করোনা পরিস্থিতি, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও অর্থনীতিক সংকট মোকাবেলায় জাতীয় কৃষক ও ক্ষেত মজুর সমিতির ৮ দফা প্রস্তাবনা

0
153

প্রেস বিজ্ঞপ্তি : জাতীয় কৃষক ও ক্ষেত মজুর সমিতির আহবায়ক গাজী আব্দুল হামিদ, মনোজ সাহা, বজলুর রহমান, তুষার কান্তি দাস, মোফাজ্জেল হোসেন মঞ্জু, তপন সাহা চৌধুরি ও আলাউদ্দিন ওমর এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছেন, করোনার সংক্রমণে সারা বিশ্বে মানবিক ও অর্থনৈতিক মহাবিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশেও মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় মারাত্মক আকার নেবে তার আলামত দেখা যাচ্ছে। করোনা সংকটে পুঁজিবাদী বিশ্বের শিল্প বাণিজ্য যেভাবে মুখ থুবড়ে পড়ছে, দেখা যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী মহামন্দা। এ সংকট থেকে দ্রুত নিষ্কৃতির সম্ভাবনা নেই। এ পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের গার্মেন্টস ও রফতানিমুখি শিল্প সহ অন্যান্য খাতে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে। তবে, শুধুমাত্র শিল্প খাতের উপর নির্ভর করে ও প্রাধান্য দিয়ে চলমান সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। আমাদের মতো পিছিয়ে-পড়া কৃষিনির্ভর দেশে এখনও পর্যন্ত কৃষিই পারে জনগণকে বাঁচাতে। এখনই মাঠে যে ফসল আছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সেই ফসল ঘরে তুলতে হবে। কোনও অবস্থাতে একমাত্র মুনাফাখোর আড়তদার, মহাজন ও ব্যবসায়ীদের উপর নির্ভর করে চলমান সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়। সরকারকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চলতি মৌসুমের মাঠের ধান ক্রয়, পরিবহণ ও সংরক্ষণ করাই হবে যুক্তিসঙ্গত। আবার বিদ্যমান বাজার কাঠামোকে উপেক্ষা করাও হবে চরম বিপর্যয়ের কারণ। এক ধরনের সমন্বয় করতে হবে।
ইতোমধ্যে শিল্পক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সংকট শুরু হয়ে গেছে। গামেন্টস মালিকরা সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করে চলেছেন। নানা ওজুহাত খাড়া কওে তারা শ্রমিক-কর্মচারিদের বেতন ভাতা না দিয়েই কারখানা বন্ধ করতে শুরু করেছেন। ফলে শিল্প শ্রমিকদের বেকারত্ব মহাসড়কে প্রতিবাদের চেহারায় উঠে আসছে। খাদ্য নিরাপত্তা বলে কিছু থাকছে না। না-খাওয়া শ্রমিকদের শুধু বক্তৃতা, নির্দেশ ও পুলিশের লাঠি উঁচিয়ে করোনা ভাইরস ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আবার শুধু আর্থিক প্রণোদনার কাহিনী শুনিয়ে আশু সমস্যার সমাধান অর্থাৎ ঘরে আটকে থাকা মানুষের খিদের নিবৃত্তি হচ্ছে না।
চলমান বেকার ও অনানুষ্ঠানিক খাতে যারা কর্মরত ছিলেন তাদের মিলিত সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ভাইরাস আক্রমণজনিত কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তেমনি খাদ্যের অভাবে তা আরও মারাত্মক হবে। ছোট-মাঝারি ব্যবসায়ী, ছোট ছোট কারখানার মালিক-কর্মচারি, মধ্যবিত্ত-নি¤œ মধ্যবিত্ত আর একটি অভাবী মানুষের চাপের সাথে যোগ হবে। এর সাথে আরও যোগ হবে নি¤œ বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারি। সব মিলে কোটি কোটি হত দরিদ্রের সংখ্যাই বৃদ্ধি পাবে। শুধু তাই-ই নয়, ইতোমধ্যে দারিদ্র সীমার নিচে চলে এসেছেন এমন সংখ্যক মানুষ যাদের কথা এখনই আমাদের ভাবনার মধ্যে আনতে পারছি না। এবং এর ফলে ‘দিন-আনা-দিন-খাওয়া’ সম্পর্কে যে ধারণ আমাদের সামনে আছে আসলে তার সীমানা হবে বহু দূর বিস্তৃত।
