্তের মত পরীক্ষা করার সামর্থ্য নেই ভিয়েতনামের। সেটাই তাদের প্রধান দুর্বলতা। আশংকার কারণও সেটাই। কিন্তু ভিয়েতনাম প্রথম থেকেই সতর্ক অবস্থান নেয়। দুর্বলতাকেই কী করে সক্ষমতায় পরিণত করা যায় সে পরিকল্পনা গ্রহণ করে সরকার। আত্মতুষ্টির বদলে যুদ্ধকালীন সতর্কাবস্থা জারি করে। দ্রুত ব্যবস্থা নেয় করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে।
কী সে ব্যবস্থা? ঘরবন্দি। নাগরিকদের এক অজানা ভাইরাস আক্রমণের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়। বলা হয়, সকলেই যেন নিজেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেয়। বলে দেয়া হয়, সরকারের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার কথাও। সংক্রমণ রোধে সকলের সহযোগিতা নেওয়া হয়। সংঘবদ্ধভাবে করোনা মোকাবেলা ও জয় করার আহবান জানায় সরকার। প্রধানমন্ত্রী নগুয়েন গুয়ান ফুক জানুয়ারির শেষদিকে দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘোষণা করেন। তখনও চীনের বাইরে ভিয়েতনামে কেউ করোনায় আক্রান্ত হয় নি। কিন্তু ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী সম্ভাব্য সংক্রমণ ঠেকাতে দেশবাসীকে বললেন, সাবধান হবার বিকল্প নেই। এই শত্রুর সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি। ইতিপূর্বে সার্স সংক্রমণের অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এই যুদ্ধে বিজয় না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ জারি রাখার আহবান জানান। নিজেদের যা কিছু সামর্থ্য আছে তাই নিয়ে ‘শত্রুর মোকাবেলা’ করার আহবান জানান তিনি।
এমন মারণব্যাধি মোকাবেলায় সবচেয়ে বেশি দরকার বিপুল অর্থ, উন্নত স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দীর্ঘ দশকের লড়াইয়ে ধ্বংস থেকে উঠে আসা দেশ ভিয়েতনামে এসবের এখনও দারুণ অভাব। তাই নতুন কর্মপন্থা নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়ে। সেটিই ভিয়েতনাম সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে করতে সমর্থ হয়। প্রথমত, জনগণকে সংগঠিত করা। তাদের আস্থায় আনা। প্রয়োজনীয় ব্রিফিং করা। বিপদ ও করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া। একই সাথে ব্যাপক প্রচার চালানো। করোনা সন্দেহভাজন এমন কারো সংস্পর্শে কেউ এসেছে কিনা তা খুজে বের করা। তাদের স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি থাকার আহবান জানানো হয়। সাথে সাথে চলে প্রত্যেকের চলাচলের তথ্য সংগ্রহ যাতে কেউ মিথ্যা তথ্য দিয়ে ফাঁক গলিয়ে যেতে না পারে। ঘরবন্দি মানুষদের বাড়িতে প্রয়োজনমত খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য জিনিসের সরবরাহ নিশ্চিত করে সরকার। স্থানীয় সংস্থাগুলোকে সক্রিয় করা হয়। কোন সংস্থা কোন দায়িত্ব পালন করবে তা ভাগ করে দেয় সরকার। যে কোন রকম দুর্নীতি কঠোরভাবে দমন করা হয়। এসবই করা হয় আগাম সতর্কতা হিসেবে।
তথ্যমতে, ভিয়েতনাম সরকারিভাবে স্বাস্থ্য খাতের বিনিয়োগ ও রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করার যে কর্মসূচি বহুদিন ধরে চর্চা করে আসছে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ সেটি বড় ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। আর যখন করোনাভাইরাস বা ‘কোভিড–১৯’ দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়েনি, তার আগেই ভিয়েতনাম গোটা দেশটাই লকডাউন করে দিয়েছে। এতে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়েছে।
সীমিত সামর্থ্য নিয়েও ভিয়েতনাম মোট ২,০৬,২৫৩ জনকে টেস্ট করেছে। করোনা প্রথম ধরা পড়ে ২৩ জানুয়ারি। ২২ মার্চ ১৯ জন আক্রান্ত হয়েছিল। ২৯ মার্চ সর্বাধিক ২০ জন আক্রান্ত হয়। তারপর কমতে থাকে সংক্রমণ হার। কিন্তু ২ এপ্রিল নতুন করে ১৫ জন সংক্রমিত হয়। তারপর ক্রমাগতভাবে সংক্রমণ কমে আসতে থাকে। সর্বশেষ ১৪ এপ্রিল মাত্র ১ জন এবং ১৫ এপ্রিল ২ জন সংক্রমিত হয়। ২৩ জানুয়ারি থেকে আজ ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ভিয়েতনামে মোট সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা মাত্র ২৬৮ জন। এ পর্যন্ত একজনও মারা যায় নি ভিয়েতনামে। সুস্থ হয়েছেন ২১৬ জন। এখন ৫২ জন চিকিৎসাধীন আছেন। তাদের মধ্কিতে ৪৪ আশংকামুক্ত, ৮ জন কিছুটা ঝুঁকিতে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রতি ১০ লাখের মধ্যে মাত্র ৩ জন সংক্রমিত। এ পর্যন্ত মোট ২,০৬,২৫৩ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে যা প্রতি ১০ লাখ মানুষের হিসেবে ২,১০৯ জন (সূত্র: ওয়ার্লওমিটার ডট ইনফো)।