আগাম প্রস্তুতির ঘাটতিতে প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে সীমাহীন অব্যবস্থা ও সমন্বয়হীনতা। একজন বড় মাপের মানব দরদী চিকিৎসক করোনায় শহীদ হয়েছেন। এমন একটি পরিস্থিতি মোকাবেলা সম্ভব হয়নি। কর্মহীনদের খাদ্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা হচ্ছে না। খাবার মুজত আছে ঘোষণা দিলেও মানুষের জন্য বরাদ্দ পৌচোচ্ছে প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য।
গ্রামের মানুষদের এখনো করোনা পরীক্ষার আওতায় আনা যায়নি। পোশাক শিল্পর শ্রমিক কর্মচারিদের প্রায় শতভাগ গ্রামের হতদরিদ্র ঘর থেকে এসেছেন। কারখানার চাকরি হারিয়ে তাদের আবার গ্রামে ফিরে যাওয়ার বাস্তবতা নেই। তাই বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে বর্তমান ও অদূর ভবিষতে কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা ও দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচার পথ প্রধানত কৃষি অর্থনীতির উপর নির্ভর করছে। তাই মহাবিপর্যয় সংকটকালে দেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতি গতিশীল রাখার জন্য খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি, মৎস্য, হাস মুরগির ডিম, দুগ্ধ সহ কৃষিনির্ভর ও কৃষি সম্পর্কিত উৎপদানে বিনিয়োগের ওপর প্রধান গুরুত্ব দিতে হবে। এই মুহূর্তে এর পাশাপাশি কৃষির ও গ্রীমাণ জীবনের সাথে সম্পর্কিত মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ী এবং কুটির শিল্পকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষকেরা উৎপাদন উপকরণ ক্রয় ও ফসল বিক্রয়ে ঠকতে ঠকতে চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। এদিকে বিশেষভাবে নজর দিয়ে উৎপাদন উপকরনের মূল্যহ্রাস, ভতুর্কি প্রদান এবং ফসলের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষি ঋণের সুদ মওকুফ, সহজ শর্তে বিনা সুদের কৃষি ঋণ ও ফসলী ঋণ প্রদান, রোরো ধান কাটার জন্য ভুর্তুকি প্রদান করতে হবে। ধান উঠার সাথে সাথে সরকারি মূল্যে ধান কিনে নেবার ব্যবস্থা করতে হবে। সে ধান থেকেই সরকার চাল উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে পারবে। অর্থাৎ চাল ক্রয় নয়, ধান ক্রয়ই হতে হবে কর্মসূচি। খাদ্য নিরাপত্তায় সরকারের মজুত ভান্ডার গড়ে তুলতে হবে। কমপক্ষে ৫ বছর মেয়াদে কৃষি উৎপাদনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। এখন বোরো মৌসুমে হাওড় অঞ্চল ও সারা দেশে বোরো চাষীরা ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ার উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাদের অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর না। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বর্ষার আগেই ধান ঘরে তোলার। হাওড় অঞ্চল সহ সারা দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে ধান কাটার জন্য আধুনিক যন্ত্র ও হাতে কাটার জন্য পরিকল্পিতভাবে লোকবল যাতায়াত ও মজুরদের পরিবহণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত সরকারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান বাস্তবতায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, শহর থেকে ফিরে আসা শ্রমিক, রিকসা-ভ্যান চালক, নছিমন-করিমন চালক, নির্মাণ শ্রমিক সহ অসংগঠিত খাতের শ্রমিকেরা বোরো ধান কাটা ও পরিবহণে নসিমন-করিমনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ধান পরিবহনে নসিমন-করিমনের আইনি বৈধতা দিতে হবে।
ভুর্তুকি ও ঋণ প্রদানে দুর্নীতি সর্বজনবিদিত। এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এই মুহূর্তে আমাদের দাবি-
১) প্রত্যেক উপজেলা ও ইউনিয়ন হেলথ কমপ্লেক্সে করোনা পরীক্ষার জন্য জরুরি ব্যবস্থা ও সাধারণ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এবং ‘সেনা মেডিকেল কোর’কে করোনা চিকিৎসার কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে।
২) চাল নয়- ধান ক্রয় করতে হবে। ইরি বোরো ধান ক্রয়, চাল উৎপাদন ও ধান চাল সংগ্রহে বিদ্যমান কাঠামো কাজে লাগাতে হবে। যেমন চালকল ও চাতাল মালিকদের নির্দিষ্ট পার্সেন্টেস দিয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কৃষকদের ধান ক্রয়, চাল উৎপাদন, সরকারি মজুদকরণ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হব। সরকার নিজস্ব অর্থে সরাসরি কৃষকদের ধান ক্রয় করবেন। মাধ্যম থাকবেন চাতাল মালিকেরা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, ব্লক সুপারাইজারগণ তদারকি করবেন। চাতাল মালিকগণ চাল উৎপাদন করে সরকারি গুদামে পৌঁছে দেবেন। এতে কৃষকেরা নিশ্চিতভাবে ধানের মূল্য পেতে পারেন। ধানের আর্দ্রতা বেশি থাকলে চাতাল মালিকগণ তাদের চাতালে ধান শুকিয়ে নেবেন। এর জন্য চাতাল মালিকদের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে খরচ দিতে হবে। কৃষককে হয়রানি করা যাবে না।
৩) ক্ষেত মজুর, কর্মহীন, অসহায়, দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য কার্ডের মাধ্যমে বিনামূল্যে পূর্ণ রেশন অথবা এক মাসিক মেয়াদে নগদ অর্থ প্রদান, মাঝারি কৃষক, মধ্যবিত্ত, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য স্বল্প মূল্যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৪) কৃষিঋণের সুদ মওকুফ, বিনা সুদে/ সহজ শর্তে কৃষি ঋণ প্রদান, ভাগ চাষিদের জন্য ব্যক্তি জামানতে ঋণ ও মৎস্য, হাসমুরগী পালন, ডিম দুগ্ধ ইত্যাদি কৃষিনির্ভর ও কৃষি সম্পর্কিত উৎপাদনের বিনা সুদের ঋণ দিতে হবে।
৫) ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাংকের অনিয়ম স্বচ্ছতা দুর্নীতির বিষয়ে কঠোর হতে হবে। ঋণ প্রদানে গ্রামের কৃষক প্রতিনিধি ও কৃষি বিভগের মাঠ কর্মীদের মতামত নিতে হবে। এবং ঋণ গ্রহীতাদের নাম অনলাইনে সাধারণের দেখার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৬) কৃষি উৎপাদনে হার্বেস্টর, ট্রাক্টর সহ অন্যান্য উপকরণ প্রদানে অনিয়ম দুনীতি বন্ধ করতে হবে। প্রকৃত কৃষক/ কৃষি সমবায়/ কৃষি সমিতি যাতে পেতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষক প্রধিনিধি ও মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের সম্মতি থাকতে হবে। প্রাপকদের তালিকা অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে।
৭) খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সকল প্রকার দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে। ইতিমধ্যে জড়িত দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ত্রাণ তৎপরতার জন্য খাদ্য মজুত, পরিবহন ও বিতরণের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর উপর ন্যস্ত করতে হবে।
৮) এই মহাদুর্যোগ মোকাবেলায় জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা ও সর্বদলীয় জাতীয় সমন্বয় কমিটি গড়ে তোলার জন্য সরকারের প্রদত্ত আহবান জানানো হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here