চীনের উহান থেকে দেশে ফেরা ৬৬ বছর বয়সী এক ভিয়েতনামী প্রথম করোনাভাইরাসে শনাক্ত হন। আনুষ্ঠানিকভাবে ২৩ জানুয়ারি প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্তের খবর প্রকাশ করে ভিয়েতনাম সরকার। ওই দিন থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ‘কোভিড–১৯’ রোগীর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১৪ জনে। এর মধ্যে ২ জন চীনা নাগরিক ছাড়া বাকি সবাই ভিয়েতনামী।
ব্যাপক আকারে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে তখনই স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয় সরকার। পাশাপাশি করোনাভাইরাস নিয়ে ব্যাপক আকারে প্রচার করে সাধারণ মানুষের মধ্যে। কীভাবে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে, কী করলে সুস্থ থাকবে, এটাই ছিল প্রচারের মূল্য বক্তব্য। এসবের পাশাপাশি দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের খুঁজে খুঁজে বের করে পরীক্ষা করেছে।
তবে গত ২ মার্চ সর্বনাশটা ঘটায় দেশটির একজন প্রভাবশালী নারী ব্যবসায়ী। ইউরোপের তিনটি দেশ ঘুরে ওই ব্যবসায়ী ভিয়েতনামের হ্যানয় বিমানবন্দরের দায়িত্বরত কর্মচারীদের পরীক্ষা ফাঁকি দিয়ে ঢুকে পড়েন দেশে। বিমানবন্দরের পরীক্ষায় ফাঁকি দিলেও ভিয়েতনামের পুলিশ তাঁকে ঠিকই আটক করে। এরপর জানা যায়, তিনি করোনায় আক্রান্ত।
এরপর ভিয়েতনাম সরকার একটা বড় পদক্ষেপ নেয়। সেটি হলো, ওই নারী যে বিমানে এসেছিলেন, তার সব যাত্রীকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। তিনি যে রাস্তা দিয়ে গিয়েছিলেন, সেই রাস্তা জীবাণুমুক্ত করা হয়, সেই পথের ধারে বাস করা প্রত্যেককে পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু এত সব করার পরও আক্রান্তের সংখ্যা ১৭–তে ঠেকিয়ে রাখা যায়নি—সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ২৪৯ জনে।

ভিয়েতনামের স্বাস্থ্য বিভাগ মনে করে,যদি ইউরোপফেরত নারী যাত্রী বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ফাঁকি না দিতেন, তাহলে আক্রান্তের সংখ্যা এত বাড়ত না। কারণ, তিনি যেসব স্থানে গেছেন, সেখানের সবাইকে পরীক্ষার মধ্যে আনলেও সবকিছু ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানের তুলনায় ভিয়েতনাম এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস মোকাবিলায় যা করেছে,তা সারা দুনিয়ার জন্য অনুকরণীয়।

ভিয়েতনামে পর্যটন আয়ের বড় উৎস। আগামি তিন মাসে ভিয়েতনামের প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হতে পারে। মানুষের জীবনের মূল্য তাদের কাছে সবার উপরে। তাই সংক্রমণ ঠেকাতে তারা সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণে এক মুহূর্ত নষ্ট করে নি।
ভিয়েতনামের এই সাফল্য সারা দুনিয়ার প্রশংসা কুড়িয়েছে। এমন সাফল্য আছে আরো অনেক দেশের। আমরা সে কাহিনী তুলে আনতে চাই। কেননা, পশ্চিমা মিডিয়া শুধু ভয়ের সংবাদ প্রচার করছে। ভেঙে দিচ্ছে মানুষের মনোবল। কেননা, তারা জানে, করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে তাদের এক বিশাল বাণিজ্য সম্ভাবনা তৈরি হবে। সেই বাজার দখলে তারা এখন থেকেই মরিয়া।
ভিয়েতনাম আমাদের কী শেখালো? নিজের স্বার্থে নিজেকে ঘরবন্দি রাখা, নিজেকে নিরাপদে রাখা। অহেতুক গুজব না ছড়ানো। সংক্রমিত মানুষের প্রতি কোন ঘৃণা নয়, পরিবারের প্রতি কোন বিদ্ধেষ নয়। সকলের বাঁচার লড়াইয়ে নিজের সামর্থ্য উজাড় করে দেয়া। সর্বশক্তি দিয়ে একযোগে লড়াই করা। যেটুকু আছে সবাই মিলে ভাগ করে খাওয়া। বিপদে অন্যের পাশে দাঁড়ানো। সহযোগিতা, সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া।
দুর্যোগ একদিন ঠিকই কেটে যাবে। আবার গড়ে উঠবে মানুষের সমাজ, প্রেম ভালোবাসার সমাজ। পূঁজিবাদী ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বা বিচ্ছিন্নতা নয়, সমাজই মানুষের বেঁচে থাকার শেষ নিদান। মানুষ যে ‘অমৃতস্য পুত্রঃ’।


Warning: A non-numeric value encountered in /home/njybpvbk/public_html/wp-content/themes/Newspaper/includes/wp_booster/td_block.php on line 1009

Warning: Use of undefined constant TDC_PATH_LEGACY - assumed 'TDC_PATH_LEGACY' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/njybpvbk/public_html/wp-content/plugins/td-composer/td-composer.php on line 109

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here